ভয়াবহ নদী ভাঙনের কবলে ঐতিহাসিক ফ্রেজার সাহেব তথা বাংলার লেফটেন্যান্টের বাংলো
বিলুপ্তির পথে বাংলার লেফটেন্যান্ট স্যর আন্ড্রু ফ্রেজারের বাংলো ৷ ভয়াবহ নদী ভাঙনে ইতিহাসের পাতা থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে ফ্রেজারগঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্মৃতি ৷

Published : October 10, 2025 at 8:52 PM IST
ফ্রেজারগঞ্জ, 10 অক্টোবর: সুন্দরবনের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রেজারগঞ্জ ৷ দক্ষিণ 24 পরগনা জেলার নামখানা ব্লকের এই ফ্রেজারগঞ্জ উপকূল থানার ঢিলছোঁড়া দূরত্বে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন অ্যান্ড্রু হেন্ডারসন লেইথ ফ্রেজার বাংলো ৷ নদী গ্রাসের কবলে এই অ্যান্ড্রু হেন্ডারসন লেইথ ফ্রেজারের বাংলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত ৷ পর্যটক থেকে এলাকাবাসীর প্রশ্ন সংস্কার কি করা যেত না ? এ প্রশ্নের উত্তর না-মিললেও আশ্বাস মিলেছে, কয়েক মাসের মধ্যেই এখানে তৎকালীন (1903 থেকে 1908) বাংলার লেফটেন্যান্টের মূর্তি স্থাপিত হবে ৷
ফ্রেজারগঞ্জ হল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ 24 পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত কাকদ্বীপ মহাকুমার নামখানা ব্লকের একটি গ্রাম ৷ বর্তমানে বকখালির সি-বিচ লাগোয়া। উল্লেখ্য, এক সময় এই ফ্রেজারগঞ্জ অত্যাচারী ইংরেজদের পদধ্বনিতে কম্পিত হয়েছিল। পদদলিত হয়েছিল এদেশের মান, সম্মান সংস্কৃতি। তৎকালীন সময়ে এই নামখানা ব্লকের ফ্রেজারগঞ্জ এলাকায় আবির্ভাব হয়েছিল অ্যান্ড্রু হেন্ডারসন লেইথ ফ্রেজারের ৷ দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। এ দেশে রাজত্ব চালাচ্ছে ব্রিটিশরা। সেইসময় ফ্রেজার সাহেব এই বকখালিতে এসেছিলেন। বানিয়েছিলেন থাকার জন্য একটি বাংলো।
ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে বাংলো
দেশ পরবর্তীতে স্বাধীন হলেও সেই বাংলো সংস্কারের কোনও দায়িত্ব নেয়নি প্রশাসন। এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমানে বাংলোর আর অস্তিত্ব নেই সেইভাবে। জরাজীর্ণ অবস্থা তার, ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে বাংলো। ঘরের মধ্যে গজিয়ে উঠেছে বড় বড় বট, অশ্বথ গাছ। প্রচুর মানুষ এই বাংলো দেখতে আসেন। বকখালিতে এটাও একটা টুরিস্ট স্পট। অত্যাচারী ইংরেজ শাসক অ্যান্ড্রু হেন্ডারসন লেইথের নামাঙ্কিত এই জায়গাটি এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ৷
ফ্রেজার সাহেব তৈরি করলেন বিলাসবহুল বাংলো
সালটা 1903 ওড়িশা থেকে বাংলার ছোট লাট লেফটেন্যান্ট গভর্মেন্ট হয়ে গেলেন আন্ড্রু ফ্রেজার। তবে শাসন করার আগেই তিনি বঙ্গোপসাগরের কূলে একটি ছোট্ট গ্রাম আবিষ্কার করেন ৷ যার নাম নারায়ণতলা ৷ এই এলাকার প্রেমে পড়ে ফ্রেজার সাহেব তৈরি করলেন বিলাসবহুল বাংলো। বাংলোর চারিদিকে হাজার হাজার নারকেল গাছ বসিয়ে বাগান তৈরি করে ফেলেন। পরবর্তীকালে ফ্রেজার সাহেবের নাম অনুসরণ করে নারায়ণতলা হয়ে ওঠে ফ্রেজারগঞ্জ।
ফ্রেজার সাহেবকে উদ্ধার করে কিশোরী
