যেন আরজি কর, ডাক্তার হতে ভাইজাগে গিয়ে খুন বঙ্গকন্যা ! লোপাট প্রমাণ; 2 বছর ধরে লড়াই পরিবারের
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন শেষ, ভাইজাগে পড়তে গিয়ে কলকাতার মেয়ের রহস্যমৃত্যুর বিচারের আশায় পরিবার ৷ মৃতার বাবার থেকে হাড়হিম অভিজ্ঞতা শুনল ইটিভি ভারত ৷

Published : August 1, 2025 at 8:02 PM IST
|Updated : August 1, 2025 at 8:12 PM IST
কলকাতা, 1 অগস্ট: স্বপ্নপূরণের আগেই স্বপ্নের হত্যা ! ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তারই প্রস্তুতিতে এ রাজ্য থেকে সুদূর অন্ধ্রপ্রদেশে গিয়ে পড়াশোনা করছিল 17 বছরের রীতি সাহা ৷ তবে 2023 সালে সেখানেই তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় । মৃত্যুর কারণ নিয়ে রয়েছে একরাশ ধোঁয়াশা ৷ হুবহু আরজি করের ঘটনার ধাঁচে প্রমাণ লোপাটের উদগ্র চেষ্টা দেখছে মৃত ছাত্রীর পরিবার ৷
তাই তারা শুরু থেকেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ৷ বিভিন্ন সরকারি দফতর, থানায় দু'বছর ধরে চক্কর কেটে চলেছে ৷ দেখতে হয়েছে আইপিএস-আমলাদের চোখরাঙানি ৷ তবে সুবিচার পেতে মরিয়া রীতির বাবা-মা ৷ অবশেষে দিন কয়েক আগে এই রহস্যভেদের দায়িত্ব সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট ৷ এখন দোষীদের শাস্তি দিতে পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রীতির বাবা সুখদেব সাহা ৷ তাঁর বাড়িতে গিয়ে গোটা ঘটনার তথ্যানুসন্ধান চালাল ইটিভি ভারত ৷
কলকাতার নেতাজি নগরের মেয়ে রীতি সাহা ৷ তার বাবা মায়ের অভিযোগ, রীতি নিজেই নিজেকে শেষ করে দিয়েছে বলে অন্ধ্র পুলিশ দাবি করলেও, আসলে তাকে খুন করা হয়েছে ৷ শুধু তাই নয়, অভিযুক্তদের বাঁচানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন দক্ষিণের রাজ্যের ডাক্তার থেকে পুলিশের বড় বড় কর্তারা ৷ তাঁরা তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করার পরিবর্তে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করেছেন, পরের পর মিথ্যে কথা বলেছেন বলে তাঁর অভিযোগ ৷ মেয়ের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধার পর থেকেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে বদ্ধপরিকর রীতির পরিবার ৷ এজন্য দু'বছর ধরে তারা কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ৷
ঠিক কী ঘটেছিল ?
আরজি করের ঘটনায় যেমন আট অগস্ট নির্যাতিতার বাড়িতে ফোন করে হাসপাতাল থেকে খবরটা দেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমনই রীতি সাহার ভাইজাগের হস্টেল থেকে কলকাতায় তার বাড়িতে ফোন করে ঘটনার কথা জানানো হয় ৷ রীতি সাহার বাবা ইটিভি ভারতকে জানালেন, "2023 সালে 14 জুলাই রাতে আমার কাছে একটি ফোন আসে । বিশাখাপত্তনমে যে সংস্থার তত্ত্বাবধানে আমার মেয়ে পড়তে গিয়েছিল, তাদের মালিকের অপারেশন ম্যানেজার আমাকে ফোন করে বলেন, 'আপনার মেয়ে ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছে ।' আমি বললাম, 'এত রাতে আমার মেয়ে ছাদে যাবে কেন ?' সেখানকার আরেক আধিকারিকও কনফারেন্স কলে ছিলেন আমি জানতাম না ৷ হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, 'না, না ৷ অন্য জায়গা থেকে পড়েছে আপনার মেয়ে ।' আমার কাছে ফোনটা 11টা 54-তে এসেছিল ৷ কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল রাত সাড়ে দশটা নাগাদ । আমি তখন বললাম, 'এত আগে পড়ে গিয়েছে, আর 11টা 54-তে এই খবরটা আমাকে জানাচ্ছেন ?' তখনও আমার মেয়ে বেঁচে ছিল ৷"
