মধ্যমগ্রাম বিস্ফোরণে পরকীয়া-যোগ ! প্রেমিকার স্বামীকে খুনের ছক কষেছিল উত্তরপ্রদেশের মৃত যুবক
মধ্যমগ্রাম বিস্ফোরণ-কাণ্ডে আটক নিহত যুবকের প্রেমিকা ও তাঁর স্বামী । তদন্তে জানা যাচ্ছে, পরকীয়ার পথের কাঁটা সরাতে প্রেমিকার স্বামীকে খুনের ছক কষেছিল উত্তরপ্রদেশের যুবক ৷

Published : August 19, 2025 at 6:13 PM IST
মধ্যমগ্রাম, 19 অগস্ট: মধ্যমগ্রাম বিস্ফোরণ-কাণ্ডে এবার নিহত যুবকের প্রেমিকা এবং তাঁর স্বামীকে আটক করল পুলিশ । রাতেই দু'জনকে আটক করে নিয়ে আসা হয় মধ্যমগ্রাম থানায় । সেখানেই বিবাহিত ওই মহিলা এবং তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিস্ফোরণ রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা ।
এই বিস্ফোরণ-কাণ্ড ঘিরে প্রথম থেকেই তৈরি হয়েছে একের পর এক রহস্য ৷ ঘটনার ভয়াবহতা দেখে মনে করা হচ্ছিল কোনও নাশকতার উদ্দেশ্যেই নিহত যুবক উত্তরপ্রদেশ থেকে মধ্যমগ্রামে এসেছিলেন ! কিন্তু, তদন্ত এগোতেই চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে । নাশকতার তত্ত্ব পিছনে ফেলে সেখানে জোরালো হয়েছে ত্রিকোণ প্রেমের তত্ত্ব । তদন্তকারীদেরও অনুমান, ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে প্রেমঘটিত কারণ ৷
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মধ্যমগ্রামেরই এক মহিলার সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বছর পঁচিশের সচ্চিদানন্দের । কিন্তু, সম্পর্কের মাঝে পথের 'কাঁটা' হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রেমিকার স্বামী । পথের 'কাঁটা' সরাতেই ওই যুবক মহিলার স্বামীকে খুনের ছক কষেছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে ৷ সেই মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে প্রেমিকার মধ্যমগ্রামের বাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন ।কিন্তু, ডিভাইসে ভুল বোতামে চাপ পড়ে যেতেই ঘটে যায় অঘটন ! বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় যুবকের শরীর ।
পুলিশ খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছে সোশাল মিডিয়ায় পরিচিত হওয়ার পর মধ্যমগ্রামের এক মহিলার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় ওই যুবকের । পুলিশ আরও জানতে পেরেছে, ওই মহিলা বিবাহিত ছিলেন । মহিলার সঙ্গে যুবকের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে ওঠায় তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বেশ কয়েকবার ঝগড়াও হয়েছিল ।
পাড়া-প্রতিবেশীরাও দম্পতির মধ্যে এই অশান্তি অস্বীকার করেননি । এই অশান্তির মূলে যে বিবাহিত ওই মহিলার পরকীয়া সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে সেই দাবিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা । এই সমস্ত তথ্য সামনে আসার পর তদন্তকারীরা নিশ্চিত, প্রেমিকার অপমান এবং অত্যাচার সহ্য করতে না-পেরেই সচ্চিদানন্দ মিশ্র উত্তরপ্রদেশ থেকে সোজা চলে এসেছিলেন মধ্যমগ্রামে । তার পরেই ঘটে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ! যার অভিঘাতে মারা যান তিনি নিজেই ।

পুলিশের তদন্তে আরও যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে তা হল, এই সচ্চিদানন্দ আইটিআই-র প্রাক্তন ছাত্র । আইটিআই নিয়ে পড়াশোনা করার সুবাদে প্রযুক্তি, মেশিন ও বিস্ফোরকের বিষয়ে তাঁর জ্ঞান থাকা অসম্ভব নয় । পুলিশের অনুমান, ওই যুবক নিজেই পেনের মতো বৈদ্যুতিন যন্ত্রের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন । সেই বিস্ফোরক দিয়ে প্রেমিকার স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল তাঁর । কিন্তু, তা করতে গিয়ে নিজের জালেই জড়িয়ে বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় সচ্চিদানন্দের ।
