দুর্গার বাঁ-দিকে গণেশ; 400 বছরের পুজোয় শত্রু বলির প্রচলন চক্রবর্তী পরিবারে
ভদ্রেশ্বরে 400 বছরের পুরনো দুর্গাপুজোয় পশু-ফল-সবজি নয়, শত্রু বলি হয় ৷ 'অদ্ভুত' এই পুজোর নিয়ম তুলে ধরলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পলাশ মুখোপাধ্যায় ৷

Published : September 15, 2025 at 6:49 PM IST
ভদ্রেশ্বর, 15 সেপ্টেম্বর: হাতে আর দিন পনেরোও বাকি নেই ৷ মাতৃশক্তি অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আরাধনার প্রস্তুতিতে উন্মাদমা তুঙ্গে ! ইতিমধ্যেই মা দুর্গাকে আনার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ক্লাব কর্তৃপক্ষ থেকে শিল্পীরা ৷ কলকাতা সেজে উঠেছে উৎসবের মেজাজে ৷ শহরের পাশাপাশি বনেদি বাড়িগুলিতেও এখন শেষ মুহূর্তের পুজোর প্রস্তুতি চলছে ৷ আসলে শতাব্দী প্রাচীন বনেদি বাড়ির পুজোগুলির রীতি আজও দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য বহন করে ৷ এমনই এক বনেদি বাড়ির পুজো হল হুগলির ভদ্রেশ্বরের চক্রবর্তী বাড়ির দুর্গাপুজো ৷ এই পুজোয় মা উমার ডানদিকে নন, বাঁ-পাশে থাকেন বড় ছেলে গণেশ ৷ আর এখানে পশু-ফল-সবজি নয়, শত্রু বলির প্রচলন রয়েছে ৷
হিন্দুধর্মে সমস্ত পুজোর আগে ভগবান গণেশের পুজোর প্রচলন আছে। এছাড়াও, গণেশ সাধারণত মা দুর্গায় পুজোয় ডানদিকে থাকেন ৷ কিন্তু ভদ্রেশ্বরের চক্রবর্তী বাড়ির পুজোয় উল্টো দিকে গণেশের স্থান একচালার দুর্গামূর্তিতে। 400 বছর ধরে মা দুর্গার বাঁ-দিকে গণেশকে রেখে পুজো চলে আসছে এই পরিবারে ৷ পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে জানা গিয়েছে, সিপাহী বিদ্রোহের আগে থেকেই এই দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। এখানে পশু বলির রীতি বর্তমান ৷
চক্রবর্তী পরিবারের পুজোর ইতিহাস
স্বাধীনতার পর পূর্ব বঙ্গ থেকে হুগলিতে বসতি স্থাপনে চলে আসে চক্রবর্তী পরিবার। বাড়ির পুরুষরাই প্রথা মেনে এই হোম যজ্ঞ ও বলিদান করেন। কিন্তু কেন কার্তিক-গণেশের দিক পরিবর্তন ? কেনই বা পশু বলি বন্ধ হয়ে গেলেও শত্রু বলির প্রচলন আজও রয়ে গিয়েছে এই পরিবারে ? সেই সব ইতিহাস তুলে ধরল ইটিভি ভারত ৷

বাংলাদেশে প্রচলিত দুর্গাপুজো
অবিভক্ত বঙ্গদেশে চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গাপুজোর প্রচলন অনেক আগে থেকেই। সেইসময় রাজা, জমিদাররা বাড়িতেই মূলত একচালা দুর্গাপুজোর শুরু করেন। সেই দুর্গাপুজো ঘিরে নানা কাহিনি ও গল্প রয়েছে। ভদ্রেশ্বরের এই পরিবার উপাধি পেয়ে চক্রবর্তী পদবি গ্রহণ করেন তৎকালীন সময়ে। বর্তমানে বাংলাদেশের ঢাকার বাঘড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন চক্রব্রতী পরিবারের পূর্বপুরুষরা।

ভদ্রেশ্বরে বসতি স্থাপন চক্রবর্তী পরিবারে
ইংরেজ আমলে পূর্ববঙ্গে এই চক্রবর্তী পরিবারের বংশধর প্রভাত চন্দ্র পাটকলগুলিতে কাঁচা পাটের রফতানি করত। তা থেকেই প্রতিপত্তি বাড়ে এই পরিবারের। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে থাকে। সেই জন্য প্রভাত চন্দ্রের বংশধররা ঠিক করেন ভারতে চলে আসার। ব্যবসা অব্যাহত রাখতে হুগলি নদীর গঙ্গার ধারে জুটমিল এলাকায় ভদ্রেশ্বরে বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু পাটের ব্যবসা স্থায়ী হয়নি।

