খাঁচায় বাঁধেননি ভালোবাসায় বেঁধেছেন ! অ্যাপ ক্যাব চালকের ‘সারথি’ বুলবুলি পাখি
লক্ষ্মীমন্ত বুলবুলি পাখি নাকি টিয়া, কোকিল, শালিখ, কাক, চড়াইয়ের গলাও নকল করতে পারে । সফর সঙ্গীর সেই গল্পই শোনালেন ক্যাব চালক সুশান্ত মণ্ডল ৷

Published : August 13, 2025 at 9:00 PM IST
কলকাতা, 13 অগস্ট: খাঁচায় বাঁধেনি তাকে ভালোবাসায় বেঁধেছে বোধহয় ৷ অ্যাপ ক্যাব চালকের সঙ্গে পাখির বন্ধুত্ব দেখলে এই কথাই মনে হবে আপনার ৷ কলকাতার রাস্তায় কোনোদিন আপনার সাক্ষাৎ হতে পারে অ্যাপ ক্যাব চালক সুশান্ত মণ্ডলের সঙ্গে ৷ আর তাঁরই সারথি বুলবুলি পাখি ৷ বলা চলে, ঘরে বাইরে সর্বক্ষণের সঙ্গী সে ৷ নাম ঝটু ৷ বসে থাকে সুশান্তর কাঁধেই ৷
মূলত, উত্তরপ্রদেশের মান্ধকার বাসিন্দা মহম্মদ আরিফের সারস পাখি অথবা বাংলাদেশের পটুয়াখালির কালামের বাজপাখি, আবার দুর্গাপুরের অঙ্কিতার শালিখ, মানুষ আর পাখির মধ্যেকার 'দোস্তি' নজির গড়েছে বারবার । একইভাবে কলকাতার গোপালপুরের মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা সুশান্ত মণ্ডল আর তাঁর ছোট্ট বুলবুলি পাখির ভালোবাসার গল্পও তাক লাগিয়ে দেয় ।
লক্ষ্মীমন্ত বুলবুলি পাখি
ব্যস্ত শহরে আজকাল অ্যাপ ক্যাব ছাড়া গতি নেই । সেই ক্যাবে উঠে হয়তো দেখলেন চালকের ডান কাঁধে নিশ্চিন্তে বসে আসে কালো রঙের একটি বুলবুলি পাখি । না গাড়িতে উঠে হয়তো আপনি এই দৃশ্য দেখে চমকে উঠতেই পারেন ৷ তবে সেসময় সুশান্ত মণ্ডল অভয় দিয়ে বলবেন, "ভয় নেই, উড়ে যাবে না আপনার দিকে । ডিসটার্ব করবে না । আমার কাঁধেই বসে থাকবে ।"
আর সত্যিই তাই । লক্ষ্মীছানার মতো পাখিটি শুধু ঘাড় নাড়ায় এদিক ওদিক । ওড়াউড়ির কোনও বালাই নেই । আসলে মালিকের বাধ্য সে । কিন্তু মালিক? না, তিনি তাঁকে সন্তানই মনে করেন ৷ সুশান্ত মণ্ডল বলছিলেন সেই কথাই ।
চালকের দেড় বছরের সঙ্গী
কিন্তু পাখি নিয়ে কেন গাড়িতে? ক্যাব চালক বলেন, "ওর নাম ঝটু । ডিম ফোটার 20-22 দিনের মাথায় ওকে কাক খেয়ে নিচ্ছিল । আমার স্ত্রী ওকে বাঁচিয়ে ঘরে নিয়ে আসে । সেই থেকে ও আমার সঙ্গেই থাকে । তাও প্রায় দেড় বছর হল । আমাকে ছেড়ে ও কোথাও যায় না । আর আমিও ওকে ছাড়া পথ চলি না । যেখানে যাই নিয়ে যাই । আমার কাঁধেই থাকে সবসময় । আর ঘুমানোর সময় প্লাস্টিকের বাস্কেটে থাকে ।"

সুশান্ত বলে চলেন, "ভোর 5টা সাড়ে 5টা থেকে ঝটু আওয়াজ শুরু করে বেরনোর জন্য । আমি যখন বেরোই আমার সঙ্গেই বেরোয় । আমার কাঁধে বসে থাকে । কখনও স্টিয়ারিং-এ, আবার কখনও আমার কোলেও বসে থাকে । আমি যতদূর যাই, ততদূর ও যায় । গাড়ির জানলা খোলা থাকলেও উড়ে যায় না । আমি কলকাতার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত গাড়ি নিয়ে ছুটে বেড়াই । আমার সঙ্গেই থাকে ও । ও শুধু একটা পাখি নয়, ও এখন আমার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে । সন্তানের মতো ।"
কী খায় ঝটু ?
সুশান্ত বলেন, "ও সেরেল্যাক খায় । আমি সেরেল্যাকের গুড়ো নিয়েই বেরোই । ঝটু খিদে পেলেই আমার কানে কামড় বসায় । তখনই বুঝি খেতে দিতে হবে ওকে ।" ছড়ায় আছে, 'বুলবুলিতে ধান খেয়েছে' ঝটু ধান খায় না? সুশান্ত মণ্ডল বলেন, "ওটা কবিতাতেই । আসলে ধান খায় না বুলবুলি পাখি ।" তিনি আরও বলেন, "আমরা কখনও কোনও হোটেলে খেতে গেলেও ঝটুকে নিয়ে যাই । আমার কাঁধেই থাকে । নেমে প্লেট থেকে খেয়ে আবার কাঁধে উঠে পড়ে ।"

এহেন লক্ষ্মীমন্ত ঝটু নাকি টিয়া পাখি, কোকিল, শালিখ, কাক, চড়াইয়ের গলাও নকল করতে পারে । হাঁসেরটাও নকল করতে শিখেছে সম্প্রতি । তবে, সবসময় তা শোনায় না সে । একটু মুডি গোছের যে । ইউটিউবের ভিডিয়ো দেখেও টিটিটিটি করে । সুশান্ত মণ্ডল বলেন, "কথা শেখাই না । যদি চলে যায় । মন খারাপ হয়ে যাবে । তবে, ছেড়ে রেখেছি । খাঁচায় বাঁধিনি । ওর যদি মনে হয় ‘এটা আমার দুনিয়া নয়, বাইরেটা আমার দুনিয়া’, তা হলে ও চলে যেতেই পারে ৷"

