ETV Bharat / state

ঘোড়ায় টানা কাঠের ট্রামের সফর শুরুর 152 বছর, জন্মদিনেও ঐতিহ্য রক্ষার অঙ্গীকার

ঘোড়ায় টানা কাঠের ট্রামের সফর শুরু হয়েছিল 1873 সালের আজকের দিনে ৷ তার 152 বছরের জন্মদিনে সেই কাঠের ট্রামে হল ঐতিহ্যের সফর ৷

ETV BHARAT
কলকাতার ট্রাম সফরের 152 বছরের জন্মদিন পালন (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : February 24, 2025 at 8:09 PM IST

|

Updated : February 24, 2025 at 11:04 PM IST

8 Min Read
Choose ETV Bharat

কলকাতা, 24 ফেব্রুয়ারি: চল রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন...৷ আজ সত্যিই সেজেগুজে পরিপাটি বিশেষ এক ট্রামকার ৷ তবে লোহার নয়, আপাদমস্তক কাঠের বিশাল গাড়ি ৷ যা সাজানো ফুলের মালায় ৷ জন্মদিন বলে কথা ৷ তাও আবার 152 বছরের জন্মদিন ৷ ইতিহাসের পাতাগুলো পেছনের দিকে উলটোলে দেখা যাবে, 1873 সালে 24 ফেব্রুয়ারি প্রথমবার কলকাতার রাস্তায় চলে কাঠের এই ট্রাম ৷ তবে তা বিদ্যুচালিত ছিল না ৷ লালমুখো সাহেব ও মেমদের সাক্ষী করে সেই ট্রাম গাড়ি শিয়ালদা স্টেশন থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল ঘোড়া ৷ কালের বিবর্তনে সেই কাঠের ট্রাম আজ হারিয়ে গেলেও জন্মদিনে ফিরিয়ে আনা হল সেটিকেই ৷

সালটা ছিল 1873 । আজকের দিনেই সবেমাত্র পূবের আকাশে ফুটছে ভোরের আলো । সঙ্গে জাগছে ভোরের কলকাতা । রাজপথে ইতিউতি চলাচল শুরু হয়েছে গুটিকয়েক মানুষজনের । শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে শুরু হয়ে গিয়েছে যাত্রীদের কোলাহল । হঠাৎই রাস্তায় ঘোড়ায় টানা একটি গাড়ি ৷ আর তাকে ঘিরে লালমুখো বেশ কয়েকজন সাহেব ও মেমসাহেব দাঁড়িয়ে রয়েছেন ।

জন্মদিনে ঐতিহ্য রক্ষার অঙ্গীকার (ইটিভি ভারত)

করসেট গাউন পরা দু'জন মেম ও থ্রি পিস সুট পরা একজন সাহেব গটমট করে লোহার সিঁড়ি ভেঙে চড়ে বসলেন ঘোড়ার পিঠে লাগানো ছাউনি দেওয়া গাড়িটিতে । গাড়িটির নাম ট্রামকার । ওই প্রথম শহর কলকাতায় চালু হল ট্রামকার পরিষেবা । আর আজ সেই ট্রামের সফরের বয়স হল 152 বছর ।

জন্মের পর থেকেই বাঙালির ইতিহাস, কবিতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সিনেমা সবেতেই ট্রামের অবাধ বিচরণ । বাঙালি জীবন যদি একটা উপন্যাস হয়, তাহলে বলাই বাহুল্য যে ট্রাম তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । ব্রিটিশ আমলে প্রথমবার রাস্তা দিয়ে চলে ঘোড়ায় টানা কাঠের ট্রাম ৷ এরপর প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রামেরও বিবর্তন হয় । 1902 সালের 27 মার্চ ধর্মতলা খিদিরপুর রুটে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চলে । আর আজ 152 বছরে এসে মহানগরের মাত্র দুটি রুটে চলছে ট্রাম ।

