এবারে সাবর্ণ পাড়ার বড়িশা সর্বজনীনে 'স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল'
হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দিয়ে গড়ে উঠছে মণ্ডপ ৷ এবারের বড়িশা সর্বজনীন দুর্গোৎসবের থিম তুলে ধরলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি নবনীতা দত্তগুপ্ত ৷

Published : September 16, 2025 at 8:29 PM IST
কলকাতা, 16 সেপ্টেম্বর: প্রতিবছরই নিত্য নতুন ভাবনায় সাজিয়ে তোলা হয় বড়িশা সর্বজনীনের পুজোর মণ্ডপ। 77তম বর্ষে বেহালার সাবর্ণ পাড়ার 'বড়িশা সর্বজনীন দুর্গোৎসব'-এর এবারের থিম 'স্বর্গ মর্ত্য পাতালে... খনন কার্য চলছে'।
স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল - হিন্দুধর্মে ত্রিলোক বা এই তিন জগতের কথা জানা যায়। স্বর্গ দেবতাদের বাসভূমি, মর্ত্য মানুষ ও পাতাল রাক্ষস বা অসুরদের বিচরণক্ষেত্র। মাটির নীচে অনেক গভীরে রয়েছে এই পাতাল লোক। শাস্ত্র অনুসারে দানব, রাক্ষস ও নাগেরা পাতালে বাস করে। মর্ত্য কেমন সে তো আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। কিন্তু স্বর্গ ও পাতাল সম্পর্কে আদিকাল কৌতুহল রয়েছে মানুষের মনে। সাধারণ ভাবে মনে করা হয় দেবতাদের বাসভূমি স্বর্গ অত্যন্ত সুন্দর স্থান। সেই কারণে মর্ত্যের সুন্দর স্থানকে স্বর্গের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল থিমের উদ্দেশ্য
বড়িশা সর্বজনীন দুর্গোৎসব-এর সচিব সুদীপ চক্রবর্তী জানান, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল থিমের উদ্দেশ্য মানুষের মনের মধ্যে যে স্তরগুলে রয়েছে সেগুলো ছুঁয়ে যাওয়া ৷ মানুষের মধ্যে যে উন্নত স্তর আছে সেটাকেই আমরা স্বর্গ বলছি ৷ মনের মধ্যে যে খারাপ দিকটি আছে সেটাই পাতাল অর্থাৎ নড়ক, আর মানুষের যে রূপ সকলের সামনে অর্থাৎ প্রকৃত যে রূপ তাই হল মর্ত্য ৷

মণ্ডপশিল্পী তপন কুমার শেঠ। মন্দির প্রাঙ্গণে পুজোর জন্য বরাদ্দ করা যে জায়গা সেখানে সাড়ে 5 ফুট খনন করা হয়েছে মণ্ডপ তৈরির জন্য। সেখানেই তুলে ধরা হবে একটুকরো স্বর্গ মর্ত্য এবং পাতাল। সুতরাং প্রতিমা দর্শন করতে এবং মণ্ডপ সজ্জা দেখতে দর্শনার্থীদের যেতে হবে মাটির নীচে।
মণ্ডপসজ্জা
মূল মণ্ডপ এখানে একটি খনন স্থলের আধার। যেখানে আলো স্বর্গ থেকে পৃথিবী হয়ে পাতাল পর্যন্ত চলমান। সিন্ধু থেকে মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা সভ্যতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পরিবেশে প্রাচীন গঠন এবং ধ্বংসাবশেষের আসল জাদু আলোকসজ্জার মধ্যে অন্তর্নিহিত। মণ্ডপটি আলো রহস্য এবং ঐশ্বরিক আবিষ্কারের খেলায় পরিণত হবে বলে আশ্বাস উদ্যোক্তাদের।