তিনি আরও জানান, "যতটা ওঁদের মুখে শুনেছিলাম, তাতে আমি কিছুটা আশ্বস্ত ছিলাম যে মেয়ের খুব বড় কিছু হয়নি ৷ কারণ আমার মেয়ে শারীরিকভাবে প্রচণ্ড ফিট ৷ ফলে ভেবেছিলাম ও ভালো আছে এবং তার চোট আঘাত খুব গুরুতর নয় । আমি তখন আমার প্রতিবেশী বন্ধুর সাহায্য নিই ৷ তাঁর পরামর্শেই আমার মেয়েকে ভাইজাগের ওই সংস্থায় পড়ার জন্য পাঠিয়েছিলাম । এরপর সেই রাতেই আমরা ওই সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মেয়েকে ভিডিয়ো কলে দেখতে চাই । আমি এবং আমার স্ত্রী ভিডিয়ো কলে দেখি, আমার মেয়ে সুস্থই আছে । পরের দিনই আমরা সপরিবারে বেরিয়ে পড়ি ভাইজাগের উদ্দেশে ৷"
খবর পাওয়ার পরের দিন বেলা দেড়টা নাগাদ ভাইজাগে পৌঁছন সুখদেব সাহা । তাঁর কথায়, "তখন মেয়েকে দেখে আমাদের সুস্থ বলেই মনে হল ৷ তবে ওর ইন্টারনাল কী সমস্যা হয়েছে, তা জানতাম না ৷"
একাধিক প্রশ্ন তুলেছে রীতির পরিবার
এরকম একটা ঘটনা ঘটার পরেও মেয়ের হস্টেল কর্তৃপক্ষ কেন পুলিশকে জানাল না ? রীতিকে কোন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, সেটা তার বাবা-মাকে কেন জানানো হয়নি ? স্থানীয় থানাকেই বা কেন জানানো হয়নি ? এই প্রশ্নগুলিই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে রীতির বাবা-মায়ের ৷
সুখদেব সাহা জানান, "ধীরে ধীরে মেয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে এবং আমাদেরকে গোটা বিষয় থেকে অন্ধকারে রেখে ওরাই আমার মেয়েকে ভেন্টিলেশনে পাঠিয়ে দেয় । যেই হাসপাতালে আমার মেয়েকে ভর্তি করা হয়েছিল, সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না ৷ কোনও নিউরোলজিস্টও ছিলেন না ৷ আমার মেয়ের মাথায় চোট লেগেছিল বলে আমি নিউরোলজিস্টের খোঁজ করতে থাকি ৷ তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি ৷ কিন্তু সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়, তারা নাকি নিউরোলজিস্টকে আগে থেকেই বলে রেখেছিল, কিন্তু তখনও তিনি আসেননি ৷"
মেয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে তাকে অন্যত্র স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন সুখদেব সাহাই ৷ সংশ্লিষ্ট সংস্থা সেই ব্যবস্থা করে দিলে রীতিকে ভাইজাগের অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ৷ তবে সেখানেও তাকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হয় ৷ ক্রমে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে ৷
পুলিশি হয়রানির অভিযোগ
সুখদেব সাহার কথায়, "আমরা যখন নতুন হাসপাতালে আমার মেয়েকে নিয়ে যাই, তখন সেখানে পুলিশ চলে এল এবং পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক নিজের মোবাইল বের করে আমাকে একটি ভিডিয়ো দেখালো ৷ যেখানে দেখা যাচ্ছে যে, রাত দশটা নাগাদ আমার মেয়ে হস্টেলের ছাদে উঠছে এবং পুলিশের দাবি ছিল আপনার মেয়ে আর নামেনি । এর মাধ্যমেই পুলিশ প্রথম থেকেই বলা শুরু করে, আমাকে এক প্রকার এটাই মেনে নিতে হবে যে, আমার মেয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করেছে ৷ এরপর আমরা যেখানে যেখানে যাচ্ছিলাম, ওদের বেশ কয়েকজন লোক যেন আমাদের ঘিরে রেখেছিল ৷ আমাদের গতিবিধির উপর নজর রাখছিল । তেলুগু ভাষায় কিছু বলছিল, তবে আমরা তা বুঝতে পারিনি ৷"