যেমনভাবে বিবর্তন হয়েছে নাগরিক জীবনের, তেমনই বিবর্তন ঘটেছে ট্রামেরও । প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম, তারপর কাঠের ট্রাম । আর বর্তমানে লোহার ট্রাম । গড়িয়াহাট ট্রাম ডিপো থেকে শ্যামবাজার ডিপো পর্যন্ত ট্রাম যাত্রার জন্য যে গাড়িকে আজ ব্যবহার করা হয় সেটি একটি ঐতিহ্যবাহী ট্রাম । আজ ট্রামে 498 নম্বর ব্যবহার করা হয় । এটি একটি এল ক্লাসের ট্রাম, যাকে অনেক সময় তার সামনের দিক ও পেছনের দিকের আকারের জন্য 'হাতি গাড়ি' বা 'এলিফ্যান্ট ট্রাম' বলা হয় । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় খাস কলকাতায় নোনাপুকুর ওয়ার্কশপে তৈরি হয়েছিল এই ট্রামটি । তবে এল ক্লাসের যেই ট্রামগুলো একেবারে প্রথম তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলির মধ্যে ছিল 490 নম্বরের ট্রাম । তারপর তৈরি হয় এল ক্লাসের বাকি ট্রামগুলি । যেহেতু কাঠের ট্রামগুলি আকারে বেশ অনেকটাই বড় হয়, তাই সেই ট্রাম রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি করছে, এই যুক্তি দেখিয়ে সরকারি নির্দেশমতো 2015 সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই তা বন্ধ হয়ে যায় ৷

ক্যালকাটা ট্রাম ইউজারস অ্যাসোসিয়েশনের বা সিটিইউএ-এর পক্ষ থেকে আজকের এই ট্রাম সফরের আয়োজন করা হয় । এই সংগঠনের অন্যতম সদস্য দীপ দাস বলেন যে, সরকারি নির্দেশে যখন শহরের পথে কাঠের ট্রাম চালানো বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখনই বন্ধ হয়ে যায় এই ট্রামের পরিষেবাও । স্বাধীনতার আগে নোনাপুকুর ওয়ার্কশপে তৈরি হয়েছিল এই গাড়িটি । গাড়িটির বয়স 80 পেরিয়ে গেলেও আজও দিব্যি রমরম করে চলছে ট্রামটি । অল্প কিছু মেরামত করিয়ে নিতে পারলে এখনও আরও 100 বছর পরিষেবা দিতে পারবে এই ট্রাম ।

সিটিইউএ-এর এক প্রবীণ সদস্য উদিতরঞ্জন গুপ্ত জানিয়েছেন যে, "এই ট্রামটি 1940 সালের গোড়ার দিকে তৈরি হয়েছিল । এটি 500 সিরিজের এল ক্লাসের ট্রাম । বহুদিন টালিগঞ্জ রুটে এই ট্রামটি পরিষেবা দিয়েছে । পরে 1970 সালের শেষের দিকে ক্যালকাটা ট্রাম কোম্পানির কর্মীদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তুলে নিয়ে ডিপোতে নিয়ে আসার কাজ করত এই ট্রামটি । এরপর ট্রামটিকে মেরামত করা হয় এবং নাম দেওয়া হয় গীতাঞ্জলি । ওই সময় ট্রামটিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি, তাঁর বিভিন্ন লেখার অংশ দিয়ে সুসজ্জিত করে চালানো হয় । এটি একটি অত্যন্ত শক্তপোক্ত ট্রাম যা অনায়াসে আরও 50 বছর পরিষেবা দিতে সক্ষম । সারা পৃথিবী যখন সবরকম দূষণের বিপক্ষে সওয়াল করছে, এহেন পরিবেশবান্ধব যান ব্যবহার করার উপর অনেক বেশি জোর দিচ্ছে, তখন রাজ্য সরকার লাটে তুলে দিতে চাইছে এহেন চালু থাকা একটি ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ।"

সুদূর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর থেকে শুধুমাত্র কলকাতা ট্রাম নেটওয়ার্ক এবং ট্রামের জন্মদিনের জন্য এসেছেন ডেভিড । আজ ট্রাম যাত্রায় সবার সঙ্গে ডেভিডও অংশ নিয়েছিলেন । তিনি জানান যে, শুধুমাত্র ট্রামের টানেই আগেও দুবার এসেছেন এই শহরে । তবে তখন শহর দেখা হয়নি । তাই এবার ট্রামের সঙ্গে সঙ্গে শহরও দেখবেন ডেভিড । শহরে ট্রামের দুর্দশার জন্য চিন্তিত তিনিও । তাই এই 152 বছরের ইতিহাস যাতে কলকাতার বুক থেকে একেবারে ধুয়ে মুছে সাফ না হয়ে যায়, তাই সরকারকেও সমঝোতার হাত বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন ডেভিড ।

সংগঠনের আর এক সদস্য ইন্দ্রাণী রায়চৌধুরী বলেন, "শহরবাসীর কাছে আজ ট্রাম শুধুমাত্র একটা যান নয় । ট্রাম একটা আবেগ । এটা আমার জীবনের একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত । আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করব যেন ট্রাম পরিষেবাকে বন্ধ না করে বাঁচিয়ে রাখার পথ খোঁজা হয় ।"

