1029 বছরের মল্লরাজাদের মৃন্ময়ী, দিন দশেক আগেই শুরু বাংলার আদি পুজো
শহর কাঁপিয়ে পরপর তোপের শব্দ। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ পরিবারে ব্যস্ততা চরমে । পুজোর বাকি এখনও 10 দিন, তার আগেই শুরু বাংলার আদি পুজো ৷

Published : September 17, 2025 at 4:44 PM IST
বাঁকুড়া (বিষ্ণুপুর), 17 সেপ্টেম্বর: রাজা নেই, রাজ্যপাটও মুছে গিয়েছে আগেই ৷ কিন্তু বিষ্ণুপুরের মল্লরাজের কুলোদেবী মৃন্ময়ীকে ঘিরে আজও হাজারও গল্পকথা ঘুরে বেড়ায় আকাশে-বাতাসে। আজও পুজো এলে প্রাচীন মৃন্ময়ী মন্দিরে রীতি মেনে আসেন বড় ঠাকরুণ, মেজ ঠাকরুণ, ছোট ঠাকরুণ। এই তিন ঠাকরুণই আসলে দেবীর বিভিন্ন রূপ। সেই রূপের একেকটি পটচিত্র। প্রায় হাজার বছরেরও বেশি আগের প্রাচীন রীতি মেনে মঙ্গলবার থেকে দেবী মৃন্ময়ীর পুজো শুরু হল।
এদিন সকালে শহর কাঁপিয়ে পরপর তোপধ্বনি শোনা গেল। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ পরিবারে ব্যস্ততা চরমে । কোনও অঘটন না-ঘটলেও এই শব্দ জানান দিল বাংলার আদি পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে ৷ পুজোর ঢাকে কাঠি পড়তে এখনও দিন দশেক বাকি থাকলেও উৎসবের মেজাজ বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ পরিবারে ৷ দেবী মৃন্ময়ী হলেন মল্লরাজ পরিবারের কুলোদেবী। সারাবছরই তিনি বিষ্ণুপুর শহরে রাজ পরিবারের যে মন্দির রয়েছে সেখানে অধিষ্ঠান করেন। কথিত রয়েছে, বাংলার সবচেয়ে পুরনো দুর্গাপুজো হল এই মল্লরাজ পরিবারের কুলোদেবী মৃন্ময়ীর পুজো।
997 সালে শুরু মল্ল পরিবারের পুজো
মল্ল পরিবারের প্রাচীন ইতিহাস সূত্রে জানা গিয়েছে, 997 খ্রিস্টাব্দের আগে মল্লরাজাদের রাজধানী ছিল জয়পুরের প্রদ্যুম্নপুর এলাকায় । 997 সালের কোনও একটি সময়ে 19তম মল্লরাজ জগৎমল্ল জঙ্গলে শিকার করতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। কথিত আছে, পথের খোঁজ করতে গিয়ে ক্লান্ত জগৎমল্ল একসময় বটগাছের তলায় বসে বিশ্রাম করছিলেন। সেখানেই নানা অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় রাজাকে। শেষে রাজা ওই বটগাছের নীচে দেবী মৃন্ময়ীর মন্দির স্থাপন করার দৈববাণী পান। নির্দেশ মতো রাজা জগৎমল্ল বটগাছের নীচেই দেবীর সুবিশাল মন্দির তৈরি করেছিলেন । পাশাপাশি ঘন জঙ্গল কেটে জগৎমল্ল রাজধানী সরিয়ে আনেন এই বিষ্ণুপুরে।

মৃন্ময়ী মন্দিরের পাশে কামান দাগা হয় আজও
তারপর দীর্ঘ 1029 বছর ধরে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী রয়েছেন মল্লরাজদের কুলোদেবী মৃন্ময়ী। পরবর্তীতে মল্লরাজারা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হলে শব্দকে ব্রহ্মজ্ঞান করে তোপধ্বনির প্রচলন শুরু হয়। সেই প্রথা আজও চলে আসছে। পুজোর প্রতিটি নির্ঘণ্ট আজও ঘোষিত হয় তোপধ্বনির মাধ্যমে ৷ একসময় এই তোপের শব্দ শুনে দূর-দূরান্তের প্রজারা জানতে পারতেন দেবীর আগমন বার্তা ৷ তবে কালের নিয়মে এখন সেই পরিসর ছোট হয়েছে ৷ কিন্তু, বন্ধ হয়নি তোপধ্বনির সেই রেওয়াজ । মা মৃন্ময়ী মন্দিরের পাশে গোপালসায়েরে পাড়ে কামান দাগা হয় আজও । আনন্দে মেতে ওঠে প্রাচীন মল্লভূমের আপামর মানুষ।