এরপর আমরা সন্ধেতে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি এবং তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেন ৷ এরপরই আমরা স্থানীয় থানায় গিয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করার চেষ্টা করি ৷ কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় পুলিশি হয়রানি । বহু কষ্টে আমরা সেখানে এফআইআর দায়ের করি এবং পুলিশের তরফ থেকে বলা হয় যে, আজকে রাতে আপনারা চলে যান ৷ কাল সকাল ন'টার সময় এসে এফআইআরের কপি আপনারা পেয়ে যাবেন । তখনও আমার মেয়ে জীবিত ছিল । এরপর পরের দিন সকাল ন'টার সময় আমি স্থানীয় থানায় হাজির হলেও তারা আমাকে এফআইআর-এর কপি দেয়নি এবং পুলিশ আমাদের হয়রান করতে থাকে ৷ এরপর 12.04-এ আমাদের কাছে ফোন আসে যে, আমার মেয়ে আর বেঁচে নেই ।"
এফআইআর নিতে চাইছিল না পুলিশ
এই কথা শুনেই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন মৃত ছাত্রীর বাবা-মা ৷ সুখদেব সাহার কথায়, "আমার মেয়ের যারা রুম পার্টনার ছিল, তারাও আমার সন্তানের মতো ৷ তাদের সঙ্গে আমি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম । তাদের বন্ধু আর বেঁচে নেই সেই খবরটা দেওয়ার জন্য তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে আমি ফোন করলে, তাদের মুখ থেকে যা শুনি তাতে আমি অবাক হয়ে যাই । আমি জানতে পারি, যখন আমার মেয়ের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, তার আগে থেকেই ছাত্রছাত্রীদের মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তরফ থেকে । এরপর আমি মেয়ের দেহের ময়নাতদন্ত করাতে চাইছে আবারও পুলিশ হয়রানির মুখে পড়তে হয় ৷"
সংশ্লিষ্ট থানার ওসির ঘরে গিয়ে জবানবন্দি দিয়েছিলেন সুখদেব সাহা ৷ তাঁকে বলা হয় যে, পুলিশের তরফ থেকে নাকি আগেই একটি এফআইআর রুজু হয়েছে ৷ যেই এফআইআর তিনি করেননি, সেই এফআইআর-এর ভিত্তিতেই নাকি তদন্ত শুরু হয়েছে এবং পুলিশের তরফ থেকে বারবার জোর দেওয়া হচ্ছিল যে রীতি নিজের জীবন শেষ করেছে ৷ ফলে ছাত্রীর বাবা যে গাফিলতির অভিযোগটি দায়ের করতে চাইছিলেন, সেটি পুলিশ আর নিতে চায়নি বলে অভিযোগ । উলটে পুলিশের তরফ থেকে নাকি বলা হয়, তারা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে যে, মৃতের কোথায় কোথায় আঘাত লেগেছিল ৷ সেই আঘাতের ভিত্তিতে তারা একটি এফআইআর করেছে, ফলে এই ঘটনায় নতুন করে কোনও এফআইআর তারা রেজিস্টার করবে না বলে নাকি পুলিশ জানিয়েছিল ।
তদন্ত চেয়ে অন্ধ্র হাইকোর্টের দ্বারস্থ
রীতির বাবার অভিযোগ, এরপর পুলিশ নাকি তাঁকে ভয় দেখাতে শুরু করে ৷ তাদের এফআইআর-এ সুখদেব সাহা সই না করলে, ময়নাতদন্ত করা হবে না বলে হুমকি দেয় পুলিশ । রীতির বাবা ইটিভি ভারতকে বলেন, "এরপরে আমরা কোনওরকমে মেয়ের দেহ কলকাতায় আনি এবং যাবতীয় যা যা করার আমাদের তরফ থেকে করা হয় । যেহেতু আমার এক দাদা উকিল, তাই তিনি আইনের দিকটি ভালোভাবে বোঝেন ৷ ভাইজাগে গিয়ে আমাদের বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এবং তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আমরা বুঝতে পারি পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোনও একটি বিষয়কে চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছে । ফলে আমরা অন্ধ্রপ্রদেশের হাইকোর্টের দ্বারস্থ হই ৷ আমরা বলি যে, আমার মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং আমরা কিছুই জানি না ৷ ফলে আমরা গোটা বিষয়ের তদন্ত চাইছি ।"
