অধিক ফলনের পরও লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে ফড়েরা! মাথায় হাত আলুচাষিদের
আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবার পোখরাজ আলুর ফলন ভালো হয়েছে ৷ অভিযোগ, ফড়েদের দৌরাত্ম্যে আলুর দামই পাওয়া যাচ্ছে না ৷ উৎপাদনের খরচও উঠছে না ৷

Published : February 14, 2025 at 9:32 PM IST
|Updated : February 15, 2025 at 9:29 PM IST
বর্ধমান, 14 ফেব্রুয়ারি: চলতি মরশুমে আবহাওয়া ছিল চাষের জন্য অনুকূল ৷ তাই আলুর ফল ভালো হবে বলেই আশা করেছিলেন চাষিরা ৷ তাঁদের সেই আশা পূরণ হয়েছে ৷ আবহাওয়া অনুকূল থাকায় পোখরাজ আলুর ফলন অত্যধিক ভালো হয়েছে । ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি জ্যোতি আলু উঠবে । সেক্ষেত্রেও ভালো ফলনের আশায় রয়েছেন চাষিরা ৷
ফলন ভালো হলে লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয় ৷ কিন্তু সেভাবে আলুর দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ চাষিদের ৷ বাজারে গেলে কিন্তু চাষিদের দাবির সঙ্গে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ বাজারে খুচরো আলু যে দরে বিক্রি হচ্ছে, তা দেখে মনে হতেই পারে যে চাষিরা বেশ লাভের মুখই দেখেছেন ৷
কিন্তু চাষিরা তো বলছেন যে তাঁরা ভালো দাম পাচ্ছেন না ! তাহলে কি খুচরো ব্যবসায়ীরা কম দামে আলু কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন অতিরিক্ত লাভের আশায় ? খুচরো ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন যে তাঁরা যেমন দামে কিনছেন, তার পর লাভ রেখে বিক্রি করছেন ৷ স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রশ্ন উঠছে, চাষের ক্ষেত থেকে বাজার পর্যন্ত আসতে গিয়ে আলুর দাম এতটা বেড়ে যাচ্ছে কেন ?
চাষিরা অভিযোগ তুলছেন ফড়ে বা মধ্যসত্ত্বভোগীদের দিকে৷ তাঁদের অভিযোগ, যে দামে আলু বিক্রি করা হচ্ছে, ফড়েদের হাতে যেতেই সেই দাম প্রায় তিনগুন হয়ে যাচ্ছে ৷ যদিও ব্যবসায়ী সমিতি চাষিদের অভিযোগ মানতে নারাজ ৷ তাদের বক্তব্য, আলু চাষিদের কাছ থেকে কেনার পর তা বাজারে আনতে প্যাকেজিং থেকে পরিবহণ, একাধিক ক্ষেত্রে খরচ হচ্ছে ৷ সেটুকুই দাম বাড়ছে ৷

এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসন কী ভাবছে ? তারা এই এই নিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেবে ? নাকি ফড়ে বা মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য চলতেই থাকবে ? পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের কৃষি সেচ ও সমবায় স্থায়ী সমিতির কর্মাধ্যক্ষ মেহেবুব মণ্ডল অবশ্য বলছেন যে তাঁদের কাছে ফড়ে সংক্রান্ত কোনও অভিযোগ আসেনি ৷ অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ৷ আর সরকারও চাষিদের থেকে সরাসরি আলু কেনার বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করছে ৷
পূর্ব বর্ধমানকে রাজ্যের শস্যগোলা বলা হয় ৷ এই জেলায় চাষাবাদ বেশ উল্লেখযোগ্য ৷ বিশেষ আলু চাষে পূর্ব বর্ধমান এগিয়ে ৷ লাগোয়া হুগলিতেও আলু চাষ হয় ব্যাপক পরিমাণে ৷ তবে আবহাওয়ার বিষয়টি সবসময়ই চাষের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর ৷ এবার যেমন আবহাওয়া অনুকূল থাকায় পোখরাজ আলুর চাষ ভালো হয়েছে ৷ ইতিমধ্যেই পোখরাজ আলু তোলার কাজ প্রায় শেষের দিকে ।

