শতাধিক বছরের রীতি মেনে দোলের পরেও আবার ফিরল রঙের উৎসব, কোথায় ?
রীতি মেনে দোলের পরেও আসানসোলে আবার ফিরে এল রঙের উৎসব ৷ দোল পূর্ণিমার পাঁচদিন পর রং খেলায় মাতল চট্টরাজ পরিবার ৷

Published : March 19, 2025 at 8:11 PM IST
আসানসোল, 19 মার্চ: বাঙালিদের প্রিয় রংয়ের উৎসব দোল পূর্ণিমা পেরিয়ে গিয়েছে । শুক্রে দোল, শনিতে হোলি এবং তারপরেই রবিবারের টানা দিন তিনেক ছুটির পর সপ্তাহের কাজকর্ম শুরু হয়েছে । তবু কাজে মন বসে না এই বসন্তের উৎসবের মরশুমে । মনে হয়, দোল ফিরে এলে কেমন হত ! এও আবার হয় নাকি ! হয় ৷ হ্যাঁ, দোলও ফিরে আসে । তার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না ৷ দোল পূর্ণিমার পাঁচদিন পর পঞ্চমী তিথিতে আবারও দোল উৎসব ফিরল ৷ যার পোশাকি নাম 'পঞ্চম দোল'।
প্রতি বছরের মতো এবারও দোল পূর্ণিমার একই রীতিনীতিতে এই পঞ্চম দোল পালিত হল কুলটির মিঠানি গ্রামের চট্টরাজ পরিবারে । বাঁকুড়ার পুরন্দরপুরেও এই পঞ্চম দোল পালিত হয় । এছাড়াও গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায় এই বিশেষ দোল উৎসব পালন করে থাকে ।
কুলটিতে পঞ্চম দোল
কুলটির মিঠানি গ্রামের পঞ্চম দোল শতাধিক বছরের পুরনো একটি উৎসব । গ্রামের চট্টরাজ পরিবারের কূলদেবতা বাসুদেবচন্দ্র জিউকে নিয়েই এই উৎসব পালিত হয় । একেবারে দোলের যেরকম নিয়ম-কানুন তা মেনে, দোলের আগের দিন ন্যাড়া পোড়ানো বা চাঁচর উৎসব অনুষ্ঠিত হয় বাসুদেবের । পরদিন চট্টরাজদের দোল মন্দিরে বাসুদেবচন্দ্র জিউয়ের পঞ্চম দোল উৎসব পালিত হয় ।

দেবতাকে রং দেওয়ার পর চট্টরাজ পরিবারের সদস্যরা হোলি খেলায় মেতে ওঠেন । তবে শুধু চট্টরাজ পরিবারের লোকেরাই নন, এই দোল খেলায় গ্রামের অন্যান্য পরিবাররাও অংশ নেন । শতাধিক বছরের প্রাচীন এই রীতি ঘিরে বেশ উৎসবের চেহারা নেয় কুলটির মিঠানি গ্রামের এই চট্টরাজ পাড়া । পরিবারের যে সমস্ত লোকেরা বাইরে থাকেন, তাঁরা আবার এই সময়টায় ফিরে আসেন । চলে দেদার খাওয়া দাওয়া, আনন্দ, হইচই । দোলের মতোই আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন চট্টরাজ পরিবারের সবাই ।

কেন পঞ্চম দোল
কথিত আছে, এক সময় নাকি দ্বারকানগরীতে এই পঞ্চম দোলের সূচনা হয়েছিল । শ্রীকৃষ্ণ এই দোলে নাকি দোলায় যাত্রা করেছেন । কিন্তু বাংলায় এই দোল এসেছে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যের ভাব দর্শনে । পঞ্চম কথাটির মধ্যেই নাকি সেই তত্ত্ব লুকিয়ে রয়েছে । ধর্ম, অর্থ, মোক্ষ ও কামকে ছাপিয়ে পঞ্চম পুরুষার্থ প্রেমের কথাই চৈতন্যদেব বলে গিয়েছেন । যা হল শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেম । দোল পূর্ণিমায় রাধাকৃষ্ণের দোলযাত্রা । সেই কারণে বৈষ্ণব গৌড়ীয় মতে পঞ্চম দোলের দিন মহাপ্রভুর দোলযাত্রা পালন করেন তাঁরা । শ্রী ধাম নবদ্বীপে মহা জাঁকজমক করে এই পঞ্চম দোল পালন হয় ।

