'পরিকল্পনার অভাবে' বন্ধের মুখে তাঁত হাব, বিকোচ্ছে না শাড়ি; অন্ধকারে গঙ্গারামপুরের শিল্পীরা
শিল্পীরা চাইছেন, সরকার পদক্ষেপ করুক ৷ না-হলে গঙ্গারামপুরের তাঁত শিল্প যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহও নেই ৷

Published : June 9, 2025 at 7:50 PM IST
গঙ্গারামপুর, 9 জুন: সময়টা সত্তরের দশক ৷ তখন অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুর ৷ একপাশ ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশ ৷ সবেমাত্র শেষ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ৷ স্বাধীন হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ৷ কিন্তু যুদ্ধের সেই আতঙ্কের আবহে অনেক মানুষ চলে এসেছেন ভারতে ৷ তাঁদের একটা অংশ পশ্চিম দিনাজপুর জেলায় বসবাস শুরু করেন ৷ নিজেদের সমস্ত সম্পত্তি বাংলাদেশে ফেলে এক কাপড়ে এপারে চলে আসা মানুষগুলো তখন পেটের জ্বালায় ভুগছেন ৷ অন্ন সংস্থানের জন্য তাঁরা গঙ্গারামপুরের বসাকপাড়া, দত্তপাড়া এলাকায় গড়ে তোলেন তাঁত শিল্প ৷ পাকা রং, নিপুণ বুনোট, দামেও কম ৷ তাই তাঁদের তৈরি শাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে খুব একটা দেরি হয়নি ৷ খুব অল্প সময়েই তাঁত শিল্পের জন্য গঙ্গারামপুর গোটা দেশে সুনাম অর্জন করেছিল ৷ তখন এখানে প্রায় 30 হাজার তাঁতশিল্পী কাজ করতেন ৷
চলে গিয়েছে আরও পাঁচটি দশক ৷ নয়ের দশকে এই জেলা ভাগ হয়েছে ৷ গঙ্গারামপুর এখন দক্ষিণ দিনাজপুরে ৷ তবে জেলার সঙ্গে তাঁতশিল্পের ছবিটাও পুরো বদলে গিয়েছে ৷ এখন আর কান পাতলে এদিক ওদিক থেকে খটাখট আওয়াজ শোনা যায় না ৷ একসময় ঘরে ঘরে তাঁতের শাড়ি তৈরি হত, দুর্গাপুজোর সময় বিপুল বরাত মিলত ৷ তিন দশক আগেও পুজোর মাস তিনেক আগে থেকে নাওয়া খাওয়া মাথায় উঠত শিল্পীদের ৷ বসাকপাড়া, দত্তপাড়া, ভোদংপাড়া, স্কুলপাড়া থেকে শুরু করে ইন্দ্রনারায়ণপুর কলোনির রাস্তায় হাঁটলেই শোনা যেন মাকুর খটাখট শব্দ ৷ এই এলাকাগুলিতে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছিল তাঁত ৷ কিন্তু দিন বদলের পালায় এখন সেখানে শুধুই অন্ধকার ৷ এখন মাত্র দেড় থেকে দুশো শিল্পী কোনওরকমে এই শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন ৷ তাও তন্তুজের উপর নির্ভর করে ৷ এভাবে চললে এই শিল্পের লালবাতি জ্বলতে যে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না, তা বিলক্ষণ জানেন সবাই ৷
অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না ৷ এই শিল্পে গতি আনতে 2019 সালের 24 ফেব্রুয়ারি গঙ্গারামপুর ব্লকের ঠ্যাঙ্গাপাড়ায় কয়েক কোটি টাকার তাঁত হাব তৈরি করে রাজ্য সরকার ৷ হাবের উদ্বোধন করেছিলেন বালুরঘাটের তৎকালীন সাংসদ অর্পিতা ঘোষ ৷ কিন্তু শুরু থেকেই সেই হাব বিশেষ চলেনি ৷ তাঁতশিল্পীদের একাংশ বলছেন, গঙ্গারামপুর থেকে ঠ্যাঙ্গাপাড়ার দূরত্ব প্রায় ছ'কিলোমিটার ৷ হয়তো এই দূরত্ব তেমন কিছু নয় ৷ কিন্তু সেখানে লোকজনের তেমন আনাগোনা নেই ৷ কারণ, সেখানে দূরপাল্লার বাস দাঁড়ায় না ৷ অন্যান্য যানবাহনও তেমন চলে না ৷ সন্ধের পর ওই এলাকা আরও জনশূন্য হয়ে পড়ে ৷ তাই এখানে শাড়ি-কাপড়ের ব্যবসায়ীরা আসেন না ৷ আরও বড় বিষয়, এই হাবে সিংহভাগ তাঁতশিল্পীকে ডাকাই হয়নি ৷ ফলে হাব তৈরি হলেও তাঁতশিল্পী কিংবা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপকৃত হচ্ছেন না ৷ ফলে জলে গিয়েছে সরকারের এই উদ্যোগ ৷

