ইটিভি ভারতের খবরের জের ! তড়িঘড়ি রেশন চালু অনাহারে মৃত বৃদ্ধের পরিবারে, বাড়িতে জনপ্রতিনিধিরা
পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি এবিষয়ে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন ৷ তাঁর দাবি, এখন পশ্চিমবঙ্গে অনাহারে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হয় না ৷ সেই পরিস্থিতি নেই ৷

Published : August 5, 2025 at 5:41 PM IST
বাঁকুড়া, 5 অগস্ট: ইটিভি ভারতের খবরের জেরে অবশেষে নড়েচড়ে বসল প্রশাসন ৷ তড়িঘড়ি অনাহারে মৃত বৈদ্যনাথ দাস মোদকের বাড়িতে গেলেন প্রশাসনিক আধিকারিক থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরা । প্রশাসনের তরফে তুলে দেওয়া হল বৃদ্ধের পরিবারের হাতে ত্রাণ সামগ্রী । পাশাপাশি রেশন কার্ড পুনরায় চালু করে দেওয়া হল খাদ্য সামগ্রীও ।
বাঁকুড়ার কুমিদ্যা গ্রামের বাসিন্দা 65 বছরের বৃদ্ধ বৈদ্যনাথ দাস মোদকের মৃত্যু হয় গত শুক্রবার অর্থাৎ 1 অগস্ট ৷ পরিবারের দাবি, মৃতের স্ত্রী কল্পনা দাস মোদক বহুবার চেষ্টা করেও আধার কার্ড করাতে পারেননি । আধার কার্ডের সঙ্গে রেশন কার্ডের সংযোগ না হওয়ায় বছর খানেক আগে বন্ধ হয়েছে তাঁর রেশন । অন্যদিকে একসময়ে মিষ্টির দোকানের কর্মী ছিলেন বৈদ্যনাথ ৷ অসুস্থ হয়ে পড়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েন । ফলে গত এক বছর ধরে দারিদ্র্য নেমে আসে তাঁর পরিবারে ।
পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক ছেলে সোমনাথ দাস মোদকের সবসময় কাজ থাকে না ৷ সামান্য আয়ে নিজ সংসার চালিয়ে বাবা ও মাকে সাহায্য করার তেমন সামর্থ্য ছিল না তাঁর । ফলে বৈদ্যনাথ ও কল্পনার কোনওদিন খাবার জুটত, আবার কোনওদিন জুটত না । স্থানীয় প্রতিবেশীরা মাঝেমধ্যে সাহায্য করতেন ঠিকই, কিন্তু তা দিয়েই বা আর কতদিন চলে । অভিযোগ, অবশেষে অনাহারে তাঁর মৃত্যু হয় ।
এই খবর প্রথম সোমবার তুলে ধরা হয় ইটিভি ভারতের প্রতিবেদনে । আর তাতেই টনক নড়ে প্রশাসনের । সেদিনই তড়িঘড়ি মৃতের বাড়িতে যান বাঁকুড়া এক নম্বর ব্লকের বিডিও-সহ অন্যান্য প্রশাসনিক আধিকারিকেরা । 4 অগস্ট ব্লক প্রশাসনের তরফে কিছু জামাকাপড়, শুকনো খাবার, ত্রিপল-সহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী তুলে দেওয়া হয় বৈদ্যনাথের পরিবারের হাতে । পরিবারটির জীবিত সদস্যদের রেশন কার্ড দ্রুত চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয় খাদ্য দফতরকে । এরপর মঙ্গলবার সোমনাথ স্থানীয় দুয়ারে রেশন শিবিরে গেলে তাঁর হাতে খাদ্য সামগ্রী তুলে দেওয়া হয় ।

মৃত বৈদ্যনাথ দাস মোদকের ছেলে সোমনাথ বলেন, "আমাদের এই অবস্থার খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন ৷ সোমবার ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকরা আমাদের বাড়িতে এসে ত্রিপল-সহ বিভিন্ন শুকনো খাবার, জামাকাপড় দিয়ে গিয়েছে । আজ রেশন পেলাম ৷ এরপর থেকে নিয়মিত রেশন পাওয়ার ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের তরফে । তবে মায়ের এখনও আধার কার্ড হয়নি ৷ আধার হলে বৃদ্ধভাতাটা পাবে ৷ বাচ্চাদেরও আধার কার্ড নেই ৷ আমার আধার কার্ডও নষ্ট হয়ে গিয়েছে ৷ যদিও প্রশাসন বলেছে আধার কার্ড করে দেবে ৷ ঘরবাড়ি থেকে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দিয়েছে ৷ খবরের জেরে সব হয়েছে ৷ আশার আলো দেখতে পাচ্ছি ৷ আমার তো ঠিক করে কাজ হয় না ৷ ভাতা পেলে সুবিধা হবে ৷"
আর এদিনের ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, যদি পরিবারের হাতে এখন রেশন তুলে দেওয়া গেল, তাহলে কেন বৈদ্যনাথের মৃত্যুর পূর্বে তা করা যায়নি ? কেনই বা বৈদ্যনাথের মৃত্যুর পূর্বে পরিবারটির অনাহারের খবর পৌঁছল না স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কানে ?

