স্থায়ী ভাঙন রোধের কাজ শেষ হলেই আমাদের উৎসব, 'নিরানন্দের' ঈদে বার্তা খাসমহলবাসীর
কয়েকবছরের এলাকার ছবির বদল ঘটেছে ৷ সঙ্গে বদল ঘটেছে উৎসব পালনের ৷ আর ঈদ আলাদা করে আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে না মানুষগুলির জীবনে ৷

Published : June 7, 2025 at 6:18 PM IST
মালদা, 7 জুন: মানুষ নেই ৷ মসজিদ নেই ৷ ঈদগাহটাও নেই ৷ শুধু থেকে গিয়েছে নদীটা ৷ আর আছে ঈদ ৷ না, এখন আর ঈদের পরব হয় না এখানে ৷ জামাত হয় না, নমাজ হয় না, মেলাও হয় না ৷ শনিবার সারা পৃথিবীর সঙ্গে এখানেও এসেছিল ঈদ ৷ চলে গিয়েছে নিঃশব্দে ৷ কাউকে কিছু না জানিয়ে ৷
মোটে এক দশক আগের কথা ৷ ঈদের পরব হতো বছরে দু'বার ৷ রমজান মাসে অন্তত চার থেকে পাঁচবার গ্রামের সবাই একসঙ্গে ইফতার করত ৷ পুরো গ্রামের চাঁদা দিয়ে তার আয়োজন করা হতো ৷ বিকেলে নদীর ধারে দোকান দিতেন মোস্তাফা ৷ পিঁয়াজি, চপ ভাজতেন ৷ সঙ্গে থাকত মুড়ি ৷ মুড়ি-তেলেভাজা দিয়ে কতজন ইফতারি সারতেন ৷ সেই মোস্তাফা এখন কোথায়, কেউ জানে না ৷ ঈদুল আযহায় প্রায় প্রতি বাড়িতেই পশু কুরবানি দেওয়া হতো ৷ তিনদিন ধরে মাংস-ভাতে বুঁদ হয়ে থাকত ঘরের ছেলেমেয়েরা ৷ সেসব দিন এখন ইতিহাস ৷ ফিরে আসবে না কখনও ৷

গ্রামের নাম খাসমহল ৷ নামেই বোঝা যায় একসময় কতটা ঐশ্বর্যশালী ছিল গ্রাম ৷ নদীর পলিমেশা মাটিতে বছরে তিনবার ভরপুর ফসল, পুষ্টিবোঝাই টাটকা মাছ, বিস্তীর্ণ ঘাসে ঢাকা জমিতে গোচারণ, কোথাও কিছু কম ছিল না ৷ সবার ঘরে উদ্বৃত্ত ভাত ছিল ৷ হাতে টাকাও ছিল ৷ তখন নদীটা ছিল অনেক দূরে ৷
শনিবার সেই নদীর ধারে বসেই স্মৃতিচারণ করছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব শেহনাজ খাতুন ৷ তিনি বলেন, "এ হল গঙ্গা ৷ সারাটা বছর দুলকি চালে চলত ৷ তবে বর্ষার জল পড়লেও গতি উদ্দাম হতো তার ৷ তখন গ্রাম থেকে নদী দেখা যেত না ৷ এমনকী, বছর দশেক আগেও গঙ্গা ছিল অনেক দূরে ৷ কিন্তু এই অল্প সময়েই সে আমাদের গ্রামটা প্রায় গিলে নিয়েছে ৷ প্রথমে আমাদের বাড়ি ছিল গ্রামের পশ্চিমদিকে ৷ ও দিকটাতেই আগে ভাঙন শুরু হয় ৷ বাড়ি চলে গেল নদীতে ৷ চলে এলাম পূবদিকে ৷ দু'বছর ধরে এদিকটা খেয়ে নিচ্ছে গঙ্গা ৷ গত বছর তো গোটা গ্রামটাই গিলে নিয়েছে ৷"
তিনি আরও বলেন, ‘‘একসময় গ্রামে একশোরও বেশি বাড়ি ছিল ৷ এখন মেরেকেটে গোটা পনেরো ৷ সবাই চলে গিয়েছে ৷ কে কোথায় আস্তানা গেড়েছে জানি না ৷ শুধু আমরা ক'টা পরিবারই এখানে থেকে গিয়েছি ৷ আমাদের যাওয়ার কোনও জায়গা নেই ৷ স্বামী এখন কাজ করতে পারে না ৷ অল্পতেই হাঁফায় ৷ আমিই যা পারি কাজ করে ভাত জোটাই ৷ ঘরে দুটো মেয়ে আছে ৷ ওদের দু'বেলা ঠিকমতো খাবার দিতে পারি না ৷ কয়েক বছর ধরেই কুরবানি দিতে পারিনি ৷ জানি, আজ ঈদ ৷ কিন্তু পরব আমাদের জন্য নয় ৷ মেয়ে দুটোকেও কিছু কিনে দিতে পারিনি ৷ আল্লাতালা বোধহয় আমাদের পরীক্ষা নিয়েই চলেছে ৷ আর কত পরীক্ষা দিতে হবে কে জানে?" কান্নায় গলা বুজে আসা শেহনাজের সঙ্গে আর কথা বলা যায়নি ৷

