দুর্বারের 30 বছর পূর্তিতে ফ্যাশন শো, অংশ নেবেন দেশ-বিদেশের যৌনমকর্মীরা
1995 সালের 12 জুলাই তৈরি হয়েছিল যৌনকর্মীদের জন্য এই সংগঠন ৷ 30 বছর পূর্তিতে কলকাতার একটি পার্কে চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে ৷

Published : July 12, 2025 at 7:55 PM IST
কলকাতা, 12 জুলাই: আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছাপ রাখছেন যৌনকর্মীরা । তাঁদের সন্তানেরাও । আন্তর্জাতিকস্তরে উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে নাচ-গান নাটকের এবার ফ্যাশন শোয়ে হাঁটছেন তাঁরা ।
যৌনকর্মীদের সংগঠন দুর্বারের 30 বছর পূর্তি উপলক্ষে কলকাতার এক পার্কে চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে । সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, প্যানেল আলোচনা, যৌনকর্মীদের সংগ্রামের কাহিনি, অধিকার রক্ষার জোরালো বার্তা এবং সর্বোপরী উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ । সেখানেই যৌনকর্মী এবং তাঁদের সন্তানেরা ফ্যাশান শোয়ে অংশগ্রহণ করবেন ।
ইতিমধ্যে 65 জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যাঁরা ফ্যাশন শোতে অংশ নেবেন । সংগঠনের সচিব বিশাখা লস্কর জানিয়েছেন, সংখ্যাটা আরও বাড়বে । নাচ-গান-নাটক-সহ ফ্যাশন শোতে অংশ নেবেন । সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে যৌনকর্মীদের শ্রমিকের স্বীকৃতি দেওয়ার আওয়াজও তোলা হবে ।
তিন দশক পেরিয়ে ‘দুর্বার’ আজও অপ্রতিরোধ্য, অদম্য বলা যায় । কারণ, দুর্বার কেবল বাংলার নয়, ভারত ও বিশ্বের যৌনকর্মীদের সংগ্রামে এক অনুপ্রেরণার যোগাচ্ছে । এই 30 বছরের গৌরবোজ্জ্বল উদযাপনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে । যেখানে দেশ বিদেশের যৌনকর্মীরা অংশগ্রহণ করছেন । নেপাল-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থেকে আগত যৌনকর্মীরা অংশ নেবেন ফ্যাশান শোতে ।
মূলত, নিজেদের অস্তিত্ব বোঝাতে, নিজেদের তুলে ধরতে তাঁরা ফ্যাশান শোতে অংশ নেবেন । ইতিমধ্যে, নেপালের পোখরা থেকে যৌনকর্মী মায়া তামাং, বিমলা গুরুং, স্বপ্না সুনার এবং লক্ষ্মীরানা ভাট কলকাতায় এসেছেন । তাঁরা আগামিকাল রবীন্দ্র সরণি সংলগ্ন রবীন্দ্র কানন পার্কে ফ্যাশান শোতে অংশ নেবেন ।
বছর 38-এর যৌনকর্মী মায়া তামাং বলেন, "আমরাও যে আর পাঁচজনের মতো । আলাদা কেউ নই । আমরা নাচ, গান, নাটকে অভিনয়ে অংশ গ্রহণ করি । আমাদের ছেলে মেয়েরাও উচ্চশিক্ষিত । ফলে, আমরা কেন ফ্যাশন শোতে অংশ নিতে পারব না ? আমরা নিজেদের তুলে ধরতে চাই । আমরা পিছিয়ে থাকতে চাই না ।"
