'মৃত' অথচ ভোটার তালিকায় 'জীবিত'! বসিরহাটে 'ভূতুড়ে' ভোটারের ছড়াছড়ি
'ভূতুড়ে' ভোটারের বিষয়টি মানলেন পুরসভার তৃণমূল ভাইস-চেয়ারম্যানও । শাসকদলকে নিশানা করে ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে গেরুয়া শিবির ।

Published : August 13, 2025 at 7:41 PM IST
বসিরহাট, 13 অগস্ট: কেউ মারা গিয়েছেন ছ'বছর আগে । আবার কেউ মারা গিয়েছেন দু'বছর কিংবা এক বছর আগে । তার পরেও ভোটার লিস্টে জ্বলজ্বল করছে সেই সমস্ত 'ভোটারে'র নাম । মরেও দিব্যি জীবিত হয়ে রয়েছেন তাঁরা । একজন, দু'জন নয় । এরকম 26 জন 'ভূতুড়ে' ভোটারের হদিশ মিলেছে উত্তর 24 পরগনার বসিরহাটে ৷ তা-ও মাত্র একটি বুথ থেকে ।
ঘটনা ঘিরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনীতির অন্দরে ৷ অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একটি বুথেই যদি 26 জন 'ভূতুড়ে' ভোটারের হদিশ মেলে, তাহলে বাকি বুথ-গুলিতে 'ভূতুড়ে' ভোটারের সংখ্যা কত দাঁড়াবে ? এ নিয়ে শাসক তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা । গেরুয়া শিবিরের দাবি, 'এই সমস্ত ভূতুড়ে ভোটাররাই তৃণমূলের সম্পদ ।' পাল্টা শাসক শিবিরের তরফে সমস্ত দায়ভার চাপানো হয়েছে নির্বাচন কমিশনের ওপর । আর তা ঘিরেই নির্বাচনী আবহে রীতিমতো সরগরম হতে শুরু করেছে বসিরহাট পুরসভা এলাকা ।
রাজ্যে যেকোনও সময় চালু হতে পারে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী । তার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে । SIR (এসআইআর)-বিতর্কের আবহে রাজ্যে একের পর এক ভুয়ো এবং বাংলাদেশি ভোটারের হদিশ মিলতে শুরু করেছে । সম্প্রতি বসিরহাট মহকুমার হাড়োয়া বিধানসভা এলাকায় খোঁজ মিলেছিল চার বাংলাদেশি ভোটারের । সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী, এই চার বাংলাদেশি নাগরিকের নাম ছিল দু'দেশের ভোটার তালিকাতেই । এই দুই বাংলাদেশি দম্পতি যে ওপার বাংলার নাগরিক তা মেনেও নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা । সেই ঘটনার রেশ কাটতে না-কাটতে সেই বসিরহাট মহকুমাতেই এবার হদিশ মিলল 'ভূতুড়ে' ভোটারের ।

জানা গিয়েছে, বসিরহাট পুরসভার 6 নম্বর ওয়ার্ডের 225 নম্বর বুথে মোট ভোটার 984 জন । কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে সেই ভোটারের মধ্যে 'জীবিত' 26 জন ৷ ভাবছেন 'এ' আবার কী ? তাহলে খোলসা করে বলি ৷ আসলে ভোটার তালিকায় এঁদের প্রত্যেকে 'জীবিত' হয়ে থাকলেও সকলেই 'মারা' গিয়েছেন কয়েক বছর আগে । তার পরেও ভোটার লিস্ট থেকে বাদ যায়নি 'মৃতদের' নাম । ভোটার তালিকায় কার্যত জ্বলজ্বল করছে সেই সমস্ত 'মৃত' নাম । তাঁদেরই একজন অঞ্জনা গোস্বামী । যিনি মারা গিয়েছেন আজ থেকে ছ'বছর আগে । তাঁর পরিবারও স্বীকার করে নিয়েছেন অঞ্জনা দেবীর মারা যাওয়ার কথা ৷ তার পরেও কীভাবে এই প্রৌঢ়ার নাম ভোটার তালিকায় রয়ে গেল তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা ।

