বন্ধের মুখে 75 বছরের পুরনো হরিজন পাড়ার পুজো, অন্তরায় অর্থ
75 বছরের পুরনো হরিজনদের পুজোয় বাধা অর্থ ৷ তাঁরা 'ছোট জাত' বলে মিলছে না সাহায্য ? উত্তরের সন্ধানে ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পার্থ দাস ৷

Published : September 11, 2025 at 8:37 PM IST
মালদা, 11 সেপ্টেম্বর: অসহযোগিতায় বন্ধ হতে বসেছে প্রায় 75 বছরের পুরনো এক দুর্গাপুজো ৷ যে পুজোর পত্তন করেছিলেন এলাকার কিছু হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ ৷ তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা হরিজন বলেই হয়তো পুজোর জন্য এখন আর মানুষের সহযোগিতা পাচ্ছেন না ৷ তাই ইচ্ছে না-থাকলেও তাঁদের এই পুজো বন্ধ করে দিতে হচ্ছে ৷ ঘটনাটি রতুয়া 1 নম্বর ব্লকের সামসী গ্রাম পঞ্চায়েতের রতনপুর গ্রামের ৷ এই গ্রামেই বসে জেলার অন্যতম বড় সামসী হাট ৷ হাটের একপাশে রয়েছে হরিজন পাড়া ৷
অন্তত 75 বছর আগে এই পাড়াতেই পুজো শুরু করেছিলেন বাসিন্দারা ৷ যদিও স্থানীয়দের দাবি, পুজোর বয়স 100 বছর হয়ে গিয়েছে ৷ দুর্গাপুজো করার মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন রাধিকা হরিজন ৷ তাঁর বাড়ির পাশের জায়গায় একটি অস্থায়ী টিনের চালার নীচে শুরু হয়েছিল পুজো ৷ 87 বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন রাধিকাবাবু ৷ তারপরেও পুজো বন্ধ হয়নি ৷
গত বছর পর্যন্ত সেই ভাঙাচোরা টিনের চালার নীচে পুজো হয়ে এসেছে ৷ সেখানে মায়ের মাটিতে প্রতিদিন পুজো করেন হরিজন সম্প্রদায়ের মহিলারা ৷ গত বছর পর্যন্ত মূর্তি উঠেছে, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ হয়েছে, ঢাকের বাদ্যির তালে মন মেতেছে সাত থেকে সত্তরের ৷ কিন্তু এবার সব নিস্তব্ধ ৷ পাড়ার সবাই চাইছেন, কেউ তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াক ৷ তাঁদের একটু সাহায্য করুক ৷ তাহলে পুজোর যে ক'দিন বাকি আছে তার মধ্যেই তাঁরা দেবী আরাধনার ব্যবস্থা করে নিতে পারবেন ৷ ইটিভি ভারতের কাছে পুরো ঘটনা জানতে পেরে দ্রুত পদক্ষেপ করার আশ্বাস পঞ্চায়েত প্রধানের ৷

হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ কীভাবে দুর্গাপুজো শুরু করতে পারে ?
জানা যাচ্ছে, দুর্গাপুজো চালু করতে গিয়ে রাধিকাবাবু কিংবা তাঁর সঙ্গীদের কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি ৷ তথাকথিত সুশীল সমাজের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিল, হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ কীভাবে দুর্গাপুজো শুরু করতে পারে ? তাদের দুর্গাপুজো করার অধিকার নেই ৷ আর্থিক সমস্যাও ছিল ৷ যদিও কিছু মানুষ রাধিকাবাবুদের দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ৷ তাঁদের সহযোগিতাতেই হরিজন সম্প্রদায়ের এই দুর্গাপুজো আলোর মুখ দেখেছিল৷