পুজোয় রীতি ভিন্ন
- এখানকার পুজোয় রয়েছে এক ভিন্ন রীতি। সাধারণত, রাজ্যে দুর্গাপুজো কালিকাপুরাণ মতে শুরু হয় ৷ কিন্তু সেই শুরু থেকে এই পরিবার দেবী মৃন্ময়ীয় পুজো করে একটি প্রাচীন বিশেষ পুঁথি অনুসারে।
- 'বলিনারায়ণি' নামে সেই পুঁথির নিয়ম নীতি মেনেই মল্লরাজ পরিবারের পুজো হয় এখনও।
- রাজার পুজো, তাই পুজোর নিয়ম কানুনও ভিন্ন ধরনের । এই পুজো শুরু হয়, জিতাষ্টমীর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ নবমী তিথি ধরে।
- এই বছরও তার অন্যথা হল না। নবমাদি কল্পারম্ভে সাত সকালে দেবীর আগমন ঘটল প্রাচীন মন্দিরে।

মৃন্ময়ী মন্দিরে রীতি মেনে আসেন বড়, মেজ, ছোট ঠাকরুণ
- প্রাচীন রীতি অনুসারে রাজদরবার সংলগ্ন গোপালসায়রে স্নানপর্ব সেরে মন্দিরে আনা হয় বড় ঠাকুরানি অর্থাৎ মহাকালীকে ।
- দেবীপক্ষের চতুর্থী তিথিতে মন্দিরে আসবেন মেজ ঠাকুরানি অর্থাৎ মহালক্ষ্মী।
- সপ্তমীর দিন আনা হবে ছোট ঠাকুরানি অর্থাৎ মহাসরস্বতীকে।
- এই তিন ঠাকুরানি আসলে স্থানীয় ফৌজদার পরিবারের হাতে আঁকা তিনটি বিশেষ পট।
- তাঁদের আরাধনা হয় নিয়ম মেনে।

মল্লরাজাদের নির্দশন, ইতিহাস ফিসফিস কথা বলে

ইতিহাস কখনও পরিবর্তিত হয় না ৷ হয় না তার অভিযোজনও। কালের নিয়মের সঙ্গে রাজার রাজপাট চলে গিয়েছে, মাটিতে মিশেছে মল্লদের রাজপ্রাসাদ । গড়ের মতো আকার নিয়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন মল্ল রাজধানী বিষ্ণুপুর, আজ একটি আধুনিক শহর। তবুও মল্লরাজাদের ফেলে যাওয়া নির্দশন আর ইতিহাস আজও ফিসফিস কথা বলে। আজও দেবীর আগমনে মল্লভূমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পুজোর গন্ধ, মেতে ওঠেন সারা মল্লগড় বিষ্ণুপুর নিবাসী।

মঙ্গল থেকেই মল্লগড় শারদীয়ায় মেতে
রাজপরিবারের বর্তমান যাঁরা উত্তরসূরি রয়েছেন তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সুতোয় টান পড়লেও পুজো ক'টাদিন যেন তাঁরা এক। নেই রাজত্ব, নেই রাজাও। তবুও নিষ্ঠাভরে পালিত হয়ে আসছে শতাব্দী প্রাচীন মল্লরাজের পরিবারের পুজোর রীতিনীতি। রুজির টানে রাজপরিবারের সদস্যরা এদিক-ওদিক গেলেও এইসময় ঠিক হাজির হন মল্লদের ঠাকুর দালানে। এবারও সেভাবেই শারদীয়ায় মেতে মল্লগড় ৷

