দলাই লামার দাদার শেষকৃত্য সম্পন্ন কালিম্পংয়ে, শ্রদ্ধাঞ্জলি সিকিমের মন্ত্রী-স্পিকারের
দলাই লামার দাদা গিয়ালো থন্ডুপের শেষকৃত্য সম্পন্ন হল কালিম্পংয়ে ৷ 'কালিম্পংয়ের নুডল মেকার'কে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নামে মানুষের ঢল ৷

Published : February 11, 2025 at 1:12 PM IST
|Updated : February 11, 2025 at 1:49 PM IST
কালিম্পং, 11 ফেব্রুয়ারি: দলাই লামার দাদা গিয়ালো থন্ডুপের আজ শেষকৃত্য সম্পন্ন হল কালিম্পংয়ের তাগস্টার হাউসে ৷ কয়েক বছর আগেও যখন গিয়ালো থন্ডুপ অসুস্থ ছিলেন, তখন তাঁর ভাই দলাই লামা তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন ৷ সেই সময় দাদার হাত ধরে তিনি বলেছিলেন, "তুমি মারা যেতে পারো না, আমাদের একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে হবে ৷" কিন্তু নিয়তিকে বদলায় কার সাধ্যি ? দালাই লামার দাদা গত আট ফেব্রুয়ারি কালিম্পংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল 97 বছর । তাঁর প্রয়াণে গোটা বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে । শোক প্রকাশ করেছেন জিটিএ চিফ এগজিকিউটিভ অনিত থাপা, প্রাক্তন জিটিএ প্রশাসক বিনয় তামাং ও জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা ।
জিটিএ চিফ এগজিকিউটিভ অনিত থাপা বলেন, "তাঁর মৃত্যুতে কালিম্পং তার এক বিশিষ্ট নাগরিককে হারাল । এ এক অপূরণীয় ক্ষতি । তিব্বতের ইতিহাস গঠনে এবং ভারত, তিব্বত ও চিনের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি ।"

বিনয় তামাং বলেন, "গিয়ালো থন্ডুপের প্রয়াণ বৌদ্ধ সমাজের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে । তিব্বত ও এশিয়ায় শান্তি স্থাপনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ।"

স্থানীয় সমাজসেবী বিক্রম রাইয়ের কথায়, "দলাই লামার বড় ভাই হিসেবে তিনি তিব্বতের রাজনীতি, কূটনীতি এবং প্রতিরোধ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন । তিব্বতের ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি তাঁর জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন ৷ তাঁর চলে যাওয়ায় একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হল ৷ কিন্তু তাঁর লড়াই ও বলিদান বেঁচে থাকবে ।"

এদিন তাঁর শেষকৃত্যে দলাই লামার ছোট বোন জেৎসুন পেমা, তাঁর স্ত্রী খোচেন রিনপোচে, তাঁর পুত্র সেকুজয়ো নগাওয়াং, তানপা থন্ডুপ এবং সে কুজয়ো খেদ্রোব থন্ডুপ উপস্থিত ছিলেন । শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণকারীদের মধ্যে ছিলেন সিকিয়ং পেনপা সেরিং, কালন গিয়ারি ডোলমা, জিটিএ নির্বাহী সদস্য সেনোরা নামচু, সিকিমের স্পিকার এমএন শেরপা, সিকিমের মন্ত্রী সোনম লামা, সিকিমের বিধায়ক আদিত্য গোলে এবং মনোজ ছেত্রী । শেষকৃত্যে তাঁকে সম্মান জানান তিব্বতের এক্সাইল গভর্নমেন্টের প্রধানমন্ত্রী পেম্বা শিরিং ভুটিয়া-সহ অন্যান্যরা ।

1928 সালে তিব্বতের আমডো অঞ্চলের তাকতসার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গিয়ালো থন্ডুপ । সারা জীবন তিনি তিব্বতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । তাঁর ভাইয়ের জন্য একজন দূত হিসেবে কাজ করেন এবং তিব্বতের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে নজির তৈরি করেছিলেন ।

1939 সালে গিয়ালো থন্ডুপ তাঁর পরিবারের সঙ্গে চিনের লাসায় চলে যান । 14 বছর বয়সে তিনি যান চিনের নানজিংয়ে । সেখানে তিনি স্ট্যান্ডার্ড চাইনিজ এবং চিনের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । সেখানে থাকাকালীন, তিনি চিয়াং কাই-শেক-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে গড়ে তোলেন । 1948 সালে তিনি কুওমিনতাং জেনারেলের কন্যা ঝু ডানকে বিয়ে করেন । চিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে তিনি 1949 সালে নানজিং ছেড়ে ভারতের কালিম্পং শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন ।

চিনা, তিব্বতি এবং ইংরেজি ভাষায় সাবলীল ছিলেন তিনি । গিয়ালো থন্ডুপ নির্বাসিত সময়েও তিব্বতি সরকার এবং চিন প্রজাতন্ত্র (তাইওয়ান) ও গণপ্রজাতন্ত্রী চিন উভয়ের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করেছিলেন । দলাই লামার অনুমতি নিয়ে তিনি 1979 সালে চিনের নেতা জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করেছিলেন । 1990-এর দশকে তিনি দলাই লামার দূত হিসেবে চিনে বেশ কয়েকটি সরকারি সফরও করেছিলেন ।

রাজনৈতিক প্রচেষ্টার বাইরে, গিয়ালো থন্ডুপ ছিলেন একজন শিল্পপতি । 1960-এর দশকে তিনি কালিম্পংয়ে একটি নুডল কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে । তাঁর অভিজ্ঞতা এবং অন্তর্দৃষ্টির স্মৃতিকথা 'দ্য নুডল মেকার অফ কালিম্পং'-এ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা অ্যান এফ. থার্স্টনের সঙ্গে সহ-লেখক হিসেবে লিখেছিলেন তিনি । বইটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক বিক্রিত বই হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল ।

তিব্বতের স্বার্থে তাঁর অটল নিষ্ঠা এবং তিব্বত ও চিনের মধ্যে বোঝাপড়ার সেতুবন্ধনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে গিয়ালো থন্ডুপের জীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে । তাঁর পরিবার থেকে সমাজ এবং অসংখ্য মানুষ তাঁর অবদানকে কুর্নিশ জানায় ৷ তিব্বতের রাজনৈতিক আলোচনায় তাঁর অবদান এবং তাঁর অঙ্গীকার চিন ও তিব্বতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ।

ইতিহাসের একজন অভিভাবক, একজন গল্পকার এবং স্বঘোষিত 'কালিম্পংয়ের নুডল মেকার'কে এদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে বিদায় জানাল কালিম্পংবাসী । উপস্থিত সবারই মুখেই একটাই কথা শোনা গিয়েছে, গিয়ালো থন্ডুপের অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভূত হবে, কিন্তু তাঁর অবদান কখনও ভোলা যাবে না ।