অন্যদিনের মতো এদিন সকালেও মাঠে কাজ করতে চলে গিয়েছিলেন রমজান আলি ৷ দুপুরে ঘরে ফিরেছেন ৷ ঈদ থাকলেও রুটিনের কোনও পরিবর্তন নেই ৷ প্রশ্ন করতেই বলে উঠলেন, "বছর কয়েক আগেও আমরা গোটা গ্রামের মানুষ একসঙ্গে দুই ঈদ পালন করতাম ৷ একসঙ্গে ঈদগাহতে নমাজ পড়তাম ৷ দিনে পাঁচ ওয়াক্ত গ্রামের মসজিদে নমাজ পড়া তো ছিলই ৷ গত বছর মসজিদ-ঈদগাহ সব গঙ্গায় চলে গিয়েছে ৷ আমাদের গিলতে ও যেন পাগল হয়ে গিয়েছে ৷ বর্ষা আসল বলে ৷ এবার যে কী হবে কেউ জানে না ৷ গত বছরের মতো ভাঙন হলে গ্রামের যেটুকু জমি বেঁচে আছে, সেটাও থাকবে না ৷ এই অবস্থায় ঈদ মানাব কীভাবে? আমাদের আর ওসব সাজে না ৷"
গঙ্গার ছোবলে ভিটেমাটি হারিয়ে নাককাট্টি বলরামপুর বাঁধে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন খাসমহলের আকমল হোসেন ৷ তাঁর কথায়, "আমরা এখন যাযাবর ৷ একটা সময় 22 বিঘা জমি ছিল ৷ অনেক গরু ছিল ৷ সারা বছর জমিতে মুনিষ খাটাতাম ৷ প্রতিদিন অন্তত 40 জনের ভাত হত বাড়িতে ৷ তখন ঈদ মানিয়েছি ৷ সাতদিন ধরে আনন্দ করেছি ৷ দুই ঈদেই গ্রামে জমজমাট মেলা বসত ৷ ঘরের মেয়ে-বউরা মেলায় ঘুরত ৷ সেসব এখন ইতিহাস ৷ আজ আমরা নিজেরাই মুনিষ ৷ লোকের জমিতে খাটলে ভাত জোটে ৷ গ্রামের প্রায় সবাই যে যেদিকে পারে চলে গিয়েছে ৷ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ নেই ৷ গঙ্গা সব কেড়ে নিয়েছে ৷ আমাদের কপালটাও ৷ আট বছর আগে শেষবার কুরবানি দিয়েছিলাম ৷ আর পারিনি ৷ কী করব ! বেঁচে থাকার লড়াই চালাতে চালাতে এখন আমরা খুব ক্লান্ত ৷"
শুধু খাসমহল নয়, গঙ্গার ভয়াল ভাঙন রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের মহানন্দটোলা ও বিলাইমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের অনেক গ্রামকে আতঙ্কের দড়িতে বেঁধে রেখেছে ৷ মহানন্দটোলার কান্তটোলা, শ্রীকান্তটোলা, মুনিরামটোলার কয়েকশো বাড়ি গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে ৷ কান্তটোলা মানচিত্র থেকে মিলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ৷ বিলাইমারির খাসমহলের সঙ্গে খাকচাবোনা, রুহিমারি গ্রামও শেষের প্রহর গুনছে ৷ ভয়কে জয় করে এখনও পর্যন্ত গ্রামে থেকে গিয়েছেন কিছু মানুষ ৷ উৎসব যাঁদের মনকে দোলা দেয় না ৷ "যেদিন স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের কাজ শেষ করবে, সেদিন হবে আমাদের উৎসব ৷ জানি না, বেঁচে থাকতে সেই দিন আর দেখে যেতে পারব কি না ", স্বগতোক্তি ষাটোর্ধ্ব আবদুল ফরিদের ৷

