বিমল-শুভেন্দু সাক্ষাৎ, পাহাড়ে নয়া রাজনৈতিক সমীকরণ !
দীর্ঘদিন ধরেই বিমলের সঙ্গে যোগাযোগ বিজেপির ৷ জোটও হয়েছে ৷ সাম্প্রতিককালে তৃণমূলের সঙ্গেও জোট বেঁধেছিল মোর্চা ৷ এবার ফের শুভেন্দুর মুখোমুখি বিমলরা ৷

Published : August 1, 2025 at 12:31 PM IST
কলকাতা ও শিলিগুড়ি, 1 অগস্ট: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আবারও কি গেরুয়া শিবিরের হাত ধরতে চলেছেন গোর্খা জন মুক্তি মোর্চার সুপ্রিমো বিমল গুরুং? এমনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে। বৃহস্পতিবার কলকাতায় বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে একান্তে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক সেরেছেন বিমল গুরুং ও মোর্চার সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি। আর তাঁদের এই সাক্ষাতের পরই সরগরম শৈলরানীর রাজনীতি। বৈঠক শেষে রোশন জানিয়েছেন, পাহাড়ের রাজনীতির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে ৷ তবে এর বেশি অন্য কোনও তথ্য দিতে তিনি রাজি হননি ৷
বিমল গুরুংয়ের সঙ্গে বিজেপির যোগাযোগ দীর্ঘদিনের ৷ পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবির সঙ্গে বিজেপির পরিচয়ও পুরনো ৷ অতীতে নিজেদের নির্বাচনী ইস্তেহারে গোর্খাল্যান্ডকে আলাদা রাজ্য করার কথা বলেছিল গেরুয়া শিবির ৷ সেই সূত্রে বাংলার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হওয়ার আগেই দার্জিলিং লোকসভা আসন দখল করতে পেরেছিল তারা ৷ 2009 সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হন বিজেপির যশবন্ত সিং ৷ 2011 সালে বাংলায় পালাবদলের পরেও বিমলদের সঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী সমঝোতা হয় ৷ 2014 সালের লোকসভা ভোটে এসএস আলুওয়ালিয়া নির্বাচনে জয়ী হন ৷ 2019 সাল থেকে পরপর দু'বার দার্জিলিং কেন্দ্র থেকে জিতেছেন বিজেপিরই রাজু বিস্তা ৷
সরগরম পাহাড়ের রাজনীতি
- রোশন গিরির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "বিরোধী দলনেতার সঙ্গে পাহাড়ের রাজনীতি নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে । দীর্ঘদিন ধরে আমরা কয়েকটি দাবি করে আসছি ৷ সেসব নিয়ে বিস্তারিত চর্চা হয়েছে। এর বাইরে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।"
- দার্জিলিং হিল বিজেপির সভাপতি কল্যাণ দেওয়ান বলেন, "মোর্চা নেতা বিমল গুরুং বিজেপির সঙ্গেই ছিলেন আর বিজেপির সঙ্গেই আছেন। আগামী নির্বাচনেও তিনি বিজেপির সঙ্গেই থাকবেন।"
- গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার মুখপাত্র শক্তিপ্রসাদ শর্মা বলেন, "বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্গে দরদাম করতে গিয়েছিলেন বিমলরা। যেখানে লাভের সম্ভাবনা আছে সেখানেই যান বিমল গুরুংরা। সামনে বিধানসভা নির্বাচন সেজন্য লাভ পেতেই এসব করছেন। এসব নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।"
- তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক অলোক চক্রবর্তী বলেন, "বিমল গুরুং কী করবেন সেটা তাঁর ব্যাপার। আমাদের অনিত থাপার সঙ্গে জোট রয়েছে।"
অজ্ঞাতবাস কাটিয়ে এভাবেও ফিরে আসা যায়!
2017 সালে পৃথক রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে সামনে রেখে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন বিমলরা ৷ আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নেয় ৷ অশান্তির পর আচমকাই পাহাড় ছাড়েন বিমল। দীর্ঘদিন পর 2020 সালের 31 অক্টোবর 'অজ্ঞাতবাস' কাটিয়ে কলকাতায় আত্মপ্রকাশ করেন ৷ সল্টলেকের গোর্খা ভবনে ঢুকতে বাধা পেয়ে এক পাঁচতারা হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে তৃণমূলের সঙ্গে জোটের বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করে একুশের বিধানসভা ভোটে তাঁর হয়ে লড়াইয়ের কথা বলেছিলেন। এমনকী দার্জিলিং পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে জোট করে বোর্ড তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্য়েই 2024 সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে আলিপুরদুয়ারে শুভেন্দু অধিকারীর সভায় দেখা গিয়েছিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা বিমল গুরুংকে। তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। সেই সময় বিমল বলেছিলেন, "রাজনীতিতে সবই সম্ভব।"
ক্ষমতার বলয় আর পাহাড়ের রাজনীতি
গত কয়েক দশক ধরে বারবার দেখা গিয়েছে পাহাড়ের রাজনীতি ক্ষমতার বলয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় ৷ আটের দশকে সুভাষ ঘিসিংয়ের হাত ধরে পৃথক রাজ্যের দাবিতে উত্তাল হয় পাহাড় ৷ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির উদ্যোগে পাহাড়-সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল ৷ দীর্ঘদিন কোনও অশান্তি দেখেনি পাহাড় ৷ অনেকদিন বাদে বাম আমলের শেষের দিকে আবারও ওঠে আলাদা রাজ্যের দাবি ৷ একদা সুভাষ ঘিসিংয়ের ঘনিষ্ঠ বিমল গুরুং হয়ে ওঠেন পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা ৷ রোশন গিরি থেকে শুরু করে অনিত থাপারাও ছিলেন তাঁর সঙ্গে ৷
সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর জিটিএ তৈরি হয় ৷ ততদিনে অবশ্য রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তৈরি হয়েছে ