বউবাজার বিপর্যয় কাটিয়ে চালুর পথে শিয়ালদা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো, কবে ফিরব ভিটেতে? প্রশ্ন ঘরছাড়াদের
দুঃখ আতঙ্ক নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তাঁদের আবেদন, শিয়ালদা ও এসপ্ল্যানেড মেট্রো চলুক, সঙ্গে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া হোক তাঁদের মাথার উপরের ছাদ ৷

Published : August 20, 2025 at 9:33 PM IST
বউবাজার, 20 অগস্ট: বউবাজার বিপর্যয়ের পর কেটে গিয়েছে 6 বছর ৷ দুর্গাপিতুরি লেন এখন দেখলে মনে হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনও এলাকা । সারি দিয়ে ভাঙা বাড়ির দেওয়াল । চারিদিক খা খা করছে । দুটো বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে ৷ আর কিছু বাড়ির অবস্থা শোচনীয় ৷ জরাজীর্ণ সেইসব বাড়িতেই এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন বেশকিছু বাসিন্দা ৷
এদিকে বিপর্যয় কাটিয়ে বউবাজারে শেষের পথে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর দুর্গাপিতুরি লেন অংশের কাজ । জুড়ে যেতে চলেছে শিয়ালদা ও এসপ্ল্যানেড স্টেশন । প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসছেন কলকাতায় ৷ 22 অগস্ট তিনি উদ্বোধন করবেন এই মেট্রো প্রকল্পের । তারপরেই পূর্ণমাত্রায় চালু হয়ে যাবে পরিষেবা ।
তবে এখনও ঘোর অন্ধকারে বিপর্যয়ে দুর্গাপিতুরি লেনের ঘরছাড়া পরিবারগুলি । কবে ফিরতে পারবেন ভিটেতে ? মেট্রো পরিষেবা চালু হলেও আগামীতে ফের বিপর্যয় ঘটবে না তো ? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিপর্যস্ত বাসিন্দাদের মনে । দুঃখ আতঙ্ক নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তাঁদের আবেদন, মেট্রো চলুক, সঙ্গে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া হোক তাঁদের মাথার উপরের ছাদ ৷

স্থানীয় বাসিন্দা মিন্টু সেন বলেন, "আমাদের বিপদ নিয়েই থাকতে হচ্ছে । ঘরবাড়ির যা অবস্থা করেছে তাতে কোনদিন ফের ভেঙে না পড়ে । উপরে বিপদ আবার নিচেও বিপদ । মেট্রো ট্রায়াল হচ্ছিল যখন বাড়ি কাঁপছিল । জীবনের ঝুঁকি নিয়েই শেষ দিন পর্যন্ত এখানে কাটাতে হবে । মুক্তি চাই ।"

সালটা 2019 ৷ 31 অগস্ট রাতে আচমকাই বউবাজার বিস্তীর্ণ এলাকায় নেমে আসে বিপর্যয় । ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের সেক্টর 5 থেকে শিয়ালদা, হাওড়া ময়দান থেকে ধর্মতলা কাজ সবে শেষ হয়েছিল । চলছিল ধর্মতলা ও শিয়ালদার মাঝের অংশের কাজ । সেসময় বিপর্যয় ঘটে সেই কাজে । প্রথমে বাড়ির দেওয়াল ৷ তারপর মেঝেতে ফাটল দেখা দেয় । তার পরবর্তী সময় একের পর এক তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে পুরনো বাড়ি ৷

নিজের পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় জিনিস, এমনকি অনেকে টাকা পয়সাটুকু নিতে পারেননি । এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন ঘর থেকে । চোখের সামনেই দেখেছেন ছোট থেকে বেড়ে ওঠা বাড়িকে ধুলিস্মাৎ হয় যেতে । এক রাতেই এক রাশ আতঙ্ক নিয়ে খালি হাতে ঘর ছাড়তে হয় একাধিক পরিবারকে । সে কথা আজও ভুলতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা ৷

বিপর্যস্ত বাসিন্দা সৌরভ লাহা বলেন, " সেদিনের কথা ভুলতে পারব না ৷ 2019 সালের 31 অগস্ট রাতে ঘরে ছিলাম । কোমড় পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছিলাম । ল্যাপটপ-সহ কিছুই নিতে পারিনি । সব শেষ । সেই বেরিয়েছি । এখনও বাড়ি পাইনি । শুনছি কাজ শুরু হয়েছে । কবে পাব দেখি । আমার মতো যারা ঘরছাড়া সবাইকে দ্রুত ফেরাতে হবে এটাই আমাদের আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ।" আরেক বাসিন্দা ছবি সাহার কথায়, "সেসময় ভয়ঙ্কর ফাটল ধরেছিল ৷ তা দেখেই আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল । আবার শুনছি মেট্রো চালু হবে । যদি ফের কিছু বিপদ হয় ৷ সেই আশঙ্কায় থাকব ।"

স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল ডেরা বলেন, "সেই অভিশপ্ত সকাল ভুলব না । সকালে চোখের সামনে পাশের বাড়ির মেঝে ফাটল । তারপর সবটাই মাটির নিচে ঢুকে গেল । ভয়ংকর । এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, যাকে যেখান থেকে চলে যেতে হয়েছিল তাদের সেই জায়গায় বাড়ি দ্রুত তৈরি করে ফেরানো হোক ।"

কলকাতা পুরনিগমের 48 নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিশ্বরূপ দে বলেন, "বিপর্যয়ের জেরে প্রায় হাজারখানেক মানুষ ছাদ হারিয়েছেন । এর মধ্যে যেমন বাসিন্দারা আছেন, তেমন আছেন সোনার গয়নার কারবারিরা । বিপজ্জনক হয়ে যাওয়াতে পুরো ভেঙে দিতে হয়েছে এমন প্রায় 52টি বাড়ি রয়েছে । তার মধ্যে 24টি নতুন করে হবে বলে পরিকল্পনা নিয়েছে । তবে সবেমাত্র দুটো বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে । বাকিগুলো কবে হবে জানা নেই । কিছু বাড়ি মেরামত হয়েছে । যে বাড়িগুলো মেরামত করছে কতটা ভালো করে হয়েছে সেটা পরিষেবা চালুর পরেই বুঝতে পাড়া যাবে ।"

প্রধানমন্ত্রী ও মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছে ওইসব বাসিন্দাদের ভিটে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কাউন্সিলরও ৷ তিনি বলেন, "এখানে রাজনীতির বিষয় নয় ৷ তার উর্ধ্বে গিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী ও মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করব অনেক দিন হয়েছে এবার দ্রুত এই বিষয় পদক্ষেপ করা হোক । উন্নয়ন হোক, তবে ঘরছাড়া মানুষগুলো তার ভিটে ফিরে পাক । এটাই চাইব ৷"


