দুই দেশেরই ভোটার লিস্টে নাম বাংলাদেশের যুবকের, রয়েছে সাজানো মা'ও
এ যেন আরেক নিউটন দাস ! দু'দেশেরই ভোটার, তারপরেও পরিবার নিয়ে দিব্যি বাস করছেন ভারতে । হিঙ্গলগঞ্জে ফাঁস বাংলাদেশি যুবকের কীর্তি।

Published : August 1, 2025 at 7:58 PM IST
হিঙ্গলগঞ্জ, 1 অগস্ট: মনে আছে নিউটন দাসের কথা ! যাঁর নাম ভারতের ভোটার লিস্টেও ছিল । আবার বাংলাদেশও। বাংলাদেশের বৈষম্য বিরোধী কোটা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা নিউটন দাসের দু'দেশের নাগরিক হওয়া নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি ৷ এবার হুবহু তারই প্রতিচ্ছবি ধরা পড়ল উত্তর 24 পরগনার হিঙ্গলগঞ্জে। নিউটন দাসের মতো আরেক বাংলাদেশি প্রভাস মণ্ডলেরও নাম রয়েছে দুই দেশের ভোটার লিস্টে। তিনি নিয়মিত ভোটও দেন।
আরও আশ্চর্যের, ভারতীয় এক মহিলাকে 'মা' সাজিয়ে তিনি এদেশের ভোটার-আধার কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র বানিয়ে ফেলেছেন। আর তার সুবাদে হিঙ্গলগঞ্জের সান্ডেলেরবিল গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় জমি-জায়গা কিনে বাড়িঘর তৈরি করে দিব্য পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন এই বাংলাদেশি যুবক। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে বাঁকড়া এলাকায়। স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে, হাতে গরম ইস্যু পেয়ে শাসকদলকে আক্রমণ করতে ছাড়েনি গেরুয়া শিবির। আর এই তরজা ঘিরেই এখন সরগরম হিঙ্গলগঞ্জ বিধানসভা এলাকা।
জানা গিয়েছে,বছর 37-র প্রভাস বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জের বাসিন্দা। বছর তিনেক আগে তিনি বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে চলে আসেন ভারতে। তারপর থেকেই পাকাপাকিভাবে এদেশে তিনি বসবাস শুরু করেছেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বাংলাদেশের বাসিন্দা প্রভাস মণ্ডল বছর তিনেক ধরে হিঙ্গলগঞ্জের বাঁকড়া এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁর কাছে ভারত এবং বাংলাদেশ, দু'দেশেরই সচিত্র পরিচয়পত্র রয়েছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি বলেই মনে করছেন এলাকার লোকজন।
কিন্তু ভারতে এসে কীভাবে নিজের পরিচয়পত্র তৈরি করে ফেললেন 'বাংলাদেশি' প্রভাস ?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ উঠেছে এক্ষেত্রে বাংলাদেশি যুবক অসৎ পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। বানি মণ্ডল নামে ভারতীয় এক মহিলাকে নিজের 'মা' বলে পরিচয় দিয়ে ভোটার কার্ড তৈরি করে ফেলেন প্রভাস। এ দেশের ভোটার লিস্টে যেখানে নাম রয়েছে এই বাংলাদেশি নাগরিকের, সেখানেও তাঁর মা-র নাম হিসেবে রয়েছে বানি মণ্ডলের। অথচ বাংলাদেশের ভোটার কার্ডে প্রভাসের মায়ের নাম দেখানো হয়েছে গীতা মণ্ডল। বাসিন্দারা বলছেন, এর থেকেই স্পষ্ট তিনি জালিয়াতি করে এদেশের ভোটার লিস্টে নিজের নাম তুলেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হল, এই বাংলাদেশি যুবক যদি জালিয়াতি করে ভোটার লিস্টে নাম তুলেই থাকে, তাহলে স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পঞ্চায়েত কী করছিল ? কেনই বা তাঁর নাম বাদ পড়ল না এদেশের ভোটার লিস্ট থেকে ? এর সদুত্তর অবশ্য মেলেনি।
পঞ্চায়েত সদস্যের বক্তব্য
স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য কানাইলাল হাওলি বলেন, "বিষয়টি নজরে আসার পর আমি বিডিও অফিসে গিয়ে ওর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে বলেছিলাম। জানিয়েছিলাম ওর নাম থাকা নিয়ে কিছু জটিলতা আছে। তখন বিডিও অফিস থেকে বলা হয়, এভাবে কারও নাম বাদ দেওয়া যায় না। বাদ দিতে গেলে একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। ওর নামে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগও রয়েছে। তারপরেও কী ভাবে প্রভাস মণ্ডলের নাম ভোটার লিস্টে উঠল, সেটা বলতে পারব না। আমি 2023 সাল থেকে পঞ্চায়েত সদস্য হিসেবে রয়েছি। এর সঙ্গে তৃণমূল দলের কেউ যুক্ত আছে কি না, সেটাও বলতে পারব না। হয়তো সরকারি কোনও মাধ্যম কিংবা অন্য কোনও মাধ্যমে উনি ভোটার হয়ে থাকতে পারেন। শুনেছি উনি নাকি বিয়ে করে এদেশে বসবাসও করছেন। তবে, উনি আমার এলাকার ভোটার নন, এটুকু বলতে পারি।"
বাংলাদেশি যুবকের স্ত্রী কী বলছেন ?
