অপারেশন সিঁদুর থেকে মহাকাশ অভিযান, চন্দননগরের আলোর জাদুতে ভাসবে দুর্গাঙ্গন
থ্রিডি অ্যানিমেশন লাইটিংয়ে দেখুন অপারেশন সিঁদুর থেকে ইসরোর মহাকাশ অভিযান ৷ ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পলাশ মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরায় উঠে এল চন্দননগরের শিল্পীদের এবারের নজরকাড়া লাইটিং ৷

Published : September 13, 2025 at 7:32 PM IST
চন্দননগর, 13 সেপ্টেম্বর: উৎসবের মরশুম শুরু হতেই শহর থেকে শহরতলি ঢেকে যায় আলোর চাদরে ৷ আলোর কারুকার্যের কথা মাথায় এলে সবার আগে মনে পড়ে চন্দননগরের কথা। বহু ক্লাবই পুজোর আগে ঠিক করে ফেলে, চন্দননগর থেকে আলো নিয়ে এসে মানুষকে চমকে দেবে ! সত্যিই তাই। চন্দননগরের আলোর যে জগৎজোড়া খ্যাতি ! অবাক করা সব আলোর কারুকার্য, যা দেখলে সত্যি অবাক হতে হয়। এবছর 'আলোর শহরের' আলাকশিল্পীদের আকর্ষণ কী ?
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো আর আলো এই শহরকে সমগ্র বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। লন্ডন থেকে কলকাতা, আলোর জাদুতে ভরিয়ে দিয়েছে চন্দননগরের শিল্পীরা। টুনি বাল্ব থেকে শুরু করে এলিডি ও পিক্সেল লাইট ৷ রকমারি আলোয় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে নানা ধরনের টু-ডি ও থ্রি-ডি মডেল ।
এক সময়ের ফরাসি উপনিবেশ বিশ্বের কাছে আজ হয়ে উঠেছে 'আলোর শহর'। সারাবছরই উৎসবের মরশুমের অপেক্ষায় থাকেন আলোকশিল্পীরা। সামনেই শুরু হচ্ছে পুজোর মরশুম ৷ তার আগে নিজেদের কারুকার্য শিল্প সত্ত্বায় রূপ দিতে ব্যস্ত চন্দননগরের আলোকশিল্পীরা ৷

থ্রিডি অ্যানিমেশনে অপারেশন সিঁদুর
অপারেশন সিঁদুর থেকে মহাকাশ অভিযান, ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে চন্দননগরের আলোক শিল্পে। চন্দননগরের স্বনামধন্য আলোক শিল্পী প্রয়াত বাবু পালের মেয়ে সুশ্বেতার হাত ধরে এবারে আলোক শিল্পে অপারেশন সিঁদুর থেকে সুনীতা উইলিয়ামসদের প্রত্যাবর্তনের ছবি ফুটিয়ে তুলেছে 360 ডিগ্রি এলিডির মাধ্যমে। শুধু কলকাতার দুর্গাপুজো নয়, পুরো দেশে আলো যাচ্ছে চন্দননগর থেকে। একাধিক আলোকশিল্পী তাঁদের আলোর মালা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন বিভিন্ন দুর্গাপুজো কমিটিতে।

আলোকশিল্পী সুশ্বেতা পালের বক্তব্য
প্রয়াত চন্দননগরের আলোকশিল্পী বাবু পালের মেয়ে শিল্পী সুশ্বেতা পাল বলেন, "এবছর কলকাতায় আমাদের তিনটি কাজ যাচ্ছে । শ্রীভূমি স্পোর্টিং, সিংহী পার্ক-সহ আরেকটি পুজোয়। কলকাতা ছাড়াও দিল্লিতে ফাঞ্জাবীবাগে আলোর কাজ চলছে। শ্রীভূমির এবারের থিম 'মন্দির'। আলোর মাধ্যমে দিঘার জগন্নাথ মন্দির, পুরীর জগন্নাথ মন্দির ও কেদারনাথ মন্দিরের গেট থাকছে ৷ সেই আলো বোর্ডের উচ্চতা ছিল 22 থেকে 50 ফুট ৷"

লাইটিংয়ে অপারেশন সিঁদুর কীভাবে তৈরি ?
এছাড়াও সুশ্বেতা বলছেন, অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে সম্মান জানিয়েছি আমরা ৷ সেনার উদ্দেশে সুদর্শন চক্র মিসাইল তুলে ধরা হয়েছে। আলো বোর্ডে যার উচ্চতা 16 ফুট বাই 20 ফুট। আমরা ইন্ডিয়ান আর্মির সঙ্গে S-400 মিসাইল ও পুরাণে যেমন কৃষ্ণের হাতে যে সুদর্শন চক্র ছিল, তা-ও তুলে ধরা হয়েছে এলইডি আলোর বোর্ডের মাধ্যমে। মহাকাশজয়ী সুনীতা উইলিয়ামসকেও আলোকশিল্পের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।এবারে আমাদের আপাতত আনুমানিক 25 লাখ টাকার বাজেট রয়েছে ।

জগদ্ধাত্রী পুজোর লাইটিং
দুর্গাপুজোর পাশাপাশি আসন্ন চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় শোভাযাত্রার জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছেন আলোকশিল্পীরা, জানালেন সুশ্বেতা ৷ তিনি বলেন, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় বেশোহাটা ও রথের সড়ক জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটির কাজ পেয়েছি ৷ জগদ্ধাত্রী পুজোর শোভাযাত্রায় আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির উপর কাজ করা চলছে।

