আগুনে ভস্মীভূত হলং বাংলো পুনরায় তৈরির ডিপিআর জমা পড়ল, আশায় বুক বাঁধছে পর্যটন মহল
খুব শিগগিরই ঠিক আগের মতো করেই তৈরি করা হবে হলং বনবাংলো । আশার আলো দেখছে পর্যটন মহল ৷

Published : July 7, 2025 at 4:54 PM IST
জলপাইগুড়ি, 7 জুলাই: আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক হলং বাংলো পুনরায় তৈরি করবে বন দফতর । ইতিমধ্যেই ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট জমা পড়েছে রাজ্য সরকারের কাছে । খুব শিগগিরই ঠিক আগের মতোই মাথা তুলে দাঁড়াবে হলং বাংলো ।
ডুয়ার্সের জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান বলতেই মাথায় সবার আগে আসে একশৃঙ্গ গণ্ডার ৷ আর তারপরেই পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলং বনবাংলো । ঐতিহ্যবাহী এই বাংলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা স্মৃতি ৷ ভ্রমণপিপাসুরা এই বাংলোর বুকিং পেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন ৷ গ্যাঁটের কড়ি অনেকটাই খসাতে হলেও তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না পর্যটকরা ৷ কারণ এই বাংলোতে রাত কাটানোর আনন্দ থেকে তাঁরা বঞ্চিত থাকতে চাইতেন না ৷
এই বাংলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল, এর সামনে বন্যপ্রাণীদের খাওয়া-দাওয়া করার একটা বড় জায়গা করা আছে । সেখানে হাতি, গণ্ডার, বাইসন-সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীরা খেতে আসে । ফলে পর্যটকরা খুব সামনে থেকেই বন্যপ্রাণীদের দেখতে পান । তবে গত বছরের 18 জুন রাতে বিধ্বংসী আগুন লাগে এই ঐতিহ্যবাহী বাংলোয় ৷ পুড়ে ছাই হয়ে যায় গোটা বনবাংলো ৷ তারপর থেকেই বিরাট ধাক্কা খায় জলদাপাড়ার পর্যটন ৷
আগে এই হলং বাংলোয় ভিড় জমাতেন দেশি বিদেশি পর্যটকরা ৷ তবে তা পুড়ে যাওয়ার পর থেকে পর্যটকরা অনেকেই মুখ ফিরিয়েছেন জলদাপাড়া থেকে । সেই কারণেই পর্যটন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পর্যটকরা চাইছিলেন, এই বাংলোটি আবার আগের মতো করে তৈরি করা হোক । এই বাংলো নিয়ে পর্যটন মহলের আবেগের কথা মাথায় রেখেই রাজ্য বন দফতর তৎপর হয়েছে ৷ তারা ঠিক করেছে, ঠিক আগের মতো করেই পুরনো কাঠের হলং বাংলোকে ফিরিয়ে দিতে হবে । ইতিমধ্যেই বন দফতরের পক্ষ থেকে বাংলোকে নয়া রূপ দেওয়ার জন্য জমা করা হয়েছে ডিপিআর । সেটি অনুমোদন পেলেই হলং বাংলো তৈরির কাজ শুরু হবে বলে আশাবাদী বন দফতরের কর্তারা ।
সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যের সবক'টি জাতীয় উদ্যানের জঙ্গল খুলে গেলেই পুজোর বুকিং শুরু হয়ে যাবে । নয়া বাংলোটি তার মধ্যে তৈরি হয়ে গেলে জলদাপাড়াতে হলং বাংলোয় থাকার জন্য প্রচুর পর্যটক আসবেন, জাতীয় উদ্যান ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব, এমনটাই আশা করা হচ্ছে । আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর রাজ্যের বন প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত) বীরবাহা হাঁসদা জলদাপাড়ায় গিয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বাংলোটি পুনরায় তৈরি করা হবে ৷ অবশেষে ধীরে ধীরে সেই বাংলো তৈরির পদক্ষেপ করা হচ্ছে ।