পুলিশের আরও একটি সূত্রের খবর, স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনার সবটাই নাকি জানতেন ওই মহিলা । যুবকের এই পরিকল্পনায় প্রেমিকারও মদত রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ । তাই, তদন্তের স্বার্থে তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা । মহিলার স্বামীর ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে তাঁকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে ।
পুলিশ সূত্রে খবর, আটক হওয়া মহিলার বাড়ি মধ্যমগ্রামের দাসপাড়ায় । যা অকুস্থলের খুব কাছেই । এর আগেও বেশ কয়েকবার উত্তরপ্রদেশ থেকে মধ্যমগ্রাম এসেছিলেন সচ্চিদানন্দ । গত এপ্রিলেও মধ্যমগ্রামে গিয়ে বেশ কয়েকদিন থেকে গিয়েছেন তিনি । পুলিশের অনুমান, মহিলার স্বামী কর্মসূত্রে বাইরে গেলেই সচ্চিদানন্দ মধ্যমগ্রামে এসে প্রেমিকার বাড়িতে থাকতেন । গত তিনদিন ধরে ওই যুবক মধ্যমগ্রামেই ছিলেন, এমন তথ্যও উঠে এসেছে পুলিশের হাতে ।
এদিকে, মঙ্গলবার সকালে মধ্যমগ্রাম থানায় এসে পৌঁছেছেন নিহত সচ্চিদানন্দের বাবা অশ্বিনীকুমার মিশ্র । তিনি বলেন, "ছেলের সঙ্গে রবিবার রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ শেষবার মোবাইলে কথা হয়েছিল । বলেছিল, বেনারসে রয়েছে । ফলে, কীভাবে ছেলে মধ্যমগ্রামে এসে পৌঁছল তা জানা নেই । ও'র সঙ্গে কোনও মহিলার সম্পর্কে আছে কি না, সেটাও বলতে পারব না । মোবাইলের তথ্য খতিয়ে দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট হতে পারে ।"
তিনি আরও জানান, "বিএ পাশ করার পর সচ্চিদানন্দ আইটিআই নিয়ে পড়াশোনা করেছিল । হরিয়ানার একটি কারখানায় কাজ করত । পরিবারের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ ছিল না ও'র । মাঝে মধ্যে মোবাইলে কথা হত । কাউকে খুন করার উদ্দেশ্যে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বানিয়েছিল কি না, সেই বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা নেই আমাদের ।কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব ? এখানে কারও সম্পর্কে কিছুই জানি না । মৃত্যুর পিছনে যদি কোনও গাফিলতি উঠে আসে তখন নিশ্চয় অভিযোগ করার কথা ভাবব ! এখন শুধু ছেলের দেহ হাতে পেতে যাবতীয় প্রক্রিয়া সারতে চাই ।"
প্রসঙ্গত, রবিবার মধ্যরাতে মধ্যমগ্রাম হাইস্কুল সংলগ্ন উড়ালপুলের নীচে একটি পার্কে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে । বিস্ফোরণে অভিঘাতে অভিযুক্ত যুবক সচ্চিদানন্দের বাঁ হাত এবং পা উড়ে গিয়েছে । শরীর জুড়ে তৈরি হয় একাধিক ক্ষত । আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সোমবার সকালে মৃত্যু হয় তাঁর । এর পরেই এসটিএফ ও জেলা পুলিশ একযোগে তদন্তে নামে । কী ধরনের বিস্ফোরক থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা, তা জানতে ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে নমুনাও সংগ্রহ করেছে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা । তার রিপোর্ট এলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে ।
জানা গিয়েছে, মৃত যুবক উত্তরপ্রদেশের বস্তি জেলার বাসিন্দা । তবে কাজের সূত্রে হরিয়ানাতে থাকতেন সচ্চিদানন্দ । সেখানকার একটি গ্লাস ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন । পরিবারের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না । এমনকী তিনি যে মধ্যমগ্রামে এসেছিলেন, তা-ও জানত না তাঁর পরিবার ।