অন্যদিকে, বাংলায় বর্ধমানের কাছে বড়া গ্রাম থেকে চট্টরাজ পরিবারের মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য বিগ্রহকে নিয়ে পঞ্চম দোল খেলার সূচনার কথা জানা যায় । অবশ্য এর পিছনে রয়েছে সেই বর্গী আক্রমণের গল্প । কাটোয়ার কাছে মৌগ্রামে থাকত চট্টরাজ পরিবারেরা এবং তাদের ঘরেই ছিল শ্রীমানবিগ্রহ । কিন্তু বর্গী আক্রমণে যখন মূর্তি ভাঙা শুরু হয়, তখন সেই বিগ্রহকে নিয়ে তারা বড়া গ্রামে আশ্রয় নেয় । পরবর্তীকালে সেই বিগ্রহকে নিয়েই পঞ্চম দোল শুরু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে । পারিবারিক কারণে চট্টরাজরা বিভিন্ন জায়গায় চলে গিয়েছেন । বাঁকুড়ার পুরুন্দরপুর ও কুলটির মিঠানিতে চট্টরাজদের পরিবার রয়েছে ৷ ফলে এই দুই জায়গাতেই পঞ্চম দোল অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায় ।

কী হয় এই উৎসবে ?
কুলটির মিঠানি গ্রামের পঞ্চম দোলেও একেবারে একই নিয়মে নারায়ণের দোল খেলা হয় । চট্টরাজ পরিবারের শতাধিক বছরের শালগ্রাম শিলা বাসুদেবচন্দ্র জিউ রয়েছেন । এই বাসুদেবচন্দ্র জিউকে নিয়েই এই দোল খেলা অনুষ্ঠিত হয় । দোলের আগের দিন যেরকম ন্যাড়া পোড়ানো হয় সেরকম ভাবেই বাসুদেবচন্দ্র জিউকে নিয়ে গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুষ্করিণীতে যাওয়া হয় । সেখানে পুজো-আচ্চার পর একটি খড়ের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় । পাশাপাশি পোড়ানো হয় বাজি ।

পূর্ণিমার পর পঞ্চম তিথিতে পঞ্চম দোলের দিন বাসুদেব মন্দির থেকে বিগ্রহকে নিয়ে আসা হয় । ঢাকঢোল ব্যান্ড পার্টি বাজিয়ে বিগ্রহকে নিয়ে আসা হয় চট্টরাজদের দোল মন্দিরে । সেখানে পুজো-আচ্চার পর বিগ্রহ শিলাকে দোলানো হয় । অন্যদিকে, বিগ্রহের গায়ে আবির দেওয়ার পর চট্টরাজ পরিবারের লোকজনেরা মেতে ওঠেন রং খেলায় । যেন আবারও ফিরে আসে হোলি । নতুন করে আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন চট্টরাজ পরিবারের আট থেকে আশি ।
কী বলছেন পরিবারের লোকেরা
পরিবারের প্রবীণ সদস্য সুখেন্দু চট্টরাজ জানালেন, "এই পঞ্চম দোলের অনেক রকম ইতিহাস পাওয়া যায় । পুরাণে পাওয়া যায়, দ্বারকা নগরীতে শ্রীকৃষ্ণ এই দোলযাত্রায় অংশ নিয়েছিলে । অন্যদিকে, গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতেও এই দোল পালিত হয় নবদ্বীপে । আমাদের পারিবারিকভাবে এই দোল শতাধিক বছরের পুরনো । কীভাবে এই দোল শুরু হয়েছিল তা বলতে পারব না । তবে এই পঞ্চম দোলে আমরা খুব আনন্দ করি । পরিবারের যাঁরা বাইরে থাকেন, তাঁরা ফিরে আসেন । একটা পারিবারিক উৎসবের আমেজে এই পঞ্চম দোল পালন হয় ।"
পরিবারের গৃহবধূ প্রিয়াংকা চট্টরাজ জানালেন, "আমি যখন বিয়ে করে এসেছিলাম মিঠানি গ্রামের চট্টরাজ পরিবারে, তখন পঞ্চম দোল দেখে বেশ আশ্চর্য হয়েছিলাম । দোলের পাঁচদিন পর আবার কেন দোল হয় এই ভেবে । এখন বেশ মজা লাগে । আনন্দ হয় ।"
চট্টরাজ পরিবারের আরেক গৃহবধূ মহুয়া চট্টরাজ জানালেন, "এখন সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি কখন পঞ্চম দোল আসবে । সবারই দোল খেলা শেষ হয়ে গেলেও আমাদের দোল খেলা শেষ হয় না । আমরা আবার দোল খেলতে পারি । আনন্দ করতে পারি ।"