তাঁত হাবের ইনচার্জ বিদ্যুৎ সরকার বলছেন, "উদ্বোধন হওয়ার সময় থেকেই এখানে লোকজন খুব একটা আসে না ৷ মূল কারণ, এর অবস্থান ৷ গঙ্গারামপুর ও বুনিয়াদপুরের মাঝামাঝি জায়গায় ঠ্যাঙ্গাপাড়া ৷ এই এলাকাতেও কিছু তাঁতশিল্পী আছে ৷ কিন্তু সংখ্যায় খুবই কম ৷ তাঁতশিল্পীরা মূলত গঙ্গারামপুরের বাসিন্দা ৷ তাঁরা এতদূর আসতে চান না ৷ প্রথম প্রথম প্রচুর জিনিসপত্র আমরা এখানে রেখেছিলাম ৷ কিন্তু বিক্রি না হওয়ায় সেসব কলকাতার দফতরে পাঠিয়ে দিয়েছি ৷ এখানে ব্যবসাই চলে না ৷ লাভ তো দূরের কথা ৷ তাই গত তিন বছরে কোনও জিনিস তৈরি করতে পারিনি ৷ তবে আমরা গত বছর থেকে নতুনভাবে আবারও তাঁতের শাড়ি তৈরি করে রেখেছি ৷ গঙ্গারামপুর, বুনিয়াদপুর-সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়েছি ৷ কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও লাভ হয়নি ৷ তবু আশা করছি, কখনও না কখনও এখানে বিক্রির হার বাড়বে ৷"

হাবের হাল এমন হল কেন ?
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা হস্তচালিত তাঁত সুরক্ষা মালিক সমিতির সম্পাদক রামগোপাল বিশ্বাসের কথায়, "নব্বইয়ের দশকে গঙ্গারামপুরের তাঁতশিল্প সাফল্যের চূড়ায় উঠেছিল ৷ সেই সময় 30 থেকে 40 হাজার তাঁতি এখানে কাজ করতেন ৷ হঠাৎ করে এখানকার বাজারে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশি শাড়ি ৷ দামে কম হওয়ায় সেসব কাপড়ের চাহিদা বাড়তে শুরু করে ৷ এখানকার তাঁতিদের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেয় গুজরাত, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি রাজ্যের পাওয়ার লুমের শাড়ি ৷ সেসব শাড়ি টেকসই না হলেও ডিজাইন আর রং-এর চটক রয়েছে ৷ দুশো থেকে আড়াইশো টাকার মধ্যেই সেসব শাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল ৷ ফলে মানুষও মজেছিল সেই শাড়িতে ৷ ওই ধরনের ডিজাইন বানাতে আমাদের প্রতি শাড়িতে অন্তত 700 টাকা খরচ হত ৷ এর ফলে হঠাৎ করেই এখানকার তাঁতশিল্পের পতন শুরু হয় ৷"

