ETV Bharat / state

অস্তিত্ব সংকটে সুবাস ঘিসিং-অতুল রায়ের দল, নোটিশ নির্বাচন কমিশনের

GNLF-এর হাত ধরে পাহাড়ের অবিসংবাদি নেতা হয়ে উঠেছিলেন সুবাস ঘিসিং ৷ সমতলেও উঠে এসেছিল কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টি ৷ দুই দলই কি হারাচ্ছে তাদের অস্তিত্ব ?

ECI NOTICED 2 POLITICAL PARTY
অস্তিত্ব সংকটে সুবাস ঘিসিং-অতুল রায়ের দল (ফাইল ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 28, 2025 at 4:41 PM IST

6 Min Read
Choose ETV Bharat

দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি, 28 অগস্ট: কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টি (KPP) ও গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (GNLF) দলের অস্তিত্ব কি সংকটে ? নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্য-রাজনীতির অন্দরে। ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলের দুই জনপ্রিয় দলকে শো-কজ করেছে নির্বাচন কমিশন। কেন ? কমিশন জানতে চেয়েছে, গত ছয় বছর ধরে কেন ভোটে লড়াই করছে না তারা ? শো-কজের অবশ্য উত্তর দিয়েছে দুই দলই। শুক্রবার দুই দল কমিশনে উপস্থিত হয়ে তাদের বক্তব্যও তুলে ধরতে যাচ্ছে ৷ দুই দলের তরফেই জানানো হয়েছে, তারা সরাসরি ভোটে না-লড়লেও জোট সঙ্গীকে সমর্থনের মাধ্যমে ভোটের ময়দানে তারা রয়েছে।

গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (GNLF) পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবাস ঘিসিং এবং কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অতুল রায় দু'জনেই প্রয়াত হয়েছেন। পরে সুবাস ঘিসিংয়ের ছেলে মন ঘিসিং এবং কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টির সভাপতি অতুল রায়ের ছেলে অমিত রায় দলের সভাপতি হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক মহলের দাবি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত হওয়ার পর দুই দলেরই কিছুটা প্রভাব কমেছে ৷ সুবাস ঘিসিং বা অতুল রায়ের পর দলে যে একটা শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে বা দাপটের অভাব স্পষ্ট রয়েছে, সেই খামতির কথা স্বীকার করে নিয়েছেন অতুল পুত্র অমিত রায়ও।

গোর্খা অধ্যুষিত দার্জিলিংয়ে আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে সরব হয়েছিলেন সুবাস ঘিসিং ৷ 1980 সালে গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (জিএনএলএফ) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরপর 1986 থেকে 88 সাল পর্যন্ত গোর্খাল্যান্ডের দাবি হয়ে উঠেছিল হিংসাত্মক। শেষে মাথা নুইয়ে ছিলেন খোদ জ্যোতি বসুও ৷ ঘিসিংয়ের দাবির একাংশ মেনে কার্যত পাহাড় ছেড়ে দিতে হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারকে ৷ 1988 সালে গোর্খা পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নাম মাত্রই, আদতে এর আড়ালে পাহাড়ের অবিসংবাদি নেতা হয়ে হয়ে উঠেছিলেন ঘিসিং ৷ বন্ধ হয় হিংসা ৷ 1988 থেকে থেকে 2008 সাল পর্যন্ত পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ঘিসিং। এরপর ফের অশান্ত হয়ে ওঠে পাহাড় ৷ 2008 সালে তাঁরই এক সময়ের শাগরেদ বিমল গুরুংয়ের হাত ধরে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার (জিজেএমএম) গঠনের পর পাহাড় ছাড়তে হয় ঘিসিংকে। দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল ও ডুয়ার্স নিয়ে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে ফের উত্তাল হয়ে ওঠে পাহাড় ৷

ECI NOTICED 2 POLITICAL PARTY
পাহাড়ের একদা অবিসংবাদি নেতা সুবাস ঘিসিং (ফাইল ছবি)

মদন তামাংয়ের মৃত্যু পরে পুলিশ অফিসার অমিতাভ মালিককে খুনের পর ঘোরাল হয়ে ওঠে পরিস্থিতি ৷ পরে সেই গুরুংয়ের সামনেও মাথা নোয়াতে হয়েছিল রাজ্য সরকারকে ৷ অন্যদিকে পাহাড়ের সঙ্গে সখ্যতা বেড়েছিল বিজেপি-র ৷ কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস অন্য জায়গায়, মৃত্যুর পরও সুবাস ঘিসিংয়ের দেহ ওঠেনি পাহাড়ে। যে পাহাড়ের একমেবাদ্বিতীয়ম নেতা ছিলেন, সেই ঘিসিংয়ের দেহ নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি পাহাড়ে ৷ আর এরপরই কার্যত হারিয়ে যায় ঘিসিংয়ের তৈরি দল জিএনএলএফ ৷ কালের নিয়মে অনেকটাই স্তিমিত গুরুংয়ের জিজেএমএমও ৷ এখন অনীত থাপার হাত ধরে পাহাড়ে একছত্র রাজত্ব তৃণমূলেরই ৷