1857 খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের সময়ের পুজো
এদেশেও এই প্রাচীন দুর্গাপুজোকে বাঁচিয়ে রেখেছে চক্রবর্তী পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম ৷ চক্রবর্তী বাড়ির পুত্রবধূ জয়শ্রী চক্রবর্তী বলেন, "আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, 1857 সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় বাংলাদেশে (বর্তমান) পুজো হতো। 1947 সালেও পুজো হয়েছিল। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর হুগলির ভদ্রেশ্বরে চলে আসে আমাদের পরিবার। ঢাকার মুন্সিগঞ্জ জেলার বাঘড়া গ্রামে আমাদের পরিবারের বাড়ি ছিল। সেইসব প্রতিবেশীদের ভদ্রেশ্বরে নিয়ে এসে লাইব্রেরি রোডের পাশে বাঘড়া কলোনি তৈরি করেন পূর্বপুরুষরা।"

22টি ঘট প্রতিস্থাপনে দুর্গাপুজো
তিনি আরও বলেন, "আমাদের নারায়ণ পুজো দিয়ে দুর্গাপুজো শুরু এবং শেষ হয়। বিশেষত্ব হল-কার্তিক ও গণেশের দিক পরিবর্তন ৷ হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, গণেশের আগে পুজো হয়, তাই দুর্গার বাঁ-দিকে সিদ্ধিদাতাকে রাখা হয় ৷ চণ্ডীর ঘটের পাশেই থাকে গণেশকে। আমাদের দুর্গাপুজো হয় 22টি ঘটে। ঘটের উপর শুকনো নারকেল ও কলার ছড়া দেওয়া হয়। যাতে কেউ দেখতে না, পায় তাই কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।"

শত্রু বলি প্রচলিত
জয়শ্রী চক্রবর্তীর আরও সংযোজন, "আমাদের অন্নভোগের প্রচলন রয়েছে। আগে আমাদের পশু বলির নিয়ম ছিল কিন্তু বর্তমানে চালকুমড়ো ও আখ বলি হয়। এই পুজোয় একটি বিশেষ বলি হয় তা হল শত্রু বলি। চালের গুঁড়ি দিয়ে কচুপাতা মুড়ে বলি করা হয়। এর জন্য বিশেষ মন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই প্রথা পরিবারের পুরুষরাই করে থাকেন। এরপর সেই কচুপাতা পা-দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের পরিবারের নিজস্ব পুঁথি রয়েছে। সেই পুঁথি মেনেই হোম, যজ্ঞ হয়ে আসছে প্রায় 400 বছর ধরে।"
দুর্গার বাঁ-দিকে গণেশ এবং ডানদিকে কার্তিক
পরিবারের বর্তমান পুরোহিত জয়ন্ত চক্রবর্তী বলেন, "মা দুর্গার বাঁ-দিকে গণেশ এবং ডানদিকে কার্তিক রয়েছে। পূর্ব বঙ্গের দিক নির্দেশ ও বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী কার্তিক, গণেশের দিক পরিবর্তন করা হয়েছে। পরিবারের সুখ সমৃদ্ধির জন্যও এই ব্যবস্থা ৷ ওনাদের আলাদা পুঁথি আছে। বৃহন্নন্দিকেশ্বর মতে পুজো হয়। তবে কিছু কিছু অংশ তন্ত্রমতে পুজো হয়। এখানে একটি বিশেষ বলি হয়, শত্রু বলি।"

আতপচালের গুঁড়ির পুতুল কচুপাতায় মুড়ে বলি
তাঁর কথায়, "এখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে শত্রুতা তা নয়, ষড়রিপু অর্থাৎ হিন্দুধর্মে, মানব মনের ছয়টি শত্রু। সেগুলো হল, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। ষড়রিপুর নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য মানুষকে মোক্ষ লাভে বাধা দেয়। সেইসঙ্গে রোগ ব্যাধি মূল শত্রু মানবশরীরে। তার প্রতীক রূপে আতপচালের গুঁড়ি দিয়ে পুতুল তৈরি করা হয়। তার বিনাশ করার জন্য তা কচুপাতায় মুড়ে বলি দেওয়ার প্রচলন আছে।"