কিন্তু, মারা যাওয়ার পরেও কীভাবে 'মৃতদের' নাম থাকতে পারে ভোটার তালিকায় ? সেই সমস্ত 'ভূতুড়ে' ভোটারের নাম বাদ দিতে কেন উদ্যোগ নেওয়া হল না ? প্রশাসনই বা কী করছিল ? এই সমস্ত প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে । এদিকে, এমন ঘটনায় তাজ্জব বনে গিয়েছেন মৃতদের পরিবারের অনেকেই ।
এই বিষয়ে মৃত অঞ্জনা গোস্বামীর বউমা তোতা গোস্বামী বলেন, "আমার শাশুড়ি মারা গিয়েছেন তাও ছ'বছর হতে চলল । ওনা'র ডেথ সার্টিফিকেটও তোলা হয়ে গিয়েছে । কীভাবে ভোটার লিস্টে নাম রয়েছে তা জানা নেই । কেন রয়েছে সেটা স্থানীয় কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলার পর বুঝতে পারব ।"

তোতা গোস্বামীর মতো মৃত ঠাকুরমার নাম ভোটার লিস্টে থাকায় অবাক হয়ে গিয়েছেন সানি হালদারও । তাঁর কথায়, "প্রায় এক বছর হতে চলল, ঠাকুরমা মারা গিয়েছেন । জানি না কীভাবে ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে ওনা'র । আমাদের তো সেভাবে ভোটার লিস্ট দেখা হয় না, তাই বলতে পারব না । কেন রয়েছে সেটা দেখতে হবে ।"
অন্যদিকে, ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির রাজনৈতিক চাপানউতোরে সরগরম হয়ে উঠেছে বসিরহাট । পুরসভা এলাকার বিভিন্ন বুথে যে 'ভূতুড়ে' ভোটার ছড়িয়ে রয়েছে তা একপ্রকার স্বীকার করে নিয়েছেন বসিরহাট পুরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল নেতা সুবীর সরকার । যদিও এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনকের ঘাড়েই দায় ঠেলেছেন তিনি ।

ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, "গত পুর নির্বাচনের সময় এই সমস্ত 'মৃত' ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তদ্বির করা হয়েছিল নির্বাচন কমিশনে । তাঁদের কাছে ডেথ সার্টিফিকেট-সহ অন্যান্য প্রমাণও দাখিল করা হয়েছিল । তার পরেও মৃতদের নাম বাদ যায়নি । এটা কমিশনের গাফিলতির ছাড়া আর কিছু নয় । আমরাও চাই মৃতদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাক । আমাদের নেত্রীও সেই কথা বলেছে । কিন্তু, একজনও প্রকৃত ভোটারের নাম যেন বাদ না যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে ।"
পাল্টা তৃণমূলকে জবাব দিয়েছে গেরুয়া শিবিরও । এই বিষয়ে স্থানীয় বিজেপি নেতা গৌরাঙ্গ পাল বলেন, "এখনও অবধি 26 জন ভূতুড়ে ভোটারের হদিশ মিলেছে ঠিকই । কিন্তু, ঠিক মতো খোঁজ খবর নেওয়া হলে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে । পুরসভার 6 নম্বর ওয়ার্ডে এরকম ভোটারের ছড়াছড়ি । যাঁরা মরে গিয়েছে কিংবা অন্যত্র চলে গিয়েছে সেরকম ভোটারও রয়েছে অসংখ্য । আমরা চাই, নিবিড়ভাবে ভোটার লিস্ট সংশোধন করা হোক । যাঁরা প্রকৃত ভোটার তাঁদের নামই যেন থাকে ভোটার তালিকায় । বাংলাদেশি অথবা ভুয়ো একজন ভোটারের নামও যেন না থাকে ভোটার লিস্টে । 'মৃত' অথচ তাঁরা 'জীবিত' হয়ে প্রতি নির্বাচনে ভোট দিয়ে চলেছে । এটা কীভাবে সম্ভব ? দীর্ঘদিন ধরে এটা চলতে পারে না । তাই, ভূতুড়ে এবং বাংলাদেশি ভোটাররা যাতে এদেশের ভোট প্রক্রিয়ায় সামিল হতে না পারে তা নিশ্চিত করা উচিত নির্বাচন কমিশনের ।"

