বাংলা ভাষা ও বাঙালির উপর আক্রমণ ! চালতাবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপ জুড়ে প্রতিবাদের বার্তা
থিম তুলে ধরতে বাংলা ও বাঙালির শিকড় সহজ পাঠ থেকে বর্ণপরিচয়ে সেজে উঠছে চালতাবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপ ৷ ঘুরে দেখলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি মনোজিৎ দাস ৷

Published : September 15, 2025 at 9:04 PM IST
কলকাতা, 15 সেপ্টেম্বর: 'বাংলা আমার মায়ের ভাষা, বাংলাই আমার প্রাণের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা ৷'
রাজনীতির আঙিনা ছেড়ে এবার বাংলা ভাষার অপমানের আঁচ পড়ল বাঙালির সব থেকে বড় উৎসব দুর্গাপুজোয় । চালতাবাগান সর্বজনীনের এই বছরের বিষয় ভাবনা 'আমি বাংলায় বলছি' । এবার এই দুর্গাপুজোর 81তম বর্ষ । তারা বাংলা ভাষার মাধুর্য, আন্দোলন, লড়াই, বাংলার মনীষীদের তুলে ধরেছে গোটা মণ্ডপজুড়ে । শিল্পী প্রদীপ্ত কর্মকারের হাত ধরেই মণ্ডপ সেজে উঠছে বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি ঘটে চলা অপমান, আক্রমণের বিরুদ্ধে বার্তা দিয়ে ।
বাংলা ভাষা ও বাঙালি
সমসাময়িক সময় রাজ্যের শাসকদলের তরফে ভিন রাজ্যে বাংলা ভাষা ও বাঙালির উপর অত্যাচার ও অপমানের অভিযোগ করা হয়েছে বারবার ৷ প্রায় প্রতিদিন টিভির পর্দায় এই সংক্রান্ত খবর শিরোনামে উঠে আসছে । আর সেই সব নিয়ে ইতিমধ্যে রাজ্য রাজনীতি সরগরম । কেন্দ্র ও রাজ্য দুই শাসকদলের তরজা চলছে প্রতিনিয়ত । লাগাতার আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েছে তৃণমূল ।

বাংলা ভাষা এবং এই ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে একটি গভীর ও অর্থবহ সম্পর্ক রয়েছে । যদি কেউ বিশ্বের সামগ্রিক বিকাশে বাংলা ভাষার বড় অবদান রাখে, তবে তা নিঃসন্দেহে বাঙালি সমাজ । শতাব্দীপ্রাচীন এই ভাষার ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বোঝা যায়, আগেকার দিনে এর গুরুত্ব কতটা ছিল ।

বাংলা ভাষাকে সম্মানের বার্তা
ক্লাব কর্তা মৌসম মুখোপাধ্যায়ের কথায়, "বাংলা ভাষার প্রতি অপমানের বিরুদ্ধে বার্তা দিতে বাংলার সব থেকে বড় উৎসবের মঞ্চকেই বেছে নিয়েছি আমরা । আমাদের মাতৃভাষাকে অনেকেই সম্মান দিচ্ছে না, অপমান করছে, বাংলা বলে আক্রান্ত হতে হচ্ছে, যেন বিপন্ন এক নারীর রূপে তুলে ধরা হয় । আবার অনেকের ধারণা, শুধু বাংলা জানলে চলবে না ৷ চাকরি বা ব্যবসার জন্য অন্য ভাষাও জানতে হবে । এর ফলে বাংলা ভাষাকে কিছুটা উপেক্ষিত ভাবেই দেখা হয় ।"

তিনি জানান, এই কারণে অনেকে মনে করেন, বাংলা ভাষা জানাটা অতটা জরুরি নয় । কিন্তু যোগাযোগ ছাড়া ব্যবসা সফল হয় না, সাহিত্য ও জ্ঞানের অভাবে একজন মানুষ মর্যাদাহীন হয়ে পড়ে । যেমন দেবী লক্ষ্মী সম্পদের প্রতীক, তেমনই মা দুর্গার দশভুজা যেন বাংলাভাষার বহুমুখী বিকাশের প্রতীক, যা গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে ।

মোদের গরব বাংলা ভাষা
মৌসম মুখোপাধ্যায় বলেন, "বাঙালিরা নিজেদের ভাষা নিয়ে গর্বিত । এটি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ে প্রোথিত এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে । বাংলা ভাষার গুরুত্ব শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর স্বীকৃতি রয়েছে বিশ্বজুড়ে । যেমন দুর্গাপুজোর সময় বাঙালিরা দেশে ফিরে আসেন এবং নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা পুনরায় ফিরে পান, তেমনই দুর্গাপুজো ও বাংলা ভাষা একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা । এই সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে একটিকে ছাড়া অন্যটির কথা ভাবাই যায় না ।"

ক্লাব কর্তা আরও বলেন, "গোটা বিশ্বে বাংলায় কথা বলেন এমন মানুষের সংখ্যা হিসেবে পঞ্চম ভাষা । দেশের 8 শতাংশের বেশি মানুষ বাংলায় কথা বলেন । রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, রামমোহন রায়, নজরুল ইসলাম আরও কত নাম । দেশের স্বাধীনতা বাঙালির অবদান, বিশ্ব মিষ্টি ভাষার স্বীকৃতি মিলেছে আমাদের বাংলা ভাষা । আর সেই ভাষায় কথা বলার অপরাধে ভিন রাজ্যে আক্রান্ত হতে হচ্ছে বাঙালিকে । অপমানিত হতে হচ্ছে । বাঙালি হিসেবে এই ঘটনা আমাদের কাছে বেদনার । তাই বাংলার সব থেকে বড় উৎসবের মঞ্চকে বেছে নিয়েছি এর বিরুদ্ধে বার্তা দিতে ।"


দুর্গা প্রতিমায় থাকছে চমক
শিল্পী প্রদীপ্ত কর্মকার বলেন, "মণ্ডপের প্রবেশ মুখেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি গাছের আদলে বোঝানো হয়েছে । তারপর ভাষা আন্দোলনের পর্ব তুলে ধরা হয়েছে । আর ভিতরে গেলে সহজ পাঠ, বর্ণপরিচয় থাকছে ৷ যেগুলো মাধ্যমে আমরা বাংলা ভাষাকে মনে গেঁথে নিতে শিখেছি সেগুলো । বাংলার মনীষীদের ছবি, তাদের কর্মকাণ্ড লেখা থাকবে । দেওয়াল জুড়ে বাংলায় লেখা, লাইভ পারফর্মেন্স থাকছে । মণ্ডপে মায়ের মূর্তি অন্যরকম হচ্ছে । সেখানে মা পড়াচ্ছেন ছেলে মেয়েরা শুনছেন । সেখানে বাংলার গান গাইবেন গায়করা ।"


