প্রধান শিক্ষক-সভাপতির দ্বন্দ্বে স্কুলে অচলাবস্থা, সপ্তাহে তিনদিনই ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে পড়ুয়ারা
মালদার হবিবপুরের আইহো উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনা ৷ দু’পক্ষই প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে ৷ খতিয়ে দেখছে জেলা মাধ্যমিক স্কুলশিক্ষা বিভাগ ৷

Published : March 19, 2025 at 8:23 PM IST
মালদা, 19 মার্চ: প্রধান শিক্ষক আর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির মধ্যে দ্বন্দ্ব ৷ তার জেরে থমকে রয়েছে স্কুলের যাবতীয় কাজ ৷ পরিস্থিতি এমনই দাঁড়িয়েছে যে এখন ষষ্ঠ আর সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়ারা সপ্তাহের ছ’দিন ক্লাস করতে পারছে না ৷ তিনদিন ক্লাস করছে তারা ৷ কবে তারা ফের সপ্তাহে ছ’দিন ক্লাস করতে পারবে, সেটা কেউ জানে না ৷
ঘটনাটি মালদার হবিবপুর ব্লকের আইহো উচ্চ বিদ্যালয়ের ৷ প্রধান শিক্ষক আর ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এই নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন ৷ দু’জনেই একে অন্যের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ৷ সহকারি শিক্ষকরা চাইছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক৷ স্কুলে ঠিকমতো পঠনপাঠনের পরিবেশ ফিরে আসুক ৷
কিন্তু কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে ? প্রশাসনের তরফে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ রিপোর্ট এলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলে জানানো হয়েছে ৷ আপাতত সেই অপেক্ষায় রয়েছেন স্কুলের শিক্ষক থেকে অভিভাবক ও পড়ুয়ারা ৷
ঘটনাটি ঠিক কী ?
হবিবপুরের আইহো উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অভিজিৎ মিশ্র ৷ 2022 সালে ওই স্কুলে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হয় সঞ্জয় বর্মনকে ৷ তিনি পেশায় একজন সিভিক ভলান্টিয়ার ৷ হবিবপুর থানায় কর্মরত ৷ অভিযোগ, শুরু থেকেই প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির মধ্যে গোলমাল চলছে ৷ দু’জনেই দু’জনের মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ৷ একে অপরকে গালিগালাজের অভিযোগও দু’জনের তরফে তোলা হয়েছে ৷ দু’জনেই বিহিত চেয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন ৷
প্রধান শিক্ষক অভিজিৎ মিশ্র কী বলছেন ?
তিনি বলেন, ‘‘প্রথম মিটিং থেকেই আমরা তাঁর (সঞ্জয় বর্মন) অবস্থান বুঝতে পারছিলাম ৷ তিনি চাইছেন তাঁকে দিয়েই সব কাজ করাতে হবে ৷ সভাপতি চাইছিলেন, তিনিই সবকিছু করবেন ৷ মিটিং-এর রেজুলেশনে তিনি সই করতেন না ৷ তিনি ভাবতেন, তিনি ওয়ান ম্যান কমিটি ৷ যখন আমার ও অন্য শিক্ষকদের তরফে মিলিত প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তখন তিনি বেপরোয়া হয়ে যান ৷’’
অভিজিৎ মিশ্রের অভিযোগ, ‘‘আমাদের প্রতিটি মিটিং সিসিটিভি কভারেজের মধ্যে হয়ে থাকে ৷ কিন্তু গত 25 ফেব্রুয়ারির মিটিং-এর সিসিটিভি কভারেজ তিনি আমাদের করাতে দেননি ৷ সেই মিটিংয়ে তিনি আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন ৷ সবার সামনে আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন ৷ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি ৷ আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় ৷ পরবর্তীতে আমার মাইল্ড সেরিব্রাল অ্যাট্রোফি ধরা পড়ে ৷’’
তিনি জানান, গত অক্টোবরেই কমিশনার অফ স্কুল এডুকেশনকে চিঠি মারফত সমস্ত ঘটনা জানিয়েছিলেন ৷ 25 ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর বিভিন্ন দফতরে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন ৷ সঞ্জয় বর্মনের অপসারণ প্রয়োজন, না হলে স্কুলে অচলাবস্থা কাটবে না ৷
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সঞ্জয় বর্মন কী বলছেন ?
তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের তরফে তোলা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ৷ পালটা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন তিনি ৷
সঞ্জয় বর্মনের দাবি, ‘‘প্রধান শিক্ষক যে যে কাজ করে যাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে আমিই বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ দায়ের করেছি ৷ তিনি কৌশল করে জালিয়াতি করে যাচ্ছেন ৷ স্কুলের মিটিং-এর কোনও রেজুলেশনকে প্রধান শিক্ষক মান্যতা দেন না ৷ সবার সম্মতিতে নেওয়া রেজুলেশনকে মান্যতা দেন না ৷ মিটিংয়ের সময় রেজুলেশন না লিখিয়ে পরে নিজের সুবিধেমতো রেজুলেশন লিখিয়ে নেন ৷ এর পিছনে তাঁর কুমতলব রয়েছে ৷’’
তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘পরের মিটিং-এ উনি ওই রেজুলেশনে সই করার জন্য আমার উপর চাপ সৃষ্টি করেন ৷ সই না করতে চাইলে আমাকে সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন ৷ আমাকে অকথ্য ভাষায় আমাকে গালাগালি করেন ৷ আমি বরাবরই দেখে যাচ্ছি, ভাউচার না দেখিয়ে তাঁর টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে ৷ স্কুল ভবনের কাজেও উনি বাধা দিয়েছেন ৷’’ তিনি মিটিং ডাকতে বললেও প্রধান শিক্ষক অভিজিৎ মিশ্র এড়িয়ে যান বলেও দাবি করেছেন সঞ্জয় বর্মন ৷
দু’জনের দ্বন্দ্বে স্কুলে কী সমস্যা তৈরি হচ্ছে ?
প্রধান শিক্ষক অভিজিৎ মিশ্রের দাবি, স্কুলে প্রথম থেকেই মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা হতো ৷ স্কুলে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিও রয়েছে ৷ এই মুহূর্তে স্কুলের দশটি ক্লাসরুম ব্যবহারের উপযুক্ত রয়েছে ৷ সেই দশটি ঘরেই ক্লাস করা হচ্ছে ৷ পর্যাপ্ত ক্লাসরুমের অভাবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়াদের অল্টারনেটিভ দিনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে ৷ ক্লাস সিক্স এ ও সেভেনের এ সেকশন সোম-বুধ-শুক্রবার ক্লাস করছে ৷ দুই ক্লাসের বি সেকশন ক্লাস করছে মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিবার ৷
তিনি আরও জানান, বাকি ক্লাসগুলো অবশ্য সঠিকভাবেই চলছে ৷ আরও আটটি ক্লাসরুম নির্মাণের কাজ চলছে ৷ তবে উদ্ভুত সমস্যার জেরে তার কাজ থমকে রয়েছে ৷ স্কুলে মোট পড়ুয়া রয়েছে 1859 জন ৷ স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন 36 জন ৷ নতুন ক্লাসরুমগুলি তৈরি হয়ে গেলে পঠনপাঠনের আর কোনও সমস্যা থাকবে না ৷
সহকারী শিক্ষকরা কী বলছেন ?
স্কুলের সহকারী শিক্ষক প্রলয়শংকর ঘোষের বক্তব্য, “আইহো হাইস্কুল এই ব্লকের অন্যতম সেরা স্কুল ৷ এতদিন তাই ছিল ৷ বছর দুয়েক আগে আমাদের নতুন প্রধান শিক্ষক কাজে যোগ দিয়েছেন ৷ তারপর পেশায় এক সিভিক ভলান্টিয়ার স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসাবে নিযুক্ত হয়েছেন ৷ দু’জনের মধ্যে কী চলছে, আমরা জানি না ৷ তবে প্রথম থেকেই একটা অশান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়ে রয়েছে ৷ এতে স্কুলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৷’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রধান শিক্ষক বলছেন, সভাপতি কোনও বিলে সই করছেন না ৷ নিজের লোকজন দিয়ে কাজ করাচ্ছেন ৷ এতে স্কুলের টাকা প্রচুর নয়ছয় হচ্ছে ৷ আমরা দেখছি, এতে স্কুলের সব কাজই আটকে রয়েছে ৷ ভর্তির ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে ৷ এখন স্কুল ফান্ডে খরচ করার মতো কোনও টাকা নেই ৷ সাফাইকর্মীর টাকাও প্রধান শিক্ষক দিতে পারছেন না ৷ স্কুলের দৈনন্দিন কাজকর্মও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ৷ এভাবে চললে পঠনপাঠনও বন্ধ হয়ে যাবে ৷’’
আরেক সহকারী শিক্ষক ত্রিতৃভা সরকার বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমার একটাই আবেদন, স্কুলের পুরনো সুনাম যেন আবার ফিরে আসে ৷ স্কুল যেন আগের মতো চলে ৷ উদ্ভুত সমস্যায় পড়ুয়ারা পঠনপাঠন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৷ নতুন ভবন তৈরির কাজ আটকে রয়েছে ৷ খুব তাড়াতাড়ি সেই কাজ শেষ করে পড়ুয়ারা যেন সপ্তাহে ছ’দিনই ক্লাস করতে পারে তার আবেদন জানাচ্ছি ৷”
প্রশাসনের বক্তব্য কী ?
জেলা মাধ্যমিক স্কুল পরিদর্শক বাণীব্রত দাস উদ্ভুত সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ৷ তিনি বলেন, “ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি সভাপতি একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন ৷ অভিযোগ নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে ৷ তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হবে ৷ এই ঘটনার জন্য যাতে পঠনপাঠনে কোনও সমস্যা না দেখা দেয়, তা দেখা হচ্ছে ৷”

