ব্রহ্মকলসের জলে সারে দূরারোগ্য ব্যাধি ! আমরাই গ্রামে আজও কালী রূপে পূজিত বাড়ির মেয়ে কল্যাণী
কল্যাণীর মাথায় করে আনা সেই ব্রহ্মকলস সযত্নে রাখা রয়েছে মন্দিরে । সেই কলসের জল বছরে একবার পরিবর্তিত হয় ।

Published : October 12, 2025 at 11:06 PM IST
দুর্গাপুর, 12 অক্টোবর: বান্ধবীদের সঙ্গে পুকুরে স্নান করতে নেমে তলিয়ে যান কল্যাণী । বহু খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান মেলেন তাঁর । পরে তাঁর বাবা স্বপ্নাদেশ পান । সেই অনুযায়ী কল্যাণী দু'দিন পরে পুকুর থেকে ব্রহ্মকলস মাথায় নিয়ে উঠে আসেন বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গায় । আর তারপর থেকে আজ প্রায় 400 বছরের বেশি সময় ধরে কালী রূপে বাড়ির মেয়ে কল্যাণী পূজিতা হয়ে আসছেন দুর্গাপুরের আমরাই গ্রামে ।
প্রত্যেক বছর কালীপুজোর সময় কল্যাণী মন্দিরে ভক্তদের ঢল নামে । শুধু তাই নয়, কল্যাণীর মাথায় করে নিয়ে আসা সেই ব্রহ্মকলস আজও সযত্নে রক্ষিত মন্দিরে । বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার-সহ বহু ভক্তবৃন্দদের বিশ্বাস, ব্রহ্মকলসের জলে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি মেলে ৷ তাই কালীপুজোর সময় ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় এই মন্দিরে অগণিত ভক্তবৃন্দ তাঁদের মনোবাসনা পূরণের জন্য আসেন ।
কল্যাণী কালীপুজোর ইতিহাস
কথিত ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় 400 বছর আগে কাটোয়ার বন্দিঘাঁটি থেকে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের প্রথম পুরুষ স্বর্গীয় রত্নেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্গাপুরের জঙ্গলঘেরা আমরাই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন । রত্নেশ্বরের একমাত্র পুত্র কৃষ্ণমোহন এবং কন্যা কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায় ।
কল্যাণী আমরাই গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত নির্জন তামলা পুকুরের কালো কুচকুচে জলে তার বান্ধবীদের সঙ্গে স্নান করতে গিয়েছিলেন । তাঁর এক বান্ধবী জলে নামার পর তাঁর পায়ে কোনও কিছুর স্পর্শ লাগে ৷ তাতে তিনি ভয় পেয়ে জল থেকে উঠে আসেন এবং কল্যাণীকে বিষয়টি বলেন । এরপর কই দেখিতো কী আছে জলে? এই বলে সাহসী স্বভাবের তরুণী কল্যাণী বান্ধবীকে ভয় মুক্ত করতে কুচকুচে কালো বর্ণের তামলার জলে নেমে পড়েন । কিন্তু বান্ধবীদের চোখের সামনে হঠাৎ তলিয়ে যান কল্যাণী ।
বান্ধবীরা তৎক্ষণাৎ কল্যাণীর বাড়িতে এসে তাঁর তলিয়ে যাওয়ার খবর দেন ৷ বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে ৷ তারপরেই পরিবারের পাশাপাশি গ্রামের বহু লোক এসে জমায়েত হন তামলা পুকুরের ধারে । সেই সময় গ্রামে বসবাসকারী ধীবর পরিবারগুলিকে ডেকে নিয়ে এসে গোটা পুকুরে জাল ফেলে কল্যাণীর খোঁজে চিরুনি তল্লাশি করা হয় ৷ এরপরেও তাঁর কোনও খোঁজ মেলেনি । তারপর শুরু হয় পুকুরের মাটির পাড় কেটে পুরো পুকুর জল শূন্য করে দেওয়ার কাজ । কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায় ।
কালীপুজোর সূচনা
কল্যাণীকে খুঁজে না পেয়ে তাঁর চিন্তা করতে করতে পুকুরের পাড়েই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ক্লান্ত রত্নেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর পুত্র কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তারপরেই কল্যাণীর বাবা রত্নেশ্বর ভোররাতে মা কালীর থেকে স্বপ্নাদেশ পান যে পরদিন সকালবেলা কল্যাণী পুকুর থেকে উঠে তাঁর নিজ বাড়িতে যাবে ৷ আর এমন স্বপ্নাদেশ পেয়ে আনন্দিত হয়ে ওঠেন রত্নেশ্বর, কৃষ্ণমোহন-সহ পরিবারের সবাই । অদ্ভুতভাবে এই একই সময়ে স্বপ্নাদেশ পান গ্রামের এক কোণে থাকা এক বাদ্যকর ঢাকি । তাঁকে স্বপ্নাদেশে বলা হয়, 'পরদিন সকালবেলা তামলা পুকুরের ঈশান কোণে আমি উঠে আসব৷ তুই ঢাক নিয়ে সেখানে যাবি ।'