আর এক সদস্যা শুভ্রা রূপা দত্ত বলেন, "আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন ট্রামে যাতায়াত করতাম । তখন ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া ছিল 50 পয়সা আর সেকেন্ড ক্লাসের ভাড়া ছিল 40 পয়সা । আমরা টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো থেকে ট্রামে উঠতাম । সেটা এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে । তাই ট্রাম নেটওয়ার্কের যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেটাকেই বাঁচাবার অনুরোধ রইল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ।"

মোমিনপুরের একটি ফুটবল ক্লাব থেকে খুদেরাও অংশগ্রহণ করে এদিনের ট্রাম যাত্রায় । তাদেরই একজন হাসান আলি ট্রাম সম্পর্কে তেমন কিছু না জানলেও একগাল হেসে বলে যে, এর আগে সে কখনও ট্রামে চড়েনি ৷ তাই আজ বন্ধুদের সঙ্গে ট্রামে চড়ে দারুণ মজা লাগছে । আর এক খুদে মহম্মদ মুর্শিদ বলে যে, সে এর আগেও বেশ কয়েকবার ট্রাম চড়েছে । আজ আবার ট্রামের জন্মদিনে ট্রাম চড়তে খুব ভালো লাগছে তার ।

সিটিইউএ-এর সদস্যরা ছাড়াও আজ পথচলতি সাধারণ মানুষজনও চড়েন এই সুসজ্জিত ট্রামে । তাঁদের মধ্যেই একজন দীপিকা প্রসাদ দাস বলেন যে, তিনি চান শহরের রাস্তায় অন্যান্য যানবাহনের পাশাপাশি চলুক ট্রামও । তিনি আরও বলেন যে, তাঁর বাবা ট্রাম কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন । তাই ট্রামের সঙ্গে তাঁর একটা আলাদা আবেগ জড়িয়ে রয়েছে । ছোট বাচ্চা আর বয়স্ক মানুষজনের জন্য ট্রাম খুবই সুবিধাজনক । তাই থাকুক ট্রাম ।

প্রসঙ্গত, ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন বা ডব্লিউবিটিসি এবং ক্যালকাটা ট্রাম ইউজারস সোসিয়েশন যৌথভাবে 2023 সালে ট্রামের 150 বছরের অনুষ্ঠান করেছিল অনেক বড় পরিসরে । উল্লেখযোগ্য ভাবে সেই বছরই কলকাতার বুকে প্রথমবার ট্রাম প্যারেড হয়েছিল । সেবারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী-সহ আরও বেশ কয়েকজন সরকারি আধিকারিক । সেবার অনেক ইতিবাচক কথা হয়েছিল ট্রাম নিয়ে । অথচ তার মাত্র দু'বছরের মধ্যেই রাজ্য প্রশাসন বৈমাত্রেয় আচরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে । অভিযোগ, কোনওভাবেই ট্রাম আর রাখতে চায় না সরকার ৷ তারা শুধুমাত্র ঐতিহ্যের নামে একটি রুটে জয় রাইড হিসেবে ট্রাম চালাতে চায় ।

আজ সকাল থেকেই গড়িয়াহাট ট্রাম ডিপোতে ছিল উন্মাদনা । ট্রামের 152তম জন্মদিনকে ঘিরে কচিকাঁচা থেকে শুরু করে নবীন ও প্রবীণ, উপস্থিতি ছিলেন সবাই । ঠিক সকাল 9টার সময় একটি সুসজ্জিত কাঠের ট্রাম 'গীতাঞ্জলি' যাত্রীদের নিয়ে শুরু করে সফর । প্রথমে এসপ্ল্যানেড ট্রাম ডিপো আর তারপর শ্যামবাজার ট্রাম ডিপোতে গিয়ে শেষ হয় এদিনের ট্রাম যাত্রা । এরপর শ্যামবাজারে গিয়ে কাটা হয় জন্মদিনের কেক ।

উল্লেখ্য, ভারতে কলকাতা ছাড়াও আরও একাধিক শহরে অন্যতম ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত পরিবহণের মাধ্যমে ছিল এই ট্রাম । কলকাতার পর তৎকালীন মাদ্রাজ, দিল্লি, বোম্বে, কানপুর, ভাবনগর, নাসিক এবং পটনাতেও শুরু হয়েছিল ট্রাম পরিষেবা । এমনকি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় করাচি এবং কলম্বোতেও ছিল ট্রাম । তবে সেগুলি সবই পরে বন্ধ হয়ে যায় ।

Last Updated : February 24, 2025 at 11:04 PM IST