ETV Bharat / state

আধুনিকমানের গ্রন্থাগারের অভাব বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান বোলপুরে

পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে বোলপুর সাধারণ গ্রন্থাগার ৷ যা নিয়ে আক্ষেপ বইপ্রেমীদের ৷

LACK OF MODERN LIBRARIES
আধুনিকমানের গ্রন্থাগারের অভাব বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি পীঠস্থান বোলপুরে ৷ (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 30, 2025 at 8:55 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

বোলপুর, 30 অগস্ট: আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বোলপুরে নেই একটিও আধুনিক মানের গ্রন্থাগার ৷ যা নিয়ে আক্ষেপ বইপ্রেমীদের ৷ রয়েছে প্রাচীন বোলপুর সাধারণ পাঠাগার ৷ কিন্তু, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, কর্মীর অভাবে তা কার্যত ধুঁকছে ৷ এমনকি অভিযোগ উঠেছে, খাতায়-কলমে যে পরিমাণ বই রয়েছে, বাস্তবে তা অমিল ৷

অথচ, এই পাঠাগারের সামনে দিয়েই কয়েকদিন আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং অমর্ত্য সেনের ছবি হাতে পদযাত্রা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তাঁদের স্পর্শ যে মাটিতে, সেখানে জাতীয়মানের তো দূরের কথা, একটি আধুনিকমানের গ্রন্থাগারই নেই ৷ আর এদিকে, বোলপুর-শান্তিনিকেতনকে শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান বলা হয় ৷ তাই 31 অগস্ট পশ্চিমবঙ্গ সাধারণ পাঠাগার দিবসে বইপ্রেমীদের দাবি রবিভূমে একটা ভালো গ্রন্থাগার হোক ৷

আধুনিকমানের গ্রন্থাগারের অভাব বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান বোলপুরে (ইটিভি ভারত)

বোলপুর টাউন লাইব্রেরির দৈন্যদশার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অরূপ ঘোষ ৷ তিনি বলেন, "সব থেকে বড় বিষয় হল কর্মী নেই ৷ মাত্র 2 জন স্থায়ী কর্মী ৷ আর টাকাও ঠিকমতো বরাদ্দ হয় না ৷ খরচ বেশি হয় ৷ প্রচারের অভাব তো আছেই ৷ প্রচারের অভাবে পাঠকের সদস্য সংখ্যা বাড়ছে না ৷ স্থায়ী কর্মী দিতে হবে, প্রচার করতে হবে ৷ তবেই ঠিকমতো চলবে একটা লাইব্রেরি ৷"

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত বোলপুর শহর ৷ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ভিটেমাটি ৷ এছাড়াও মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, পণ্ডিত জহরলাল নেহরু, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রশান্তচন্দ্র মহালনবীশ, রামকিঙ্কর বেইজ, নন্দলাল বসু, সত্যজিৎ রায় প্রমুখ মনীষীদের স্পর্শ পেয়েছে এই বোলপুর-শান্তিনিকেতন ভূমি ৷ তাই এই ভূমি শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টির তীর্থক্ষেত্র বা পীঠস্থান হিসাবে পরিচিত ৷

Lack of Modern Libraries
বোলপুর টাউন লাইব্রেরি ৷ (নিজস্ব ছবি)

অথচ, এই বোলপুর শহরে জাতীয় মানের তো দূরের কথা একটি আধুনিক মানের গ্রন্থাগারই নেই ৷ 1916 সালে বোলপুরে শ্রীনিকেতন রোডে গড়ে উঠেছিল 'বোলপুর সাধারণ পাঠাগার' ৷ শহর ও শহরতলীর স্কুল-কলেজের পড়ুয়া থেকে বইপ্রেমীদের আস্তানা এটি ৷ কিন্তু, বর্তমানে বেহাল দশা এই গ্রন্থাগারের ৷ খাতায়-কলমে 20 হাজার 497টি বই রয়েছে ৷ বাস্তবে তার সঙ্গে কোনও মিল নেই ৷ বর্তমানে পুরুষ সদস্য সংখ্যা 122 জন এবং মহিলা সদস্য 96 জন ৷ শিশু সদস্য 41 জন ৷ আবার খাতায়-কলমে মোট সদস্য 301 জন ৷ যেখানে নিয়মিত সদস্য অতি নগণ্য ৷

গ্রন্থাগারে গিয়ে দেখা গেল বেশির ভাগ বইয়ের তাক প্রায় শূন্য ৷ একজনও পাঠক-পাঠিকা নেই ৷ ধুলো জমে আছে অধিকাংশ বইয়ে ৷ একজন মাত্র ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অরূপ ঘোষ ৷ তিনি সপ্তাহে মাত্র একদিন আসেন ৷ কারণ, তিনি হেতমপুর রামরঞ্জন সাধারণ পাঠাগারের দায়িত্বে রয়েছেন ৷ নিয়মিত গ্রন্থাগারটি খোলেন ৷ এছাড়া, 3 জন মহিলা অস্থায়ী কর্মী রয়েছে ৷ তারা মাঝে মাঝে আসেন ৷ 2006 সালে তৎকালীন বোলপুরের বাম বিধায়ক (আরএসপি) তপন হোড়ের অর্থানুকূল্যে গ্রন্থাগারের দোতলার একটি ঘর হয়েছিল ৷ তারপর থেকে আর বড় কোনও বরাদ্দ মেলেনি গ্রন্থাগারের মানোন্নয়নের জন্য ৷

