জিম করতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বাড়ছে, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বাড়ছে জিমে শরীরচর্চা করতে গিয়ে আচমকা মৃত্যুর ঘটনা ৷ চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ ৷


Published : August 5, 2025 at 8:58 PM IST
কলকাতা, 5 অগস্ট: জিমে শরীরচর্চা করার সময় মৃত্যু ! সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনা নজরে এসেছে ৷ বিশেষত, তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে ৷ সম্প্রতি বাংলার এক তরুণ ক্রিকেটার প্রাণ হারিয়েছেন একইভাবে ৷ কিন্তু, কেন ? কী কারণে ঘটছে এই ধরনের ঘটনা ? চিকিৎসকরাই বা কী বলছেন ? হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ ৷
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ ৷ যার মধ্যে অন্যতম, হার্ট হেলথ এবং জিমে শরীরচর্চার সময় নেওয়া প্রোটিন ও অন্যান্য সাবস্টিটিউ ৷ আর সেই নিয়েই ইটিভি ভারত কথা বলেছিল বিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট চিকিৎসক রাকেশ সরকার এবং নিউট্রিশনিস্ট মালবিকা দত্তের সঙ্গে ৷
বিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট চিকিৎসক রাকেশ সরকার বলেন, "মানুষ যখন জিম করে অথবা এই ধরনের ভারী কোনও কাজ মানুষ করে, তখন তার শরীরে নিউরো ট্রান্সমিটারে কিছু বদল হয় ৷ এই ট্রান্সমিটারগুলি মূলত হার্টরেট বা হৃদস্পন্দনকে প্রভাবিত করে ৷ অনেক সময় এমন হয়, কোনও ব্যক্তির হৃদস্পন্দন কম ছিল ৷ এবার সেটাই জিম বা এই ধরনের কাজ করার ফলে, তা আরও দুর্বল হয়ে যায় ৷ আবার অনেক ক্ষেত্রে, কোনও ব্যক্তি হয়তো জানেনই না, তাঁর হার্টের পেশি অত্যধিক মোটা বা অত্যধিক পাতলা ৷ এবার যখন সেই ব্যক্তি জিমে গিয়ে ওজন তুলছেন বা হেভি ওয়ার্ক-আউট করছেন, তখন তাঁর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় ৷ সুস্থ হার্টের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে, তা কিছুক্ষণের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায় ৷ কিন্তু, পেশির অসমাঞ্জস্যতা থাকলে হার্টের সেই অতিরিক্ত কম্পন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় ৷ এমন ব্যক্তিদের জিম করার সময় সেক্ষেত্রে সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় ৷"
কিন্তু, এই ধরনের ঘটনায় করণীয় কী থাকে ? চিকিৎসক বলছেন, "তখন আমরা সিপিআর অথবা বাইরে থেকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে থাকি ৷ আর তা সেই রোগীর ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন হয় ৷ পাশাপাশি, দ্রুত মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রয়োজন পড়ে ৷"
বর্তমানে বেশ কিছু জিমে শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে ৷ হাইটেক জিমগুলিতে ইসিজি ও ইকো-কার্ডিওগ্রামের ব্যবস্থা থাকে ৷ যাঁরা জিমে ভর্তি হতে আসেন, তাঁদের হার্টের পরীক্ষা করানো হয় ৷ কিন্তু, সেটাই যথেষ্ট নয় বলেই জানাচ্ছেন ওই চিকিৎসক ৷ তিনি বলেন, "যখন কোনও ব্যক্তি জিমে ভর্তি হন, সেই সময় তাঁর হার্টের বর্তমান পরিস্থিতি ও পূর্বের ইতিহাস জানা যায় না ৷ খুব কম জিমে সেই ব্যবস্থা থাকে ৷ সেখানে একজন মানুষের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয় ৷"
চিকিৎসক রাকেশ সরকার আরও বলেন, "কিছু জিমে ব্যবস্থা থাকে ইকো এবং ইসিজি করার ৷ কিন্তু, সেটাই যথেষ্ট নয় ৷ একটা ধারণা পাওয়া যায় ৷ কিন্তু, হার্টের পেশির অবস্থা সম্পর্কে কোনও তথ্য থাকে না ৷ সেটা নিয়ে সতেচনভাবে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন ৷" এই নিয়ে তাঁর মতামত, অযথা বেশি ওজন না-তুলে যদি কার্ডিও বা স্বাভাবিক ব্যায়াম করা যায়, সব থেকে ভালো সেটাই ৷
অন্যদিকে, জিমে শরীরের পেশি ও ওজন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রোটিন ও সাপ্লিমেন্টারি নেওয়ার চল রয়েছে ৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিম প্রশিক্ষকরা তাঁদের গ্রাহকদের সেই সাপ্লিমেন্টারি প্রেসক্রাইব করেন ৷ কিন্তু, আদতে কোনও ব্যক্তির শরীরে সেই প্রোটিন বা অন্যান্য সাপ্লিমেন্টারি ফুডের প্রয়োজন আছে কি না, সেটা জানার প্রয়োজন বোধ করেন না জিম প্রশিক্ষকরা ৷
এই নিয়ে নিউট্রিশনিস্ট মালবিকা দত্ত ইটিভি ভারতকে বলেন, "এখন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার একটা চল তৈরি হয়েছে ৷ জিম ট্রেনারের কথায় বা অনলাইনে দেখে লোকজন সেটা পান করেন ৷ কিন্তু, তাঁরা কিন্তু জানেন না, তাঁদের শরীরে আদতে সেই প্রোটিন বা সাপ্লিমেন্টারির প্রয়োজন আছে কি না, বা থাকলেও তা কতটা পরিমাণে নিতে হবে ৷"
নিউট্রিশনিস্টের কথায়, "না-বুঝে এই সমস্ত প্রোটিন ও অ্যাডেড নিউট্রিশন নেওয়ার ফলে শরীরে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ৷ এর নানা উপসর্গ থাকে ৷ রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে ৷ যার ফলে জিমে ওজন তুললে বা বেশি ওয়ার্ক-আউট করলে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় লোকজনের ৷ কারণ, সেই ব্যক্তি জানে না-তার কতটা প্রোটিন বা ক্রিয়াটিন পাউডার দরকার ৷ তাই প্রপার স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে, সেই মতো নিউট্রিশনিস্টের মাধ্যমেই ডায়েট তৈরি করা উচিত জিমে ভর্তি হওয়ার সময় ৷"
ডায়েট বা খাদ্যাভাস নিয়েও মালবিকা দত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন ৷ তিনি বলেন, "অনেকসময় লোকজন সকালের খাবার খান না ৷ বদলে বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা সাপ্লিমেন্টারি নেন ৷ আর তাই দিয়েই দিনভর চালিয়ে দেন ৷ মনে করেন, তাতেই শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব মিটছে ৷ এটা একেবারেই ভুল ৷ সকালে পরিমাণ মতো ব্রেকফাস্ট জরুরি ৷ তার থেকেই সারাদিনের কাজে এনার্জি বা শক্তি আসে ৷ কর্মক্ষমতা বাড়ে ৷ বরং সাপ্লিমেন্টারি শরীরে ক্ষতি করে ৷"