এলাকার পুরোহিতরা করেন না পুজো
রাধিকাবাবুর পুত্রবধূ বিভা হরিজনের বয়স এখন 58 বছর ৷ তিনি বলছেন, পুজোটা এবার বন্ধ হয়ে গেল ৷ এই পুজোর বয়স 100 বছর হয়ে গেল ৷ আমার শ্বশুরমশাই এই পুজো চালু করেছিলেন ৷ এখানে প্রতিমা তৈরির কারিগরের ঠিক নেই ৷ যখন যাঁকে পাই তাঁকে দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হয় ৷ কিন্তু এই এলাকার কোনও পুরোহিতও আমাদের পুজো করতে চায় না ৷ কেন, সেটা জানি না ৷ আমরা স্থানীয় পুরোহিতদের হাতে-পায়ে ধরেছি ৷ কিন্তু কেউ পুজো করেননি ৷ তাই বিহারের কাটিহার থেকে পুরোহিত নিয়ে এসে পুজো করাতাম ৷ আমার এক ননদ সেই পুরোহিতের খবর দিয়েছিল ৷ এবার টাকাপয়সা নেই ৷ চারদিকে জল ৷ কেউ চাঁদা দিচ্ছে না ৷ পঞ্চায়েত কিংবা ব্লক অফিস থেকে কোনও সাহায্য পাচ্ছি না ৷ আর কত জায়গায় যাব ? পুজো বন্ধ হওয়ায় আমাদের মন ভালো নেই ৷ মানুষের অসহযোগিতার জন্যই আমাদের পুজোটা এবার বন্ধ হয়ে গেল ৷"
চাঁদা চাইলে মেলে 10-50 টাকা
স্থানীয় রেখা হরিজনের কথায়, "আমার বিয়ে হওয়ার আগে থেকেই শ্বশুরমশাইরা এই পুজো করতেন ৷ ঠিক যেভাবে বড় বড় পুজো হয়, সেভাবেই ঢাকঢোল বাজিয়ে পুজো হত ৷ শ্বশুরমশাই হাট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় দোকানদারদের কাছে চেয়েচিন্তে পুজোর আয়োজন করতেন ৷ যতটা সামর্থ্য সেই অনুযায়ীই পুজো করতাম ৷ কিন্তু এখন কেউ টাকা দিতে চাইছে না ৷ তাই এবছর পুজো করতে পারছি না ৷ পুজো বন্ধ হয়ে গেল ৷ কাউকে চাঁদা চাইলে মাত্র 10-50 টাকা দিয়ে দেয় ৷ তবে সহযোগিতা পেলে আমরা আবার পুজো করব ৷ এবছরও পুজো বন্ধ হোক, সেটা আমরা কেউই চাই না ৷"
বিডিও-পঞ্চায়েত দফতরে গেলেও মেলেনি সাহায্য়
হরিজন পাড়ার আরেক বাসিন্দা পিঙ্কি হরিজন বলেন, "আমরা বিডিও অফিসে গিয়েছি, পঞ্চায়েত দফতরেও গিয়েছি ৷ পুজোটাকে টিকিয়ে রাখতে যা করার করেছি ৷ কিন্তু কেউ আমাদের কোনও সাহায্য করছে না ৷ কোনও সহযোগিতা না পেলে কীভাবে পুজো করব ? তাই এই পুজো আমাদের বন্ধ করে দিতে হচ্ছে ৷ এখানকার খুব কম মৃৎশিল্পীই আমাদের প্রতিমা বানাতে চায় ৷ এই পুজো করতে আমাদের 50 হাজার টাকার উপর খরচ হয় ৷ আমরা চাঁদা তুলে পুজো করতাম ৷ কিন্তু এখন চাঁদা তুলতে গেলেও ঝামেলা হচ্ছে ৷"
পুজোর টাকা জোগাড় করার ক্ষমতা কোথায় ?
রাধিকাবাবুর নাতনি জ্যোৎস্না হরিজনের বিয়ে হয়েছে এই পাড়াতেই ৷ তাঁর মুখেই বেরিয়ে এল আসল সত্যিটা ৷ তিনি জানান, এতদিনের পুজো বন্ধ হয়ে গেল ৷ ভালো লাগছে না ৷ শুধুমাত্র পয়সার জন্য এবার পুজোটা করতে পারলাম না ৷ আমার দাদুরা এই পুজো শুরু করেছিল ৷ দাদু মারা যাওয়ার পর আমার কাকিমা এই পুজোর হাল ধরেন ৷ আমরা ছোট জাত বলে কেউ আমাদের সাহায্য করছে না ৷ চাঁদা দিচ্ছে না ৷ কেউ 50 টাকা, কেউ 100 টাকা দিচ্ছে ৷ আমাদের এখন ঘটপুজো করারও সামর্থ্য নেই ৷ আমরা বাঁশের কাজ করে পেট চালাই ৷ পুজোর টাকা জোগাড় করার ক্ষমতা কোথায় ?"
কোনওভাবে পুজো হোক চাইছে বছর দশের প্রিয়া
নিজেদের পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার দুঃখ গ্রাস করেছে 10 বছরের প্রিয়াকেও ৷ পঞ্চম শ্রেণির এই ছাত্রীর কথায়, "পুজোতে খুব আনন্দ হত ৷ সবাই মিলে ক'টা দিন একসঙ্গে কাটাতাম ৷ এবার পুজো হবে না ৷ সবাই মিলে পুজোর আনন্দ ভাগ করা যাবে না ৷ যদি কোনওভাবে পুজোটা হয় তবে খুব ভালো হবে ৷"
ইটিভি ভারতের কাছে পুজোয় বাধার বিষয়ে জানতে পারেন পঞ্চায়েত প্রধান
হরিজন পাড়ার পুরনো এই পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর ইটিভি ভারতের কাছেই পেলেন সামসী গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান মনীষা দাস ৷ তাঁর আশ্বাস, "হরিজন পাড়ার বাসিন্দাদের যাতে আর্থিক উন্নয়ন হয় তার জন্য আমি তাঁদের নিয়ে একটি স্বয়ম্ভর গোষ্ঠী বানিয়ে দিয়েছি ৷ কিন্তু তাঁদের এতদিনের পুরনো পুজো যে অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সেই খবর আমার কাছে ছিল না ৷ আমি তাঁদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব ৷ আমার পক্ষে যতটা সাহায্য করা সম্ভব সেটা অবশ্যই করব ৷ এখন আগের সেই যুগ নেই ৷ হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষও এখন উচ্চশিক্ষা লাভ করছেন ৷ অন্য সবার মতো তাঁদেরও দুর্গাপুজো করার সমান অধিকার রয়েছে ৷ হরিজন পাড়ার পুজো যাতে এবারও হয়, তার জন্য যতটা সম্ভব চেষ্টা করব ৷"
হরিজন পাড়ার বাসিন্দারা বলছেন, মূলত আর্থিক সংকটের জন্যই এবার তাঁরা দুর্গাপুজো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ৷ এই সংকটের পিছনে রয়েছে জাতিগত ভেদাভেদের পুরোনো কুসংস্কার ৷ সত্যিই কি তাই ? তবে এতদিন নিরবিচ্ছিন্নভাবে এই পুজো হয়ে আসল কীভাবে ? পুরনো এই পুজো বন্ধের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেক ৷ কিন্তু উত্তরটা অজানা ৷
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি মহাত্মা গান্ধি কিংবা বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের ভারত সেই পুরনো কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণ করতে পেরেছে ?