সেই অনুযায়ী বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সদস্য-সহ গ্রামের বহু মানুষ পরদিন তামলা পুকুরে গিয়ে ভিড় জমান । সবার চোখের সামনে এক বুক জল থেকে মাথায় একটি কলস নিয়ে উঠে আসেন কল্যাণী । বেজে ওঠে ঢাক, শাঁখ । উপস্থিত মহিলাদের উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে দশদিক । কল্যাণী কলস মাথায় চ্যাটার্জি পাড়ায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের নিজস্ব ফাঁকা জমিতে গিয়ে সেই কলস মাথা থেকে নামিয়ে কালীপুজোর নির্দেশ দেন উপস্থিত পরিবারের সদস্যদের । সেই থেকেই কল্যাণীর দেবীত্বলাভ । পরিবারের মেয়ে কল্যাণীকেই কালী রূপে পুজো করা শুরু হয় ।
ব্রহ্মকলসের মাহাত্ম্য
কল্যাণীর নির্দেশ মেনেই আজও দুর্গাপুরের আমরাই গ্রামে পূজিত হচ্ছেন কল্যাণী কালী । সেই কলস যা ব্রহ্মকলস নামে পরিচিত, তাজু সযত্নে রাখা রয়েছে মন্দিরে । সেই কলসের জল বছরে একবার পরিবর্তিত হয় । কলসটি ঢাকা দেওয়া আছে সোনা,তামা, রুপা , কাঁসা, পিতল-সহ বিভিন্ন ধাতু সহযোগে পদ্ম চিহ্নিত শ্রী যন্ত্র দিয়ে ।

পরিবারের বর্তমান সদস্য বীরেণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "আমরা বাড়ির মেয়েকেই কালী রূপে পুজো করি । কল্যাণীর মাথায় করে নিয়ে আসা ব্রহ্মকলস আজও সযত্নে রক্ষিত আমাদের মন্দিরে । এছাড়াও শ্রী যন্ত্র তারাপীঠ এবং এই কল্যাণী কালী মন্দিরেই রয়েছে । দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষেরা এই ব্রহ্মকলসের জল পান করে সুস্থতা লাভ করেন । শুধু তাই নয়, কল্যাণী মায়ের কাছে এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি ভিন রাজ্যের বহু ভক্তবৃন্দ এসে মাথা নত করেন এবং নিজেদের মনের কথা জানালে মা তা পূরণ করেন ।"
তাঁর কথায়, "এই কলস কী ধাতু দিয়ে তৈরি তা আজও আমাদের কাছেও অজানা । কালীপুজোর পরদিন কয়েক হাজার ভক্তবৃন্দকে মায়ের ভোগ প্রসাদ খাওয়ানো হয় । পুজোর যা কিছু ব্যয় তা মা কল্যাণী কোথা থেকে কীভাবে জোগাড় করে দেন আমরা জানি না ।"

ভক্তদের বিশ্বাস
কল্যাণী কালী মন্দিরের পাশেই রয়েছে ছোট্ট একটি জলাশয় । বহু মানুষ মনবাসনা নিয়ে সেই জলাশয়ে গিয়েও স্নান করেন ৷ তাতে তাদের মনোবাসনা পূরণ হয় বলেও বিশ্বাস অগণিত ভক্তবৃন্দদের ।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মেয়ে শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী বলেন, "দাদু-ঠাকুরমাদের মুখে শুনেছি আমাদের বাড়ির মেয়ে কল্যাণীর দেবত্ব লাভের কথা । আমি গর্বিত আমি ওই বংশের মেয়ে । ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমরা এই পুজো করে থাকি । পুজো শেষে দেবীর কাঠামো থাকে এবং ব্রহ্মকলস নিত্য পুজো হয় । দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ ছুটে আসেন এখানে । ভক্তি ভরে মায়ের কাছে যে যা প্রার্থণা করেন তা পূরণ হয় ।"

এই বাংলায় কালীপুজো নিয়ে কম কাহিনি নেই৷ তবে পরিবারের মেয়েকে কালীরূপে পুজো করার ঘটনা এই রাজ্য তো বটেই, গোটা দেশেই বিরল৷

