পদ্মসম্মান বাড়িয়েছে দায়িত্ব, সততাই সম্পদ 68-র পদ্মশ্রী সনাতনের
সাবেকি ঠাকুর গড়া অনেক কঠিন ৷ তবে, থিমের পুজোকে স্বাগত জানাচ্ছেন সনাতন রুদ্র পাল ৷

Published : September 10, 2025 at 9:35 PM IST
কলকাতা, 10 সেপ্টেম্বর: মাচায় বসে মনোযোগ দিয়ে প্রতিমার চোখ আঁকছেন 68-র ভাস্কর পদ্মশ্রী সনাতন রুদ্র পাল ৷ গত বছরেই তাঁর শিল্পকর্মের জন্য পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি ৷ বয়স 68 পেরোলেও ক্লান্ত নন তিনি ৷ বরং তাঁর স্পষ্ট কথা, "পুজোর সময় আমি যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক ৷" বয়স বাড়ছে, সঙ্গে শরীরে বাসা বাঁধছে নানান রোগ ৷ তাই ওষুধ সঙ্গে রাখতেই হয় ৷ আর বাকি খাওয়া, রান্না, স্নান, ঘুম সবটাই স্টুডিয়োতেই এই ক’দিন ৷
তাঁর কথায়, "এতগুলো বছর ধরে যে কাজ করেছি, তার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি মিলেছে ৷ তাতে দম্ভ বা অহংকার নয়, বরং দায়িত্ব বেড়েছে ৷ গ্রাহকদের আমার থেকে আরও উৎকৃষ্ট মানের কাজের আকাঙ্খা বেড়েছে ৷"
সকলের কাছে সনাতন রুদ্র পাল এখন সেলিব্রিটি হলেও, নিজে তেমনটা ভাবতে নারাজ ৷ পুজো উদ্যোক্তারা আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির জেরে ৷ এবছরও 50-60 টি প্রতিমা গড়ছেন তিনি ৷ অসমেও গিয়েছে তাঁর তৈরি প্রতিমা ৷ কলকাতার কলেজ স্কোয়ার, একডালিয়া, সিমলা ব্যায়াম সমিতির মতো একাধিক নামী ও সাবেকি পুজোর প্রতিমা তাঁর হাতেই তৈরি হয় ৷ এবার নিউ জার্সিতে দু’টি ফাইবারের তৈরি প্রতিমা পাঠিয়েছেন তিনি ৷ পদ্মশ্রী সনাতনের তৈরি প্রতিমা যাবে আসানসোল, কোচবিহারেও ৷ তাই এখন দমফেলার সময় নেই ৷
একাধিক নতুন কমিটি অর্ডার দিয়েছে ঠাকুরের ৷ কারণ, ক্লাব কর্তারা চাইছেন পদ্মশ্রী প্রাপ্ত শিল্পী তাঁদের ঠাকুর করছে, এই সুনামটা অর্জন করতে ৷ প্রত্যেকেই আশা করে এই স্টুডিয়োয় ঢুকে সেরা ঠাকুরটা নিয়ে যেতে ৷ আর্থিক দিক অনেকটাই লাভবান হওয়া গিয়েছে ৷ অনেকেই বেশি টাকা দিয়ে ঠাকুর নিচ্ছেন ৷ এর একটাই কারণ, পদ্ম সম্মান অর্জন করা ৷

এ নিয়ে শিল্পীর বক্তব্য, "আগেও ভালো কাজ করতাম ৷ তবে, এখন পুরস্কারের সঙ্গে দায়িত্বটা আরও বেশি করে বেড়েছে ৷ তাই এখন বিশেষভাবে নজর রাখছি কাজের সময় ৷ কারণ, যিনি 2 লক্ষ টাকা দিচ্ছেন, তাঁকে সেই মানের ঠাকুর দিতে হবে ৷ আবার কেউ দেড় লক্ষ দিচ্ছেন বলে, তাঁর ঠাকুরের কাজে অবহেলা করব, তা হয় না ৷ আর যাঁরা ঠাকুর নিচ্ছেন, তাঁরা সকলেই সন্তুষ্ট ৷"
সাবেকি প্রতিমা যাঁর শিল্পী সত্ত্বার অন্যতম পরিচয়, তিনিও কিন্তু থিমের ঠাকুর গড়েন ৷ বরং সনাতন রুদ্র পালের কাছে তা অনেক বেশি সহজ বলে মনে হয় ৷ বরং, সাবেকি প্রতিমা গড়া অনেক বেশি কঠিন বলে মনে করেন তিনি ৷ এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, "থিমের ঠাকুর তৈরি তুলনামূলক সহজ ৷ কারণ, থিমের শিল্পী তাঁর চাহিদা অনুযায়ী আমাকে বর্ণনা দিয়ে দেন ৷ এমনকি সেই মতো স্কেচ তৈরি থাকে ৷ আর সাবেকি প্রতিমার পুরোটাই হাতের সূক্ষ্ম কাজ ৷ সেখানে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় ৷"

বিগত কয়েক বছর ধরেই সনাতন রুদ্র পালের হাতে তৈরি হচ্ছে স্থানীয় একটি ক্লাবের থিমের ঠাকুর ৷ কলকাতার থিম পুজোর রমরমাকেও তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন ৷ সাবেকি প্রতিমার মধ্যেও আনতে হয় বদল, নতুনত্ব ৷ একটা ঠাকুরের সঙ্গে অপরটির কোনও মিল নেই ৷
তাঁকে সম্মান জানানোর প্রসঙ্গে সনাতন রুদ্র পাল বলছেন, "রাজ্য তরফে অভিনন্দন জানায়নি ৷ তবে, শাসকদলের বহু নেতা ও তাদের পুজো কমিটি আমার এই পুরস্কার প্রাপ্তিকে উৎযাপন করেছেন ৷ থিম হোক বা সাবেকি নতুন শিল্পীদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সৎ থাকতে হবে ৷ যে কাজটা করবে সেটা ঠিক করে করতে হবে ৷ ফাঁকি দিয়ে পয়সা নিই না ৷"

পুজো উদ্যোক্তাদের তিনি কুর্নিশ জানিয়ে বলেন, ‘‘তাঁরা ঘরের খেয়ে এই পুজো করছেন ৷ এটাই আমাদের অনেক বড় পাওনা ৷ তাঁরা যদি পুজো করতে এগিয়ে না-আসতেন, তাহলে আমরা কাজ পেতাম না ৷ তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ ৷"
বাংলার দুর্গা পুজো এখন বিশ্ব দরবারে খ্যাতি মিলেছে ৷ তার কৃতিত্ব অবশ্যই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়েছেন তিনি ৷ সনাতন রুদ্র পালের কথায়, "এটা আমাদের গৌরবের ৷ বঙ্গবাসী, শিল্পী সকলের কাছে গৌরবের ৷ দুর্গা কার্নিভাল করার মধ্যে দিয়েই বিদেশিদের ডেকে তাঁদের আকর্ষিত করেছিলেন ৷ কুমোরটুলিতে হয়তো বিদেশিরা আসেন, তবে তাঁর এই কর্মকাণ্ড বিদেশি মনে অনেকটাই দাগ কেটেছে ৷ দুর্গাপুজো বিশ্বের দরবারে সম্মানিত হয়েছে, ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে, তাই মুখ্যমন্ত্রীকে কৃতিত্ব জানাচ্ছি ৷"