2023 সালের জুলাই মাসে রীতির মৃত্যু হয়েছে ৷ আর অগস্ট মাসে ভাইজাগের কমিশনারকে এই ঘটনার তদন্তভার দেয় সে রাজ্যের হাইকোর্ট ৷ সুখদেব সাহা বলেন, "সেই আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পারি, তিনি তদন্ত করতে গিয়ে অনেক জায়গায় বাধা পান এবং কেউ তাঁকে কোনও রকমের তথ্য দিয়ে সাহায্য করছেন না । ফলে তিনি তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছিলেন না । এরপর সেই কমিশনার গোটা বিষয়টি আদালতে জানান । ওই কমিশনারের রিপোর্টটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল । আমাদের জানানো হয়েছিল যে, আমার মেয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার হস্টেল থেকে পড়ে গিয়েছে ৷ কিন্তু দেখা যায়, আমার মেয়ে আদতেও হস্টেলের ছাদ থেকে পড়েনি, বরং হস্টেল লাগোয়া অন্য একটি বিল্ডিং থেকে পড়েছিল । আমার মেয়ে যে পড়ে যাচ্ছে সেটি পাশের বাড়ির একটি সিসিটিভি ফুটেজ থেকে আমরা দেখতে পাই । সেই সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেনি । তখন আমি অবাক হয়ে যাই ৷ পুলিশ আমায় যে সিসিটিভি ফুটেজ দেখিয়েছিল, তার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজের কোনও মিল নেই ।"
'খুন ও তথ্য-প্রমাণ লোপাট'
এইসব দেখার পর পরিবারের স্থির বিশ্বাস যে, রীতিকে খুন করা হয়েছে ৷ সে যাতে মারা যায় তার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি অনুন্নত হাসপাতালে তাকে ফেলে রাখা হয়েছিল । সুখদেব সাহার কথায়, "ওরা জানত যে, যদি আমার মেয়ে কোনওভাবে মারা যায়, তাহলে বড় কোনও তথ্য-প্রমাণ এখানেই নষ্ট হয়ে যাবে ৷ ফলে অভিযুক্তরা প্রত্যেকেই বেঁচে যাবে । এমনকি আমার মেয়ে যে জামা পরেছিল, সেই জামাও পুলিশের উচিত ছিল বাজেয়াপ্ত করা । কিন্তু পুলিশ সেগুলি বাজেয়াপ্ত তো করেইনি, বরং সেগুলি নষ্ট করে দিয়েছিল । ফলে এখানে তথ্য-প্রমাণ সবই লোপাট, তদন্ত করার মতো আর কিছুই রইল না । এমনকি হাসপাতালে যে সমস্ত রোগীরা ভর্তি হন, তাঁদেরকে হাসপাতালে তরফ থেকে জামাকাপড় দেওয়া হয় । কিন্তু প্রথম অবস্থায় আমার মেয়েকে যে অনুন্নত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, সেখানে তারই একটি জামা হস্টেল থেকে নিয়ে এসে তাকে পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ।"
সাংবাদিক বৈঠক ভাইজাগ পুলিশের
রীতির বাবা জানালেন, তাঁর মেয়ের মৃত্যু নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কথা সঙ্গে কথা বলে এ রাজ্যের সরকার ৷ ঘটনার তদন্তে এখানকার পুলিশ যায় বিশাখাপত্তনমে ৷ তখনই একটু নড়েচড়ে বসে বিশাখাপত্তনমের পুলিশ ৷ তারা সেই সময় একটি সাংবাদিক বৈঠকও করে ।
সুখদেব সাহার কথায়, "সাংবাদিক বৈঠকে পুলিশ কমিশনারের তরফ থেকে যে দুটি ভিডিয়ো সেখানে দেখানো হয়, সেখানেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় । সেই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় যে, একজন 10.25-এ ছাদে উঠছে এবং 9.45 মিনিটে ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছে । এখানেই প্রমাণিত হয় যে, পুলিশের তরফ থেকে গোটা বিষয়টি চাপা হচ্ছিল ৷ কারণ যে ব্যক্তিকে দেখা যাচ্ছে যে, তিনি রাত 10.25-এ ছাদে উঠছেন, তিনি কীভাবে সেই রাতেই তার আগে 9.45-এ ছাদ থেকে পড়ে যাবেন ?"