নেপালের যৌনকর্মীদের সংগঠন গোরেটো । তাঁদের নেত্রী লক্ষ্মীরানা ভাট । তিনিও ফ্যাশন শোতে অংশ নেবেন । তাঁর কথায়, "আমরা এর আগে নেপালে ফ্যাশন শোতে অংশ নিয়েছি । এখানেও অংশ নেব । নেপালি ট্র্যাডিশনাল পোশাকের সঙ্গে বাঙালি শাড়ি পরে সকলের সামনে আসব । কলকাতা বা ভারতের মতো আমরা রাস্তা থেকে কাস্টমার পাই না । আমরা মূলত হোটেল বা অনলাইনে যোগাযোগ করি । অর্থাৎ, আমাদের আড়ালে থেকেই কাজ । কিন্তু, আর পাঁচজনের মতো শ্রমিকের আধিকার চাইছি । তাঁদের মতো সমাজের বিভিন্নস্তরে ছাপ রাখতে চাইছি । সাংস্কৃতিক স্তরে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইছি ।"
কার্যত, একই সুর শোনা গেল নেপালের যৌনকর্মী বিমলা গুরুং, স্বপ্না সুনার গলায় । তাঁরা বলেন, "ফ্যাশান শোতে অংশগ্রহণের আলাদাই আনন্দ । ঠিক যেমন সেলিব্রেটিরা অংশ নিয়ে থাকেন । আমরা ফ্যাশন শোতে হাঁটব । ওয়েস্টার্ন পোশাকের সঙ্গে ভারতীয় পোশাকের মেল বন্ধন ঘটাব । একটা নতুনত্ব ব্যাপার আছে ।"
দুর্বারের সচিব বিশাখা লস্কর বলেন, "আমাদের মধ্যে অনেকেই লুকিয়ে এই পেশাতে আছেন । বিশেষ করে যারা দূরদূরান্ত থেকে কলকাতায় কিংবা অন্য জেলায় গিয়ে এই পেশায় থাকেন, তাঁদের মধ্যে শিল্পী সত্তা আছে । তাদের ইচ্ছা থাকে ফ্যাশন শো, নাচ, গান, নাটকে অংশগ্রহণে । একইভাবে ফ্যাশন শোতে অংশ নেবেন । ফ্যাশন শোতে অংশ নিলে মেকআপ করে নেবেন । ফলে হঠাৎ করে তাঁদের চিনে ফেলার বিষয়টাও থাকছে না । একইভাবে তাঁদের ইচ্ছা ও স্বপ্নপূরণ হোক ঘটছে এই ফ্যাশন শোয়ের মাধ্যমে ।"
1995 সালের 12 জুলাই প্রয়াত ড. স্মরজিৎ জানার নেতৃত্বে দুর্বার প্রথম আত্মপ্রকাশ করে । নারী, রূপান্তরকামী ও পুরুষ যৌনকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে গড়ে ওঠা দুর্বার শুরু থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে যৌনকর্মীদের অধিকার, মর্যাদা ও স্বীকৃতির জন্য লড়াই করে চলেছে । সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া জীবনকে পেছনে ফেলে, যৌনকর্মীরা গড়ে তুলেছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পাচার রোধ এবং সমান অধিকারের জন্য লড়াইয়ের পথ ।
রবিবার যৌনকর্মীদের ফ্যাশন শো করার পর সোমবার ওই একই জায়গায় যৌনকর্মীদের সন্তান এবং রূপান্তরকামীদের জন্য ফ্যাশন শো আয়োজন করা হয়েছে । সেখানেও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রূপান্তরকামীরা অংশ নেবেন । কোচবিহারের প্রিয়গঞ্জ কলোনীর রেড লাইট এরিয়ায় থাকেন সুইটি সিং । তিনি বলেন, "সরকার এবং আইনি স্বীকৃতি থাকলেও আমাদের নিয়ে এখনও মাঝে নানা অংশে নাক সিটকানি, বাঁকা চোখে দেখার বিষয়টা আছে । অথচ আমরা প্রতিষ্ঠিত ।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে আইনজীবী আছেন ৷ ডাক্তার আছেন৷ অধ্যাপক আছেন । অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন । কিন্তু পড়াশোনা থেকে শুরু করে নানা অংশে আমাদের শেখার যে সুযোগ সেটা এখনও সমান নয় । আমরা যদি সে সমান সুযোগ পাই, তাহলে আমরা কোনও অংশে পিছিয়ে থাকব না । আমার পরবর্তী অর্থাৎ আমি যদি কোনও বাচ্চা দত্তক নিই, তাহলে সেও আমার থেকে অনুপ্রাণিত হবে ।"