এদিকে, শুক্রবার এই বাংলাদেশি যুবকের বাঁকড়ার বাড়িতে গিয়েও, দেখা মেলেনি তাঁর। তবে, প্রভাসের হদিশ না-পাওয়া গেলেও দেখা মিলেছে তাঁর স্ত্রী রিতা মণ্ডলের। রিতা বলেন, "উনি তো 30 বছর আগে এখানে এসেছেন। ছোটবেলা থেকেই এখানে থাকত। কাজের সূত্রেই ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তারপর আমরা দু'জনে বিয়ে করে এখানে থাকতে শুরু করি। আমার স্বামীই কী শুধু বাংলাদেশি। আর কোনও বাংলাদেশি নেই এখানে ? আমার স্বামী কোনও অনৈতিক কাজের যুক্ত নয়। ও কলকাতায় কাপড়ের দোকানে কাজ করে। সেখানেই গিয়েছি। কষ্ট করে এখানে বাড়ি করেছে আমার স্বামী। সেটা অনেকের সহ্য হচ্ছে না। শুনেছি ছোটবেলায় এখানে চলে আসার পর ওই ভদ্রমহিলার কাছেই উনি থাকতেন। সে-ই ওর মা বলে জানতাম। আমার স্বামীর দু'দেশের ভোটার লিস্টে নাম রয়েছে কি না, জানা নেই।"

স্বামীর স্বপক্ষে ওই মহিলা বারবার যুক্তি খাঁড়া করার চেষ্টা করলেও এক সময়ে চাপে পড়ে দু'দেশের ভোটার হওয়া, বেআইনি কাজ বলে স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দা মহম্মদ ইশাক গাজি অবশ্য জানিয়েছেন, আগে বাংলাদেশে থাকত। হঠাৎ দেখি, এখানে জায়গা জমি কিনে বাড়িঘর তৈরি করেছে। বছর তিনেক হয়েছে প্রভাস মণ্ডল ভারতে এসেছে। ওঁর ভারতের ভোটার লিস্টে যেমন নাম রয়েছে, তেমন রয়েছে বাংলাদেশেও। এখানে এসে আধার-ভোটার কার্ড সবই করে ফেলেছে। কী ভাবে সম্ভব? সেটা আমরা জানব কীভাবে ? প্রশাসনই ভালো বলতে পারবে। নিশ্চয় এখানকার লোকজনই তাঁকে সাহায্য করেছে। তা ছাড়া সম্ভব নয়। আমি মনে করি, এটা বন্ধ করা উচিত।"
তৃণমূল-বিজেপি তরজা
অন্যদিকে, এই ঘটনা শুধু হিঙ্গলগঞ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বলে দাবি গেরুয়া শিবিরের। এই বিষয়ে বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার যুব মোর্চার সভাপতি পলাশ সরকার বলেন, "এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীরাই তৃণমূলের সম্পদ। এঁদের যেমন ভোট লুটের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তেমনই বিরোধীদের ওপর দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীরা ভরে গিয়েছে। তৃণমূলের সহযোগিতায় এঁদের ভোটার কার্ডও হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দল এসআইআর করতে বাধা দিচ্ছে। ওঁরা জানে স্বচ্ছ ভোটার তালিকায় ভোট হলে তাদের বিদায় আসন্ন। তাই, ভয় পেয়ে এ রাজ্যে এসআইআর আটকাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে শাসকদল।"
যদিও বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সান্ডেলেরবিল পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান পরিতোষ বিশ্বাস। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি হাসনাবাদের মাখালগাছা পঞ্চায়েত এলাকায় ফাঁস হয়েছিল এক বাংলাদেশি দম্পতির কীর্তি ! দু'দেশের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশি নাগরিকের নাম থাকা নিয়ে সেই সময় জোর চর্চা শুরু হয়েছিল বিভিন্ন মহলে। তাতে নাম জড়িয়েছিল স্থানীয় পঞ্চায়েতের 100 দিনের কাজের প্রকল্পের সুপারভাইজার, তৃণমূল নেতা ভাইপো। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না-কাটতে এবার পাশের হিঙ্গলগঞ্জে সামনে এল আরেক বাংলাদেশি যুবকের কীর্তি!