সংশ্লিষ্ট সংস্থার ফর্ম ফিলাপের প্রতিলিপি, অ্যাডমিশন ফি-র রিসিট এগুলি জমা দেওয়া, অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের তরফ থেকে একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে গাফিলতির একটি ধারা যুক্ত করেন । এরপর পুলিশের তরফ থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার দু'জন আধিকারিক-সহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয় । তবে পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও রকমের চার্জশিট জমা না-দেওয়ায়, তাঁরা জামিনে মুক্ত হয়ে যান বলে জানিয়েছেন সুখদেব সাহা । এরপরেই গত শুক্রবার অর্থাৎ 25 জুলাই তাঁরা জানতে পারেন যে, সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনার যাবতীয় তদন্তভার দিয়েছে সিবিআই-কে ৷
তবে সিবিআইয়ের তরফ থেকে এখনও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানান সুখদেব সাহা । তিনি ইটিভি ভারতকে জানান, "আমি প্রায় দু'মাস সুপ্রিম কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করেছি ৷ সুপ্রিম কোর্ট আমার কথা ও অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে শুনেছে এবং তারা এই ঘটনার তদন্তভার সিবিআইকে দিয়েছে । সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে চার মাসের মধ্যে সিবিআইকে রিপোর্ট তৈরি করে জমা দিতে বলা হয়েছে । ভারতের আইন ব্যবস্থা এবং সুপ্রিম কোর্টের উপর আমার ভরসা রয়েছে এবং আমি মনে করি যে, আমি জাস্টিস পাব এবং তার জন্য আমাকে যা যা করতে হয়, যেখানে যেখানে দৌড় ঝাঁপ করতে হয়, আমি সব করতে রাজি রয়েছি ।"
এখন কী চাইছেন রীতির বাবা
তাঁর কথায়, "আমি এখন চাইছি যে, আমার মেয়ের দেহের ময়নাতদন্ত যে চিকিৎসক করেছিলেন তিনি গোটা বিষয়টি বলতে পারবেন ৷ সিবিআইয়ের তরফ থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর স্টেটমেন্ট রেকর্ড করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । তাঁর তরফ থেকে আমার মেয়ের দেহে একটি গন্ধের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল ৷ সেই গন্ধটি কীসের তা এখনও পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি । আমার মনে হয়, এই বিষয়টি সামনে এলে অভিযুক্তরাও সামনে আসবে ।"
ডাক্তারি রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগ
সুখদেব সাহা বলেন, "পুলিশ আমায় বলেছিল যে, আমার মেয়ের মাল্টিপল ইনজুরির ফলে মৃত্যু হয়েছে । কিন্তু মৃত্যুর একটি সঠিক কারণ থাকা দরকার, মাল্টিপল ইনজুরিতে কোনও মানুষ মারা যায় না । এরপর মেডিক্যাল বোর্ডের তরফ থেকে পাঁচজন ডাক্তারের একটি কমিটি গঠন করা হয় ৷ সেখানে আমাকে ফের ডাকা হয় । তখন আমি আমার 19টি প্রশ্ন তাঁদের কাছে তুলে ধরি । এরপর আমি রহস্যজনকভাবে দেখলাম যে, নতুন চিকিৎসকের কমিটির আলোচনায় হঠাৎ ঢুকে পড়েন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ৷ তাঁর কথা শুনে গোটা বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে তড়িঘড়ি একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয় ৷ এরপর সেই রিপোর্ট পুলিশ দিল্লির এইমস হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় । কিন্তু সংশ্লিষ্ট এইমসের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, দিল্লির এইমস হাসপাতাল এই ঘটনায় কিছুই জানেন না । এইমস হাসপাতালের তরফ থেকে আমাকে জানানো হয় যে, তারা ঘটনাস্থল দেখেনি এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেনি ৷ এমনকি পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গেও কথা বলেনি, ফলে তারা কীভাবে তাদের রিপোর্ট বানাবে ?"
এই ঘটনায় সুখদেব সাহার ছোট ভাই তথা আইনজীবী জয়দেব সাহা ইটিভি ভারতকে বলেন, "আমরা সিবিআইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য অন্ধ্রপ্রদেশে যাচ্ছি । সুপ্রিম কোর্টের যে সকল নির্দেশ রয়েছে, সেই সব নির্দেশ সিবিআইকে মানতে হবে । পাশাপাশি নতুন অভিযোগ রুজু করতে হবে সিবিআইকে ।"