নকশাশিল্পীরাই আলোক শিল্পের মূল কারিগর
চন্দননগরের আলোক শিল্পের মূল কারিগর হল যাঁরা বিভিন্ন সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিকে আলোয় রূপ দেন। কী বিষয়ের উপর আলো তৈরি হবে, কীরকম হবে তা কাগজে ফুটিয়ে তোলেন নকশাশিল্পীরা (Sketch Artist)। তাঁদের হাতের কাজ আলোকশিল্পীরা বিভিন্ন পুজো কমিটিগুলিকে দেখান। সেই অনুযায়ী অর্ডার আসার পর প্রথমে ছোট করে এঁকে, পরে বড় বড় কাগজের উপর ফুটিয়ে তোলা হয় ৷ তারপরই 22 থেকে 50 ফুটের আলোর কাঠামোর রূপ দেন আলোকশিল্পীরা।

কীভাবে ফুটে উঠেছে অপারেশন সিঁদুর ও সুনীতা উইলিয়ামসের মহাকাশ অভিযান ?
চন্দননগরের এক নকশাশিল্পী অসীম রায়। তিনি বলেন, "আলোক শিল্পের প্রধান কাজ আঁকা। সেই কাজই আমি করি। বহুবছর ধরে করে আসছি। আঁকা ছাড়া এই শিল্প চলবে না। এবারে অপারেশন সিঁদুর ও সুনীতা উইলিয়ামসের মহাকাশ অভিযানের আলো আমার আঁকা। কীভাবে মহাকাশ থেকে ভারতীয় বংশোবদ্ভূত সুনীতা ফিরে এলেন ও ভারতীয় সেনার বাহাদুরি তুলে ধরা হয়েছে 22 ফুট স্ট্রাকচারের মাধ্যমে। আলোক শিল্পের বিখ্যাত আর্টিস্ট সতীনাথ দত্তের কাছেই আমার শিক্ষা। এখনও সেই ধারাকে আমরা ধরে রেখেছি।"

থ্রিডি অ্যানিমেশনে ইসরোর মহাকাশ অভিযান
চন্দননগরের আরেক বিখ্যাত আলোকশিল্পী অসীম কুমার দে ভারতীয় মহাকাশ সংস্থার (ইসরো) অভিযান আলোর মাধ্যমে তুলে ধরেছে। রকেট থেকে মহাকাশচারীর থ্রিডি অ্যানিমেশন লোহার স্ট্রাকচারের মাধ্যমে আলোয় সাজিয়েছেন শিল্পী ৷

আলোকশিল্পী অসীম কুমার দে
শিল্পী এবার গুজরাত-সহ কলকাতা, হুগলি মিলিয়ে একাধিক কাজ করছেন। শ্রীরামপুর চাতরা মেটে শীতলাতলা, কলকাতা পিকনিক গার্ডেন তিলজলা যুবকবৃন্দ ও বরানগর নপাড়া দাদাভাই সংঘ-সহ বেশকিছু দুর্গাপুজোয় কাজ করছেন তিনি। এছাড়াও কলকাতা এয়ারপোর্ট অথরিটি দুর্গাপুজো উপলক্ষে দমদম বিমানবন্দর ক্যাম্পাসে ইন্ডিয়ান ফ্ল্যাগ-সহ বিভিন্ন রকমের রোড লাইটের আয়োজন করেছে ৷ তিনিই সেই দায়ভার নিয়েছেন ৷ এছাড়াও এসএমডি ও এলিডি লাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের দালানবাড়ির স্তম্ভের কারুকার্য ও 50 ফুটের গেট ও রোডলাইটের কাজও তিনিই সামলাচ্ছেন ৷

আলোকশিল্পী অসীম কুমার দে'র বক্তব্য
শিল্পী অসীম বলেন, "বরানগর নপাড়ায় দুর্গাপুজো কমিটি, শ্রীরামপুর, কলকাতা, ধানবাদে দুর্গাপুজো উপলক্ষে আমার আলোর কাজ চলছে।চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর আলোর শোভাযাত্রাটাই আমাদের কাছে মূল আকর্ষণ। বর্তমানে চন্দননগর থেকেই আলোর বোর্ড তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। কিন্তু চন্দননগরের আলো মেকানিজম সম্পূর্ণ আলাদা। সেটাই ধরে রাখার জন্য এবছর আমার তৈরি বিশেষ আকর্ষণ ভারতের ইসরোর মহাকাশ অভিযানের আলোকসজ্জা।"

তিনি আরও বলেন, "ইসরোর ভিশন মিসাইল টেকনোলজি (Vision Missile Technology)-কেই তুলে ধরেছি। ইসরোর পিএসএলভি রকেট থেকে মহাকাশের স্পেস স্টেশন এবং মহাকাশচারী থ্রিডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। সেখানে কীভাবে মহাকাশচারীরা জীবনযাপন করেন তা তুলে ধরা হয়েছে ৷ মানুষের বোধগম্যের জন্য এই প্রযুক্তিটাকেই আলোর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।"
তাঁর কথায়, এই প্রজেক্টের আলো ক্যাপ এলইডি, রুপ লাইট ও নিয়ন আলো দ্বারা ব্যবহৃত। ব্যাকগ্রাউন্ড পুরো টুডি হবে আর বেশিরভাগ অংশ 3D Animation। এই মুহূর্তে গুজরাত ও ঝাড়খণ্ডে আমার আলো পাঠানো হয়েছে। কলকাতার দুর্গাপুজোয় গ্রিক মাইথোলজির উপর কাজ ও পালতোলা নৌকা শিশুদের এবছর দারুণ আনন্দ দেবে, আশা করি।