ডুয়ার্স ট্যুরিজম ডেভলপমেন্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক দিব্যেন্দু দেব জানান, "পর্যটন মানচিত্রে হলং বাংলো একটা আইকন । হলং বাংলোকে কেন্দ্র করে জলদাপাড়ায় প্রচুর পর্যটক আসেন । বাংলোটি পুড়ে যাওয়ার আগে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পর্যটকরা যদি বুকিং না-পেতেন, তাহলে বাংলোর সামনে ছবি তুলে নিজেদের আশ মেটাতেন । আমরা চাই আগের মতোই কাঠ দিয়ে তৈরি হোক হলং বাংলো । হলং বাংলোটি আবার তৈরি করা হলে ডুয়ার্সের পর্যটনে আলাদা মাত্রা যোগ হবে । জলদাপাড়ায় হলং বনবাংলোকে ঘিরেই পর্যটনের বিরাট একটা অংশ নির্ভর করত ।"
জলদাপাড়ার পর্যটন ব্যবসায়ী সঞ্জয় দাস জানান, "আমরা চাই খুব তাড়াতাড়ি আমাদের ঐতিহ্যবাহী হলং বাংলোটি পুনরায় তৈরি হোক । আগের মতো করেই কাঠের তৈরি হোক বাংলোটি । জলদাপাড়ার পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্রে হলং বাংলো একটা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু পর্যটকদের কাছে । পুজোর আগেই যদি হলং বাংলো বানিয়ে ফেলা যায়, তাহলে পুজোর সময় ডুয়ার্সে পর্যটকদের ঢল নামবে ।"
উত্তরবঙ্গের মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণী) জেভি ভাস্কর জানান, "জলদাপাড়া হলং বনবাংলোটি পুড়ে যাওয়ার পর আমরা বাংলো তৈরি করার জন্য ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরি করে জমা দিয়েছি ৷ ডিপিআর অনুমোদন পেলেই আমরা হলং বাংলো তৈরির উদ্যোগ নেব । ডিজাইন আগের মতোই থাকছে । আমরা চাইছি, আগের মতোই হলং বাংলো তৈরি হোক । আশা করি, খুব তাড়াতাড়ি আমরা বাংলোটি তৈরি করতে পারব ।"
রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণী) সন্দীপ সুন্দরিয়াল জানান, "আমরা জলদাপাড়া বন্যপ্রাণী বিভাগের হলং বনবাংলোটি আবার তৈরি করব । রাজ্য সরকারের কাছে বাংলোটি তৈরির জন্য রিপোর্ট জমা করা হয়েছে । সরকারি প্রসেস চলছে । আশা করি, ভালো কিছুই হবে ।"
উল্লেখ্য, গত বছর 18 জুন রাত 9টা নাগাদ হঠাৎই আগুন লেগে পুড়ে যায় জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের ঐতিহ্যবাহী হলং বনবাংলো । ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ভস্মীভূত হয়ে যায় বাংলোটি । দেশের নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি বিজরিত এই বাংলো । এটি আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর থেকেই বাংলোটি বানানোর দাবি উঠে আসতে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে ৷ এবার বন দফতরের পক্ষ থেকে বাংলোটিকে তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
16 জুন থেকে 15 সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য রাজ্যের সব জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্যে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে । বন্যপ্রাণীদের প্রজনন ঋতু হওয়ার কারণে এই সময়ে পর্যটকদের জঙ্গলে প্রবেশ বন্ধ থাকে । 15 সেপ্টেম্বর থেকে ফের পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয় জঙ্গল । জঙ্গল খোলার সঙ্গে সঙ্গেই হলং বাংলোটিকেও যাতে তৈরি করে ফেলা যায় সেই দাবিতেই সরব হয়েছে পর্যটন মহল ৷

