চিকিৎসক নিগ্রহ-কাণ্ডে পুলিশের তলবে সাড়া দিলেন না কৌস্তভ
নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটজকেই হাতিয়ার করলেন বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচী।

Published : July 4, 2025 at 8:12 PM IST
ব্যারাকপুর, 4 জুলাই: চিকিৎসককে হুমকি ও মারধর-কাণ্ডে শুক্রবার সকাল 11টার সময় মোহনপুর থানায় তলব করা হয়েছিল কৌস্তভ বাগচীকে । পুলিশের তরফে সেই মর্মে তলবি নোটিশও পাঠানো হয়েছিল বিজেপির আইনজীবী নেতাকে । কিন্তু, সেই তলবে সাড়া দিলেন না তিনি ।
উল্টে, পুলিশের কাছে পাল্টা চিঠি দিয়ে সময় চেয়ে নিয়েছেন কৌস্তভ । চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, আগে থেকেই পূর্ব নির্ধারিত তাঁর অনেক কাজ হাতে রয়েছে । তাই, এত অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর পক্ষে থানায় গিয়ে হাজিরা দেওয়া সম্ভব নয় । সেই কারণে সময় জানিয়ে তাঁকে আবারও নোটিশ দিয়ে তলব করা হলে তখন তিনি পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারবেন। তার আগে নয় ।
যদিও পুলিশের একটি সূত্রের খবর, শুক্রবার নির্দিষ্ট সময়ে কৌস্তভ বাগচী হাজিরা না দেওয়ায় ফের তাঁকে তলব করা হতে পারে । তার তোড়জোড়ও শুরু করে দিয়েছে ব্যারাকপুর কমিশনারেট ।
এদিকে, চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিগ্রহ এবং হুমকির ঘটনায় ফের নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বেসরকারি ওই হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজকে হাতিয়ার করেছেন বিজেপি নেতা তথা আইনজীবী কৌস্তভ বাগচী । ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে চিকিৎসক নিগ্রহের নেপথ্যে তৃণমূলের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি । এর সত্যতা তুলে ধরতে তৃণমূলের এক কর্মীর ছবিও পোস্ট করেছেন সমাজমাধ্যমে ।

কৌস্তভের দাবি, "ঘটনার সময় ব্যারাকপুর পুরসভার 11 নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কর্মী মিন্টু হাজির ছিলেন বেসরকারি হাসপাতালে । তিনিই ওই সময় কর্তব্যরত চিকিৎসককে চড় মারেন । সেই সময় আমি ওই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলছিলাম । তখনই সে পরিকল্পিতভাবে এই কাণ্ড ঘটায় । সিসিটিভি ফুটেজে সেই চড় মারার দৃশ্য ধরা পড়েছে ।"
বিজেপি নেতার আরও দাবি, "ওই তৃণমূল কর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর দেবু মজুমদার এবং ব্যারাকপুরের বিধায়ক রাজ চক্রবর্তীর । তৃণমূল কর্মী চড় মারল, আর দোষ হল কৌস্তভ বাগচীর ?’’ এই ইস্যুতে তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিককেও একহাত নিয়েছেন তিনি ।

ঘটনাক্রমে পার্থ ভৌমিক ওই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে নাম না করে কৌস্তভ বাগচীকে নিশানা করেছিলেন । তিনি বলেন, "রোগীমৃত্যু নিয়ে যদি কোনও চিকিৎসকের গাফিলতি থাকত, তাহলে তো রোগীর পরিবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করত ! অন্য কাউকেও জানাত । কিন্তু, রোগীর পরিবার কোথাও অভিযোগ করল না । কোথা থেকে একজন এসে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ, মারধর, হেনস্তা করে নিজেকে বড় জাহির করতে চাইল ।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আসলে চিকিৎসকরা যাতে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে না পারে সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে । আমি আশা করব চিকিৎসকেরা যাতে নিরাপদে পরিষেবা দিতে পারে তার ব্যবস্থা করবে পুলিশ-প্রশাসন । যিনি এই গুন্ডামি করলেন তার দল এখানে উত্তরপ্রদেশের সংস্কৃতি আমদানি করতে চাইছে । বাংলার মানুষ গোবলয়ের এই অসভ্যতা মানবে না ।"

পার্থ ভৌমিকের সেই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কৌস্তভ । ইটিভি ভারতের প্রতিনিধিকে তিনি বলেন, "রোগীর পরিবার অভিযোগ করেছে না করেনি, সেটা আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেখলেই বুঝতে পারবেন । পার্থ ভৌমিক নাটক করতে করতে বড় অভিনেতা হয়ে গিয়েছে । উনি এত মিথ্যা কথা বলেন, কোনও ভদ্রলোকও এত মিথ্যা বলেন না ।’’

কৌস্তভের আরও দাবি, ‘‘আসলে নিজেদের দোষ ধামাচাপা দিতে আমার উপর দায় চাপানো হচ্ছে । যে চড় মেরেছে সে তো তৃণমূল কর্মী । ভিডিয়ো দেখলেই বোঝা যাবে । ডাক্তার নিজে বলছেন আমি কোনও মারধর কিংবা গালিগালাজ করিনি । এসব নাটক মানুষ ধরে ফেলেছে । এর যোগ্য জবাব মানুষই দেবে ।"

চক্রান্ত করে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে কৌস্তব বলেন, "এসব চক্রান্ত করে আমাকে কিছু করতে পারবে না । ওসব চক্রান্ত কীভাবে সামাল দিতে হয়,তা আমার ভালো করেই জানা আছে ।"
প্রসঙ্গত, 1 জুলাই চিকিৎসক দিবসে এক বিজেপি কর্মীর বাবার মৃত্যুকে ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় ব্যারাকপুর মোহনপুর সংলগ্ন ওই বেসরকারি হাসপাতালে । অভিযোগ, এর পরেই হাসপাতালে ঢুকে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করেন বিজেপি নেতা ও আইনজীবী কৌস্তভ বাগচী ।

এমনকী, আঙুল উঁচিয়ে শাসানি এবং চিকিৎসকদের নিগ্রহ করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে । যদিও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলেও 'দাদাগিরি' কিংবা 'শাসানি' কোনও অভিযোগই মানতে চাননি কৌস্তভ । উল্টে, ঘটনার সময় তিনিই পরিস্থিতি সামলেছেন বলে দাবি করেছেন ।

কৌস্তভ বাগচীর সেই 'শাসানি'র ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই শোরগোল পড়ে যায় বিভিন্ন মহলে । বিজেপির আইনজীবী নেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের তরফে চিঠি দেওয়া হয় রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বাস্থ্যসচিবকে । এমনকী, উত্তর 24 পরগনা প্রগ্রেসিভ হেলফ অ্যাসোসিয়েশন চার সদস্যের প্রতিনিধিদলও বেসরকারি হাসপাতাল গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পাশে থাকার বার্তা দেন ।

