বিনি পয়সার বাজার ! শিশুদের জন্য মিলছে বই-খেলনা-পোশাক-জুতো
বসিরহাট থানার অন্তর্গত পূর্ত দফতরের অফিসের উল্টোদিকে এই বিনি পয়সার বাজার ৷ স্থানীয় দুঃস্থ শিশু ও তার পরিবারের জন্য এই ব্যবস্থা করেছে খোলা আকাশ ৷

Published : July 29, 2025 at 8:53 PM IST
বসিরহাট, 29 জুলাই: রাস্তার ধারে লোহার ছোট্ট কাঠামো। তাকে সাজানো নানা ধরনের বই, পোশাক, খেলনা থেকে স্কুলের জুতো। চাইলে যে কেউ নিয়ে যেতে পারেন সেগুলো ৷ কোনওরকম টাকা-পয়সা ছাড়াই এই বাজার থেকে জিনিস সংগ্রহের সুযোগ থাকায় নাম দেওয়া হয়েছে 'বিনি পয়সার বাজার'। উত্তর 24 পরগনার বসিরহাট থানার অন্তর্গত পূর্ত দফতরের অফিসের উল্টোদিকে বসেছে এই বাজার ৷
মূলত, স্থানীয় দুঃস্থ শিশু ও তার পরিবারের জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে । বসিরহাট পুরসভা এলাকার বিভিন্ন পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ এই মানবিক উদ্যোগের নাম 'খোলা আকাশ'।
খোলাবাজারে যে কেউ দান করতে পারেন
কয়েক মাস আগে চালু হওয়া খোলা আকাশে এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে পাঠ্য বই থেকে পুরাণের গল্পবই, ইতিহাস কিংবা মনীষীর জীবনী। নানা বয়সের মানুষের জন্য রয়েছে নানা ধরনের পোশাক ৷ তবে এই পোশাক নতুন নয়, সেগুলো ব্যবহৃত ৷ ছেঁড়াফাটা থাকলেও সেগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। শুধু নিজেদের পরিবারের ব্যবহৃত জিনিস নয়, অন্য যে কেউ চাইলেই এই খোলাবাজারে ব্যবহৃত সামগ্রী দান করতে পারেন অর্থাৎ পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী এই বিনি পয়সার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ৷

করোনো থেকে আমফানে 'খোলা আকাশ' ছিল তৈরি
এর আগে একই ধরনের বাজার বসেছিল বসিরহাটের অন্য দুই প্রান্তে। আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক-সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ 2018 সালে প্রথম এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাতে সাফল্য পেতেই অর্থাৎ স্থানীয় দুঃস্থদের পাশে দাঁড়াতে পরবর্তীতে আরও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এমনকী করোনাকালে বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার, আমফান বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বসিরহাটের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। আগামী দিনে স্যানিটারি ন্যাপকিন প্যাডের ভেন্ডিং মেশিন রাস্তার ধারে বসানোর চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন তাঁরা।

'খুশির ঝুড়ি'তেও মিলত হরেক রকম খাবার
এর আগে, 'খুশির ঝুড়ি' বসানো হয়েছিল। যে ঝুড়ি থেকে অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষ নিজের পছন্দমতো খাবার সংগ্রহ করতে পারতেন। যদিও সে খাবার কিন্তু ফেলে দেওয়া বা উচ্ছিষ্ট নয় ৷ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা ছাড়াও যে কোনও মানুষ দোকান থেকে, খাবার কিনে সেই ঝুড়িতে রাখতে পারতেন। ঝুড়িতে থাকত শুকনো খাবার ৷ বিস্কুট, কেক-সহ এই ধরনের খাবার অসহায় দুঃস্থদের জন্য স্টলে রাখা হয়েছিল ৷ তবে বর্তমানে খুশির ঝুড়ি বন্ধ হয়ে গিয়েছে ৷
খোলা আকাশের সদস্য়রা কী বলছেন ?
ধারাবাহিক কর্মসূচির বিষয়ে বলতে গিয়ে বসিরহাট কোর্টের আইনজীবী পার্থপ্রতিম সরকার বলেন, "আমরা বিনি পয়সার বাজার ছাড়াও বছরভর আরও অন্যান্য কর্মসূচি নিয়ে থাকি। ঈদ বা দুর্গাপুজোর আগে অর্থাৎ উৎসবের আগে বসিরহাটের প্রান্তিক এবাকার মানুষের কাছে আমরা পৌঁছে যাই। তাঁদের বিনামূল্যে পোশাক বিলি-সহ উপহার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করি ৷ এই ধারাবাহিক কর্মসূচিতে শুধু আমরা নয়, বসিরহাটের বাইরেরও বহু মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন ৷ তাঁরা অনলাইনে আমাদেরকে অর্থ পাঠান। এর ফলে আরও বৃহৎ অংশের মানুষের কাছে আমরা পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের মধ্যে সকলেই যে বসিরহাটের থাকেন এমনটাও নয়। কেউ কলকাতা বা দেশের অন্য প্রান্তে বা কেউ বিদেশেও থাকেন।"

শিক্ষক দেবাশিস হোড় বলেন, "আমার ছাত্রছাত্রীরা নির্দিষ্ট ক্লাস পাশ করার পর তাদের বই এই বিনি পয়সার বাজারে দিয়ে দেয়। যেখানে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সাজেশন বই, নোটবুক-সহ নানা প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়।"
একাদশ শ্রেণির মৈনাক পাল বলে, "যারা টাকা পয়সার অভাবে নোটবুক বা দামি বই কিনতে পারেন না, তাঁরা এখান থেকে বই নিতে পারছেন। যে বইটা আমার পড়া হয়ে যাচ্ছে বা নির্দিষ্ট ক্লাস পাশ করে যাচ্ছি তারপর তা বাড়িতে পড়েই থাকবে। ফলে পড়ে না-থেকে সেই বই যদি অন্য কারও কাজে লাগছে ৷ এটা খুব ভালো বিষয়।"

খোলা আকাশের আরেক সদস্য বিশ্বনাথ রায় বলেন, "আমরা চাই সকলেই খেয়ে পড়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকুক। শুধু আমাদের সামর্থ্য রয়েছে বলে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকব, বাকিরা থাকবে না এটা হতে পারে না। সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা আছে কিন্তু তারপরও তো নানা কারণে খামতি থেকে যায়। আমরা-সহ বসিরহাটের আরও বহু মানুষ এই খামতি পূরণের চেষ্টা করছেন যাতে সকলকে নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায়।"