মাটির নীচে এই প্রথমবার থিমের কাজ
শিল্পী তপন শেঠের সহকারী তমাল চৌধুরী বলেন, "বড়িশা সর্বজনীনের এবারের থিম স্বর্গ মর্ত্য পাতালে... খননকার্য চলছে। এটা একেবারে নতুন প্রয়াস। পুরাকালের ভাস্কর্য তুলে ধরা হচ্ছে এই থিমের মাধ্যমে। মাটির নীচে সম্ভবত এই প্রথমবার থিমের কাজ হচ্ছে। সম্পূর্ণ অন্য ভাবনায় গড়া এই থিম। আড়াই মাস ধরে কাজ চলছে মণ্ডপের। এর মাঝে আমাদের সঙ্গে বৃষ্টিবাদল সবই আছে। একেবারে মাটির নীচে এই কাজ এই প্রথম করছি। ফলে, বিষয়টা আমাদের কাছেও নতুন।"

হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতার স্থাপত্য থেকে ভাস্কর্য
তিনি আরও বলেন, "মাটির নীচে চলছে কাজ ৷ তার উপর যখন তখন বৃষ্টি। প্রতিকূলতা কাটিয়ে অনেকটা কাজই এগোতে পেরেছি। কাজ এখনও বাকি অনেক। হয়ে যাবে আশা রাখি। মহেঞ্জোদারো বা হরপ্পাই নয় আরও অনেক সভ্যতার স্থাপত্য, ভাস্কর্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। বাসনপত্র, খেলনা, মোহর সবই সাজানো রয়েছে এখানে। মূলত মাটি দিয়েই তৈরি হচ্ছে সবকিছু। এ ছাড়া ইটেরও কাজ আছে।"

মণ্ডপসজ্জার প্রধান উপকরণ মাটি
এক পুজো উদ্যোক্তা বলেন, "যে মাটি খুঁড়ে তোলা হচ্ছে সেটাই কাজে লাগানো হচ্ছে মূর্তি তৈরিতে।" বড়িশা সর্বজনীন দুর্গোৎসব-এর সচিব সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, "মণ্ডপ দেখতে হলে এবার দর্শনার্থীদের আসতে হবে মাটির নীচে। আমাদের প্রধান উপকরণ মাটি। মাটির সঙ্গে আরও কিছু প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। যাতে কোনওরকম সমস্যা না-হয় ৷ এই থিমের মাধ্যমে মানুষ যেমন ইতিহাসের ছায়া পাবে তেমনি মনের মধ্যেকার যে স্তর সেগুলো আমরা ছোঁয়ার চেষ্টা করছি। কথা দিচ্ছি শিহরিত হবেন মানুষ। মূর্তি, মুদ্রা, গয়না সবই মাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। স্বর্গ দেখানোর কাজও চলছে তিনটের জন্যই আলাদা সেগমেন্ট থাকবে।"

তাঁর আরও সংযোজন, "পুজোর পাশাপাশি মানুষের কল্যাণের জন্য নানা ধরনের সামাজিক কাজও করি আমরা। আমাদের প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। সেখানেও আছে দারুণ চমক। তার জন্য আর তো মাত্র ক'দিনের অপেক্ষা।"

প্রসঙ্গত, গতবছর বড়িশা সর্বজনীন দুর্গোৎসবের থিম ছিল 'রুদ্রাণী'। মণ্ডপ শিল্পী ছিলেন অনিমেষ দাস। প্রতিমা গড়েন সৌমেন পাল। গত বছর প্যান্ডেলের থেকেও বেশি জোর দেওয়া হয় মূর্তির উপরে। লোহার কাঠামোর উপরে মাটি আর ফাইবার দিয়ে প্রতিমা তৈরি হয়েছিল গতবছর। ছিল থ্রিডি ফিনিশ। 360 ডিগ্রি কোণেও দেখা গিয়েছিল মায়ের প্রতিমা। লোহা, নেট, প্লাইউড, চায়ের কাপ দিয়ে তৈরি হয়েছিল প্যান্ডেল। উল্লেখ্য, এই পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বড় মেলা বসে। অন্যথা হবে না এবারেও।