বিঘা প্রতি জমি থেকে 70-80 বস্তা আলু উৎপাদন হচ্ছে । তবে অন্য বছর আলু ওঠার পরে চাষিরা ভালো দাম পেলেও কেজি প্রতি আলুর দাম অনেক কম পাচ্ছেন বলে অভিযোগ । বর্ধমানের উদয়পল্লি এলাকার কৃষক প্রকাশ বিশ্বাস বলেন, ‘‘পোখরাজ আলুর ফলন ভালো হয়েছে । বিঘা প্রতি প্রায় 70-80 বস্তা আলু পাওয়া গিয়েছে । তবে ফলন ভালো হলেও আলুর দাম মিলছে না । ফড়েদের কাছে বস্তা প্রতি 200-250 টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে । ফলে উৎপাদন খরচ উঠছে না ।’’
চাষিরা বলছেন, বস্তা প্রতি আলু 200-250 টাকায় বিক্রি হওয়া মানে, তাঁরা কেজি প্রতি দাম পাচ্ছেন 4-5 টাকা ৷ প্রকাশ বা আরও অনেকে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছেন ৷ ফলন ভালো হওয়ার পরও তাঁদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে ৷ প্রকাশ বলেন, ‘‘বিঘা প্রতি আট থেকে দশ হাজার টাকা ক্ষতি হচ্ছে । অথচ ফড়েরা আমাদের কাছে আলু কিনে নিয়ে গিয়ে বস্তা প্রতি দুশো টাকার বেশি লাভ করছে । অথচ আমরা দাম পাচ্ছি না ।’’

আরেক কৃষক গৌতম বিশ্বাস বলেন, ‘‘ভালো আলুর ফলন হয়েছে । ভেবেছিলাম গত মরশুমে ক্ষতি হয়েছিল, তাই যদি দাম মেলে । কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমাদের কাছ থেকে ফড়েরা 200-250 টাকায় কিনে নিয়ে গিয়ে বস্তা পিছু দুশো টাকার বেশি লাভ করছে । এদিকে আমরা ধার দেনা করে চাষ করেছি । সারের দাম, বীজের দাম বেড়েছে । শ্রমিকের খরচ বেড়েছে । কিন্তু আমরা উৎপাদন খরচই তুলতে পারছি না । শুধুমাত্র ফড়েদের কারণেই আজ চাষিদের এই অবস্থা ।’’
একই বক্তব্য আরেক কৃষক রতন অধিকারীরও ৷ তিনি বলেন, ‘‘চলতি মরশুমে প্রথম আলু চাষ করি । বিঘাতে আট থেকে দশ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে আমার । ভেবেছিলাম দাম মিলবে । কিন্তু চাষ করতে যে খরচ হয়েছে, সেই খরচ ওঠেনি । অথচ আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে গিয়ে ফড়েরা বস্তা প্রতি দ্বিগুন লাভ করেছে । আর সাধারণ মানুষ সেই আলু বেশি দামে কিনছে । এখন ধার দেনা কীভাবে শোধ দেব জানি না ।’’

খুচরো বাজারে আলু এখন বিক্রি হচ্ছে 11-13 টাকায় ৷ বস্তা প্রতি 400 থেকে 410 টাকায় কিনে এই আলু বিক্রি করছেন খুচরো ব্যবসায়ীরা ৷ অর্থাৎ চাষিরা যে দামে বিক্রি করছেন, তার থেকে প্রায় দ্বিগুন দামে খুচরো ব্যবসায়ীরা কিনছেন ৷ খুচরো সবজি বিক্রেতা স্বপন সেন বলেন, ‘‘আলুর দাম প্রায় দিন ওঠানামা করে । তবে গত কয়েকদিনে কেজি প্রতি আলুর দাম ছিল 10-13 টাকা । আমরা যেরকম দামে কিনছি, সেই অনুযায়ী বিক্রি করছি । তবে আরও আলু উঠলে হয়তো আলুর দাম আরও কমে যাবে ।’’

চাষিদের অভিযোগ, দামের এই হেরফেরে লাভবান হচ্ছেন ফড়ে বা মধ্যসত্ত্বভোগীরা ৷ যদিও ব্যবসায়ী সমিতির বক্তব্য, চাষিদের থেকে কেনা দাম ও খুচরো বাজারে বিক্রির দামে যে ফারাক রয়েছে, সেটা স্বাভাবিক ৷ বর্ধমানের তেঁতুলতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক শেখ স্বপন বলেন, ‘‘বাজারে আলুর দাম খুব বেশি নয় । আলুর ফলন খুব ভালো হয়েছে । চাষির কাছ থেকে আলু কেনার পরে সেই আলু যখন পাইকারি ব্যবসায়ীর হাতে যাচ্ছে ৷ তার আগে ক্যারিং কস্ট, লেবার কস্ট ছাড়াও অন্যান্য কিছু খরচ আছে । ফলে সেই অনুযায়ী আলুর বিক্রি হচ্ছে । তবে আলুর দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই আছে ।’’

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন কী ভাবছে ? পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের কৃষি সেচ ও সমবায় স্থায়ী সমিতির কর্মাধ্যক্ষ মেহেবুব মণ্ডল বলেন, ‘‘আবহাওয়া ভালো থাকায় পোখরাজ আলুর ফলন খুব ভালো হয়েছে । সরকারের তরফেও আলু কেনার চিন্তাভাবনা আছে । তবে ফড়ে সংক্রান্ত কোন অভিযোগ পাইনি । অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।’’