Lack of Modern Libraries
বোলপুর টাউন লাইব্রেরির সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি হাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ (নিজস্ব ছবি)

উল্লেখ্য, 31 অগস্ট 'পশ্চিমবঙ্গ সাধারণ পাঠাগার দিবস', তার আগে বইপ্রেমীদের দাবি বোলপুর সাধারণ পাঠাগারকে ঢেলে সাজানো হোক, অথবা বোলপুরে আধুনিকমানের একটি গ্রন্থাগার তৈরি করা হোক ৷ উল্লেখ্য, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই 31 অগস্ট গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয় রাজ্যের নিরিখে ৷

Lack of Modern Libraries
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাণের বোলপুর-শান্তিনিকেতন ৷ (নিজস্ব ছবি)

বই প্রেমীদের আক্ষেপ

বোলপুর কলেজের অধ্যাপক মিঠুনকুমার দে বলেন, "একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বলব, বোলপুরে একটি সচল ও সক্রিয় লাইব্রেরির খুবই প্রয়োজন ৷ যত দিন যাচ্ছে আমরা ডিজিটাল যন্ত্রাংশের দিকে ঝুঁকছি ৷ সেই সঙ্গে যদি লাইব্রেরিটাকে সক্রিয় করা যায় ও বইয়ের ব্যবহার বাড়ানো যায়, তাহলে খুব ভালো ৷ লাইব্রেরির কোনও বিকল্প হতে পারে না ৷ কিন্তু, বোলপুর টাউন লাইব্রেরি থেকে অন্যান্য লাইব্রেরিগুলির বর্তমান দশা খুবই করুণ ৷ লাইব্রেরির উন্নতি করলে পাঠক বাড়বে ৷"

Lack of Modern Libraries
পাঠকশূন্য বোলপুর টাউন লাইব্রেরি ৷ (নিজস্ব ছবি)

পূর্ণিদেবী চৌধুরী মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক সংঘমিত্রা ঘোষ বলেন, "বই পড়া ও ভ্রমণের কোনও বিকল্প হয় না ৷ বোলপুর টাউন লাইব্রেরি উৎকৃষ্ট মানের হলে, আমরাও বই পড়তে পারি ৷ এত উন্নয়ন, চারিদিকে এত-এত টাকা দান-অনুদান সত্ত্বেও লাইব্রেরির দিকে কারও নজর নেই, ভাবাই যায় না ৷ ছাত্রীবস্থায় আমরা এই বোলপুর টাউন লাইব্রেরি ব্যবহার করেছি ৷ আশেপাশে স্কুলের পড়ুয়ারা ব্যবহার করেছে ৷ কিন্তু, বিগত কয়েক বছরে বোলপুর টাউন লাইব্রেরির খুবই খারাপ অবস্থা ৷ বাম আমলে তাও ভালো ছিল ৷"

Lack of Modern Libraries
বোলপুর টাউন লাইব্রেরিতে অধিকাংশ তাকে বইয়ের সংখ্যা কম বা খালি ৷ (নিজস্ব ছবি)

বোলপুর বিধানসভার পাঁচবারের প্রাক্তন বাম বিধায়ক (আরএসপি) তপন হোড় বলেন, "বোলপুর-শান্তিনিকেতন শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যের তীর্থক্ষেত্র ৷ খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা এখানে বোলপুর সাধারণ পাঠাগারের দিকে ধ্যানই দেওয়া হচ্ছে না ৷ আমরা যখন সরকারে ছিলাম, তখন চেষ্টা করে গিয়েছিলাম পাঠাগারের মান উন্নয়নের ৷ এই সরকারের সময় রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক স্থিতিটা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, যেটা লুম্পেনাইজেশনের একটা ক্যারেক্টার ডেভলপ করেছে ৷ তবে, আমার বিশ্বাস বোলপুরের সুধী মানুষজন গণতান্ত্রিকভাবে এর প্রতিবাদ করবে ৷"

Lack of Modern Libraries
ধুলোর আস্তরণে ঢেকেছে বোলপুর টাউন লাইব্রেরি ৷ (নিজস্ব ছবি)

প্রসঙ্গত, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার রয়েছে ৷ যা অত্যাধুনিক মানের ৷ এছাড়া, রয়েছে আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ ভবনের গ্রন্থাগার, রবীন্দ্রভবন গ্রন্থাগার ৷ কিন্তু, সেগুলি সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য নয় ৷ যে কেউ, যখন ইচ্ছে গিয়ে বই পড়তে পারবেন না ৷ কারণ, এটি সম্পূর্ণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রাধীন ৷ এর বাইরেও বোলপুর-শান্তিনিকেতন জুড়ে রয়েছে বিশ্ববাংলা বিশ্ববিদ্যালয়, বোলপুর কলেজ, জেলার একমাত্র মহিলা কলেজ পূর্ণিদেবী চৌধুরী মহিলা মহাবিদ্যালয়-সহ একাধিক প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় ৷ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে ৷ অথচ, এই শহরে জাতীয় মানের তো দূরের কথা, একটি আধুনিক পরিকাঠামো যুক্ত গ্রন্থাগার নেই ৷ উল্লেখ্য, ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হল 12 অগস্ট ৷ ডক্টর এসআর রঙ্গনাথনের জন্মদিনে তাঁকে সম্মান জানিয়ে ওইদিন জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয় ৷