জনশ্রুতি আছে কলকাতায় যাওয়ার সময় ফ্রেজার সাহেবের জাহাজ এই জায়গায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তাঁকে প্রায় মৃত অবস্থায় এক গ্রাম্য কিশোরী উদ্ধার করে। সুস্থ হওয়ার পর ফ্রেজার সাহেব এই জায়গায় থাকা শুরু করেন। তবে যে কিশোরী ফ্রেজার সাহেবকে সেবা করে বাঁচিয়েছিলেন তার আর খোঁজ মেলেনি ৷ কেউ বলেন খুন করা হয়েছে, কেউ বলেন বেপাত্তা, তবে সঠিক কী কারণ তাকে না-পাওয়ার সেটা এখনও জানা যায়নি।
বাংলোটি আত্মসমর্পণ করেছে নদীগর্ভে
এই এলাকা বঙ্গোপসাগর উপকূল হওয়ায় দিনের পর দিন ভূমিক্ষয় হওয়া শুরু করে। 1908 সালে গভর্নর বদল হওয়ার পর আর কেউ এই ব্রিটিশ সাহেবের বাড়ি সংরক্ষণে আগ্রহ দেখায়নি। 1911 সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলে অন্ধকারে তলিয়ে যায় এই সমস্ত এলাকা। তারপর সময় যত এগিয়েছে উত্তাল সমুদ্রের কাছে বাংলোটি অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে ৷ হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে বাংলোটি ৷
পর্যটক থেকে স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্য
এ বিষয়ে এক পর্যটক জাকির হোসেন জানান, ইংরেজ আমলের এই ঐতিহাসিক বাংলোটি সংরক্ষণ করা দরকার ছিল রাজ্য সরকারের। রাজ্য সরকার এই বাড়িটি সংরক্ষণ করলে বকখালি ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম ডেস্টিনেশন হত এই ফ্রেজার সাহেবের বাংলোটি ৷ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুপ মণ্ডল নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, দিনের পর দিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নদী ভাঙনের জেরে ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্রেজার সাহেবের বাড়িটি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে যদি এই বাংলোটি সংরক্ষণ করা যায় তাহলে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াবে।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে নামখানা পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ নীলকণ্ঠ বর্মন বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায় দশা হয়ে গিয়েছে ফ্রেজার সাহেবের ঐতিহাসিক বাংলো। ইতিমধ্যেই গঙ্গাসাগর বকখালি ব্লক ডেভেলপমেন্ট অথরিটির পক্ষ থেকে ওই বাংলোটি সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের রাস্তা ও নদীবাঁধ। ওই বাড়িটি সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে ৷ ওই জায়গায় ফ্রেজার সাহেবের একটি মূর্তি ও নির্মাণ করা হবে। আগামিদিনে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যাবে ফ্রেজারগঞ্জের এই ঐতিহাসিক বাংলোটি ৷"
এ বিষয়ে দক্ষিণ 24 পরগনা জেলা পরিষদের সহসভাপতি সীমন্ত মালি বলেন, "ফ্রেজার সাহেবের বাংলো অনেকদিন আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এটি সেই বাংলোটির একটি অংশ। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে কিন্তু তাতে লাভ হবে না বলে আমার মনে হয়! বাড়িটি রক্ষা না-করতে পারলেও এলাকার মানুষদের রক্ষা করার জন্য আমরা নদী বাঁধ নির্মাণ করার কাজ শুরু করেছি। কালের নিয়মে ধীরে ধীরে একটু একটু করে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাচ্ছে ফ্রেজারগঞ্জের ঐতিহাসিক বাংলো।"