একইভাবে, জিএনএলএফ জাতীয় নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড রাজনৈতিক দল। তবে পাহাড়ের এই রাজনৈতিক দল এখনও নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে লড়ার জন্য স্বীকৃতি পায়নি। গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (GNLF) দলের মুখপাত্র ঋষি থাপা বলেন, "আমরা আইনজীবী মারফৎ আমাদের বক্তব্য নির্বাচন কমিশনকে শো-কজের উত্তর দিয়েছি। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী কোনও আঞ্চলিক দল একটানা ছয় বছর লোকসভা বা বিধানসভা ভোটে লড়াই না-করলে নির্বাচন কমিশন সেই দলের নাম বাদ দিতে পারে। আসলে আমরা 2019 সাল থেকে 2014 সাল পর্যন্ত সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না-করলেও আমাদের দল জোট শরিক দলকে সমর্থন করে ভোটে লড়াই করেছি। সেটা নির্বাচন কমিশন জানে না। আমরা কমিশনকে লিখিতভাবে আইনজীবীর মাধ্যমে এটাই জানিয়েছি । 29 অগস্ট আমরা নির্বাচন কমিশনের দফতরে গিয়ে আমরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমাদের ব্যাখ্যা দেব।"

জিএনএলএফের সম্পাদক তথা দার্জিলিংয়ের বিধায়ক নিরজ জিম্বা বলেন, "নির্বাচন কমিশনের কোথাও ভুল হচ্ছে । আমরা 2022-এ দার্জিলিং পুরসভা এবং 2023 সালে পঞ্চায়েত ভোটে লড়েছি । তার পরেও এমন কেন বলা হচ্ছে বুঝলাম না !" দীর্ঘদিন ধরে জিএনএলএফ ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) শরিক দল হিসেবে রয়েছে । লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটে বিজেপি–কে সমর্থন এবং পঞ্চায়েত ও পুরসভায় জোট করে লড়াই করছে মন ঘিসিংয়ের এই পার্টি। সরাসরি প্রার্থী না-দেওয়ায় জিএনএলএফ-কে নির্বাচন কমিশনের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এই বিষয়ে পাহাড়ের শাসক দল ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার মুখপাত্র এসপি শর্মা বলেন, "প্রতি বার জিএনএলএফ নিজের দলকে জলাঞ্জলি দেয়। এবার বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাদের প্রমাণ করতে হবে তাদের দল আগে না, তাদের স্বার্থ আগে।"

হিল তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি লালবাহাদুর রাই বলেন, "এটা হওয়ারই ছিল। যখন দলের থেকে স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পায় তখন তাই হয়। জিনএলএফেরও তাই হয়েছে।" একদা বাম ঘনিষ্ঠ জিএনএলএফ। সেই বিষয়ে প্রবীন সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য বলেন, "জিএনএলএফ পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল। এদের একটা নিজস্বতা আছে। নির্বাচন কমিশন যেটা করছে তা দুর্ভাগ্যজনক।"

কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টির সভাপতি অমিত রায় বলেন, "আমরা কেন ছয় বছর ভোটে লড়িনি তাই নোটিশ পাঠিয়েছে। আমরা কেন ভোটে লড়িনি তা জানিয়েছি। আমরা 2019 সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিনি তা বিস্তারিত জানিয়েছি। আমরা লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেছি। আমরা 2019-এ বিজেপিকে সমর্থন করেছি। 2021-এর বিধানসভা ও 2024-এর লোকসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছি। তাই আমরা আলাদাভাবে ভোটে লড়াই করিনি। আমাদের বেশ কিছু দাবি আছে। যে দল আমাদের দাবি পূরণ করে, আমরা তাদেরকেই সমর্থন করি। আমাদের আলাদা রাজ্যের দাবি রয়েছে । ভাষার দাবি আছে। যা রাজ্যের এক্তিয়ারের মধ্যে নেই । কিন্তু যে দাবিগুলো রাজ্যের এক্তিয়ার ভুক্ত, সেই দাবি নিয়ে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন করি। আমাদের কামতাপুরি মানুষের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারি সেই শর্তেই রাজ্য সরকারকে সমর্থন করে থাকি।"

প্রতিটি আঞ্চলিক দলের ফাউন্ডার মেম্বারদের বিষয় আলাদা। দলের কর্মীদের সঙ্গে অবশ্যই একটা আলাদা আবেদ জড়িয়ে থাকে। কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টি 2004 সালে অতুল রায় তৈরি করেছিলেন। কামতাপুর পিপুলস পার্টি থেকে বেরিয়েই কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টি অতুল রায়ের নেতৃত্বে শুরু হয়। কামতাপুর আলাদা রাজ্য ও কামতাপুর ভাষার স্বীকৃতির দাবিকে কেন্দ্র করেই এই দল গড়ে উঠেছিল। আর এখন সেই দাবির ভিত্তিতেই জন সমর্থনও রয়েছে বলে দাবি। অতুল রায়ের মৃত্যুর পর কি কামতাপুর প্রোগ্রেসিভ পার্টির জন সমর্থন হারিয়েছে ?

প্রশ্নের উত্তরে অমিত রায় বলেন, "সাত বছর আগে বাবা অতুল রায়ের মৃত্যু হয়েছে। এরপর আমি দলের সভাপতি হয়েছি । জাতিগত আন্দোলন আমি ছোট থেকে দেখে এসেছি। নতুন প্রজন্মও আমার পাশে আছে। আমাদের বিরোধী গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাচ্ছে। আঞ্চলিক দল একজনকে নিয়েই শুরু হয়। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন। যে কোনও আঞ্চলিক দলের প্রতিষ্ঠাতাকে দেখেই জনসমর্থন তৈরি হয়। যদি আমাদের দলের রেজিট্রেশন বাতিল হয়, তাহলে আমরা বিকল্প নাম দিয়ে দলের রেজিষ্ট্রেশন করব।"