এ বিষয়ে বাঁকুড়া 1 নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি অংশুমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "পরিবারটি অভাবি ছিল ঠিকই । ওদের রেশন কার্ডও ছিল ৷ কিন্তু কোনও কারণে রেশনটা আটকে ছিল ৷ অবশেষে ব্লক প্রশাসনের তরফ থেকে তারা যাতে নিয়মিত রেশন পায় তার ব্যবস্থা করা হল । আগে প্রশাসনের তরফে ওই পরিবারকে সবরকম সাহায্য করা হয়েছে ৷ তবে এই যে তাদের অনাহারের ছবি দেখানো হল, বিষয়টি বানানো হয়েছে ৷ গল্প বানানো হল ৷ কারণ এখন পশ্চিমবঙ্গে অনাহারে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি ৷ সেই পরিস্থিতি নেই ৷ আমরা আজ রেশন দিয়ে তা প্রমাণ করে দিলাম ৷"
তিনি আরও বলেন, "দেরি হয়নি ৷ উনি 1 অগস্ট মারা গিয়েছেন ৷ আমরা 4 তারিখ প্রশাসনের তরফে বৈদ্যনাথের বাড়িতে গিয়ে ত্রাণ সামগ্রী ও শুকনো খাবার দিয়ে এসেছি ৷ আজ ওরা রেশনও নিল ৷ মূল ঘটনা হল এই বুথের পঞ্চায়েত সদস্যা হল সিপিএমের ৷ আর পঞ্চায়েতের প্রধান বিজেপির ৷ এনাদের উচিত ছিল ব্যবস্থা নেওয়ার ৷ মৃত্যুর পর তারা খবর পেল ৷ বিরোধীরা মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি শুরু করল ৷ তার আগে পরিবারটা কেন খেতে পেল না ? পঞ্চায়েত সদস্যা ও প্রধান কেন কোনও ভূমিকা নেননি ?"

এই বিষয়ে বাঁকুড়ার বিজেপি বিধায়ক নীলাদ্রীশেখর দানা বলেন, "যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে লোকটা মারা গেল কীভাবে ? এই সরকার একটা মিথ্যাচারের সরকার । নিজেদের ছাড়া কিছু বোঝে না । তাই ওদের এসব আশ্বাসের কথা ভিত্তিহীন ।"
এদিকে ওই গ্রামের রেশন ডিলার বিশ্বরূপ চৌধুরী বলেন, "আজকে বৈদ্যনাথের পরিবার রেশন পেয়েছে ৷ 6 কেজি চাল, চার প্যাকেট আটা তাদেরকে দেওয়া হয়েছে ৷ পরবর্তী ক্ষেত্রে তাদের রেশন পেতে আর কোনও অসুবিধা হবে না ৷ এতদিন রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ড লিঙ্ক ছিল না বলে আমরা পরিষেবা দিতে পারিনি ৷ এই দায় আমাদের বর্তায় ৷ কিন্তু আমরা সোমনাথকে বারবার বলেছি, অফিসে গিয়ে আধার কার্ড চালু করার ৷ তবে আধার কার্ড না থাকা সত্ত্বেও সরকারের কোনও পদ্ধতিতে ও আজ রেশন পেয়েছে ৷ কীভাবে পেল সেটা বলতে পারব না ৷ কিন্তু আধার কার্ড ছাড়াও যেন রেশন দেওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করার জন্য বারবার আমাদের অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইসের সাধারণ সম্পাদক বিশ্ববর বসু দাবি জানিয়েছেন ৷"

তবে রাজনৈতিক এই টানাপোড়েনের মাঝেই বাড়িতে রেশনের চাল আসায় দুমুঠো পেট পুরে ভাত খেতে পারবে মোদক পরিবার ৷ সেই আশায় আজ হাসি ফুটেছে পরিবারের সদস্যদের মুখে । মৃতের স্ত্রী কল্পনা দাস মোদক বলেন, "ছেলে রেশন আনতে গিয়েছে ৷ এলে রান্না হবে ৷ প্রশাসনের লোকজন এসে বলেছে ঘর করে দেব ৷ খুব ভালো লাগছে ৷"

