শহরের 75তম পূর্তিতে চন্দননগরকে 'সিটি অফ হেরিটেজে'র আবেদন
একসময়ের ফরাসিদের উপনিবেশ থাকা চন্দননগরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী জিনিস হেরিটেজ তকমা পেয়েছে । এবার গোটা শহরকে হেরিটেজ করার আবেদন চন্দননগর কলেজের ।

Published : May 2, 2025 at 8:38 PM IST
চন্দননগর, 2 মে: ভারতের সশস্ত্র সংগ্রামের আঁতুড়ঘর ছিল চন্দননগর । বিপ্লবীরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল এই শহরকে । কিন্তু চন্দননগর স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারত স্বাধীন হওয়ার তিন বছর পর । ফরাসিরা ছেড়ে দিলেও পুরোপুরি ক্ষমতা পায়নি ভারত ।চন্দননগরকে হস্তান্তর করেছিল ফরাসিরা । 1950 সালের 2 মে পুরোপুরি ফরাসি শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে চন্দননগর । স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নানা ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই চাঁদের শহরকে নিয়ে ।
বহু ইতিহাসের সাক্ষী সেই শহরের স্বাধীনতার 75তম বর্ষ উদযাপন করছে চন্দননগর কলেজ এবং কলেজের প্রাক্তনীদের অ্যালুমনি অ্যাসোসিয়েশন । শুক্রবার সকালে প্রভাত ফেরি দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় কলেজের তরফে । উপস্থিত ছিলেন চন্দননগরের মেয়র রাম চক্রবর্তী, ডেপুটি মেয়র মুন্না আগরওয়াল, কলেজের অধ্যক্ষ দেবাশিস সরকার-সহ কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী এবং চন্দননগরের বিশিষ্টজনেরা।
আজকের এই স্বাধীনতা দিবসে চন্দননগরকে হেরিটেজ নগরীর স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানালেন তাঁরা । চন্দননগর কলেজ ও কলেজের অ্যালুমনি অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যেই চিঠি পাঠিয়ে আবেদন জানিয়েছে হেরিটেজ কমিশনের চেয়ারম্যান আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে । তাঁদের দাবি, কলেজ ও চন্দননগর স্ট্র্যান্ডের পাশাপাশি আলাদা মর্যাদা পাক এই ঐতিহাসিক শহর ।
বিষয়টি নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ দেবাশিস সরকার জানান, চন্দননগর কলেজ বিল্ডিংকে হেরিটেজ ভবন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে । হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে চন্দননগর স্ট্র্যান্ড, জগদ্ধাত্রী পুজো, বিশ্ববন্দিত আলো । চন্দননগর কলেজের হেরিটেজ ভবনে রয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার । তাই এবার চন্দননগর শহরকে হেরিটেজ স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে ।
চন্দননগরের স্বাধীনতার ইতিহাস :
চন্দননগর স্বাধীনতার কথা প্রথম বলেছিলেন কানাইলাল দত্ত । ফরাসি সার্কাস কোম্পানি এসে অত্যাচার শুরু করে । এছাড়াও এক ফরাসি শাসকের অকথ্য অত্যাচারের জেরে কানাইলালরা বোমা ফেলেন তাঁর বাড়িতে । একটা সময় ছিল ফরাসি আমলে গুলি ও লাঠিচার্জ করা হয়েছিল চন্দননগরবাসীর উপর । এই ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে কানাইলাল চারুচন্দ্র রায়কে বলেছিলেন, "সামান্য ক'টি ফরাসি সেনা । তাদেরকে আমরা পরাস্ত করছি না কেন ? " এখান থেকেই চন্দননগরের স্বাধীনতার লড়াইয়ের সূত্রপাত বলে মনে করা হয় । চারুচন্দ্র রায় সেই সময় কানাইলালকে বুঝিয়েছিলেন । এরপর থেকে চন্দননগরবাসীরা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নামে ।

চন্দননগরের ইতিহাসবিদের বক্তব্য :
স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে চন্দননগরের ইতিহাসবিদ বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ফরাসি সরকার চন্দননগরের নাগরিকদের বুঝিয়েছিলেন এটাকে মুক্ত শহর করে দেওয়া হোক । সেই অনুযায়ী 1947 সালের নভেম্বর মাসে চন্দননগরকে মুক্ত নগরী করে দেওয়া হয় । এই স্বতন্ত্র চন্দননগরের শাসন পরিষদ ছিল । তার প্রেসিডেন্ট ছিল, মন্ত্রী সভা ছিল । চন্দননগরে কয়লা মন্ত্রী ছিল । এসব ছাড়াও সেই সময় চন্দননগরের আলাদা পতাকাও ছিল । তিন রঙা পতাকার মাঝে সূর্যোদয়ের ছবি । যদিও কোনও জায়গায় এই পতাকার খোঁজ পাওয়া যায়নি । বলা হয়েছিল অভ্যন্তরীণ সমস্ত ব্যাপারে চন্দননগর স্বাধীন । শুধুমাত্র বহির ব্যাপারটা কন্ট্রোল করবে ফরাসি সরকার ।পরবর্তীকালে এই মুক্তনগরী নিয়ে অশান্তির সৃষ্টি হয় । পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের সঙ্গে চন্দননগরকে সম্মিলিত করতে হবে বলে চন্দননগরের সাধারণ মানুষ এবং বামপন্থীরা দাবি তোলে । এরপর ভারতবর্ষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এরপর 1950 সালে মে মাসে ফরাসি পতাকা নামিয়ে নিয়ে ভারতের পতাকা তোলা হয় বর্তমানের ফ্রেঞ্চ মিউজিয়াম ও ইনস্টিটিউটে ।
ফ্রেঞ্চ মিউজিয়াম ও ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের বক্তব্য :
চন্দননগর স্বাধীন হওয়ার নথি ও ছবি আজও ফ্রেঞ্চ মিউজিয়ামে রয়েছে । তৎকালীন ফরাসি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও ভারত সরকারের প্রতিনিধি যে টেবিলে বসাকালীন চন্দননগর স্বাধীনতা পেয়েছিল তাও সংগৃহীত আছে । ফ্রেঞ্চ মিউজিয়াম ও ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর বাসবী পালের কথায়, "চন্দননগর হস্তান্তর হওয়ার একবছর পর 1951 সালে 2 ফেব্রুয়ারি প্যারিসে ফরাসি রাষ্ট্রপতি ও ভারতের রাষ্ট্রপতি সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি হয় । সেই চুক্তিতে বলা হয় আমাদের দেশের সঙ্গে ফ্রান্সের কালচারাল আদান-প্রদান বজায় থাকবে । সেই কারণেই এখনও ফরাসি শিক্ষার প্রচলন রয়েছে । এমনকি চন্দননগরের স্বাধীনতার পরও বহু বছর ফরাসি নাগরিকত্ব ছিল অনেকের । এমনকি অনেক বছর পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক আধিকারিকদের পেনশন দিত ফরাসি সরকার ।"