তিনি আরও বলেন, "এই শিল্পকে বাঁচাতে সংগঠনের তরফে আমরা 2011 সালে বড়সড় আন্দোলনে নামি ৷ সেবারই রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হয় ৷ রাজ্যের তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী স্বপন দেবনাথের সঙ্গেও আমরা দেখা করে নিজেদের আবেদন জানাই ৷ এরপরেই রাজ্য সরকার এখানে তাঁত হাব নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় ৷ সেটা তৈরি করা হয় ঠ্যাঙ্গাপাড়ায় ৷ গঙ্গারামপুর থেকে ঠ্যাঙ্গাপাড়ার দূরত্বটা কোনও ব্যাপার নয় ৷ কিন্তু সেখানে পরিকল্পনারই অভাব রয়েছে ৷"

তাঁর সংযোজন, "আমাদের বলা হয়েছিল, সেখানে ডাইং সেকশন চালু হবে ৷ তাঁতিরা বাজার থেকে কম দামে সেখানে সুতো কিনতে পারবেন ৷ হাবে শাড়ির ডিজাইনও করা হবে ৷ কিন্তু কিছুই হয়নি ৷ সবচেয়ে বড় বিষয়, সেখানে এই সংগঠনকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি ৷ ফলে ওই হাব নিয়ে আমাদের কোনও উৎসাহ নেই ৷ শিল্পের মন্দায় তাঁতিদের অবস্থা খুব খারাপ ৷ বর্তমানে হাতে গোনা শ'দেড়েক তাঁতি নিজেদের তাঁত রক্ষা করতে পেরেছেন ৷ এই পেশা ছেড়ে কেউ মুদিখানার দোকান করেছেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করছেন, অনেকে তো আবার শ্রমিক হয়ে গিয়েছেন ৷ যা পরিস্থিতি, গঙ্গারামপুরের তাঁতশিল্পকে তার সোনালি দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া শুধু কঠিনই নয়, কার্যত অসম্ভব ৷"

কেমন অবস্থা সেই তাঁত হাবের ?
দোতলা ভবন ৷ নীচতলায় তন্তুজের একটি শো-রুম ৷ প্রতিদিন খোলা থাকলেও ক্রেতার তেমন দেখা পাওয়া যায় না ৷ উপরতলায় 5-6টি ঘরে 10-12 জন তাঁতশিল্পী কাজ করেন ৷ কাজের পরিবর্তে মজুরি পান ৷ এখন সেখানে সরকারি ত্রাণের কাপড় ছাড়া আর কিছু তৈরি হয় না ৷ যদিও সেখানে কর্মরত তাঁতিরা এসব নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি ৷
কেমন আছেন গঙ্গারামপুরের তাঁতশিল্পীরা?
সুব্রত বসাক নামে এক শিল্পীর কথায়, "এখানকার তাঁতিদের পরিস্থিতি খুবই খারাপ ৷ তাঁত আর নেই বললেই চলে ৷ অনেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন ৷ তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের মাথায় হাত পড়েছে ৷ এই পরিস্থিতিতে যদি কেন্দ্রীয় কিংবা রাজ্য সরকার আমাদের কাছ থেকে শাড়ি-কাপড় কিনে নিত, তবে হয়তো আমরা কিছুটা বাঁচতাম ৷ কিন্তু অনেক আবেদনের পরেও কোনও কাজ হয়নি ৷ এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামোও এখানে তৈরি করা হয়নি ৷ আমরা নিজেরা শাড়ি তৈরি করে হাটে বিক্রি করছি ৷ ঠ্যাঙ্গাপাড়ায় তাঁত হাব তৈরি হলেও আমাদের কোনও লাভ হয়নি ৷ সেখানেও কোনও পরিকাঠামো নেই ৷"

আরেক শিল্পী মদন বসাকের বক্তব্য, "রাজ্য সরকারের তাঁত হাবে গঙ্গারামপুরের তাঁতিদের ডাকাই হয়নি ৷ আমরা সেখানে কোনও সুবিধে পাই না ৷ একমাত্র যারা ওখানকার সদস্য, তাদেরই সুতো দেওয়া হয় ৷ অথচ বলা হয়েছিল, শিল্পীরা সবাই সেখান থেকে সরকারি মূল্যে সুতো পাবে ৷ সেখানে শাড়ি ডাই করার পরিকাঠামো এখনও তৈরি হয়নি ৷ ফলে ওই হাব তৈরির উদ্দেশ্যটাই জলে গিয়েছে ৷ এর ফলে ঠ্যাঙ্গাপাড়া থেকে গঙ্গারামপুর পর্যন্ত প্রচুর তাঁত বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৷ প্রচুর তাঁতি পেশা বদল করে ফেলেছেন ৷ এই শিল্প এখন প্রায় শেষ ৷ কোনওরকমে টিমটিম করে জ্বলছে ৷"
তাঁত শিল্পীদের এই দশায় রাজ্যের শাসকদলকে কাঠগড়ায় তুলেছেন বিজেপি বিধায়ক ৷ গঙ্গারামপুরের বিজেপি বিধায়ক সত্যেন্দ্রনাথ রায় বলেন, "একসময় গঙ্গারামপুর ও সংলগ্ন এলাকার তাঁতের শাড়ি বিখ্যাত ছিল ৷ তখন তাঁতিদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ৷ কে কত ভালো শাড়ি তৈরি করতে পারে তা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত ৷ এতে শিল্পেরও বিকাশ ঘটেছিল ৷ এখন সেই শিল্প অবলুপ্তির পথে ৷ তাঁতিদের কথা ভেবে ঠ্যাঙ্গাপাড়ায় তাঁতের হাব তৈরি করেছিল রাজ্য সরকার ৷ সেই হাব এখন নষ্ট হতে বসেছে ৷ অথচ সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীদের সেদিকে তাকানোর সময় নেই ৷ তাঁতিদের দিকে তাঁরা ফিরেও তাকান না ৷ কারণ, এখন তাঁদের কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নেই ৷ তাঁতিরা এখন কোনও কাজ পান না ৷ গঙ্গারামপুর-সহ জেলার সমস্ত দলের নেতা-মন্ত্রীদের কাছে আমার আবেদন, জেলার তাঁতিরা যেন বেঁচে থাকেন, তার জন্য আপনারা কিছু ব্যবস্থা করুন ৷"

তাঁত হাব যে সফল হয়নি তা মেনে নিয়ে তৃণমূলের জেলা সভাপতি সুভাষ ভাওয়াল বলেন, "সব জায়গায় ব্যবসা হয় না ৷ সব জায়গায় সমস্ত পরিকাঠামোও থাকে না ৷ এটা খুব সত্যি কথা ৷ সরকার আশা করেছিল, ঠ্যাঙ্গাপাড়ায় ভালো ব্যবসা হবে ৷ তাই সেখানে তাঁত হাব গড়ে তোলা হয়েছিল ৷ কীভাবে শাড়ির বিক্রি বাড়ানো যায় তা নিয়ে আমরা তাঁতিদের সঙ্গে আলোচনা করব ৷ তবে এর মধ্যেও একটা আশার বিষয় রয়েছে ৷ মন্ত্রী বিপ্লব মিত্রের উদ্যোগে খুব তাড়াতাড়ি গঙ্গারামপুরে হস্তশিল্প মেলা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ৷ সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হবে ৷ আমরা আশা করব, ওই মেলায় গঙ্গারামপুর তথা জেলার তাঁতশিল্পীরাও অংশগ্রহণ করবেন ৷"
সুভাষের বক্তব্য শুনে তাঁতশিল্পীদের একাংশ বলছেন, মেলা যদি কোনও শিল্পের ভবিষ্যৎ হয় তবে কিছু বলার নেই ৷ এভাবে চললে গঙ্গারামপুরের তাঁত শিল্প যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা নেবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহও নেই ৷ শিল্পীরা চাইছেন, সরকার পদক্ষেপ করুক ৷

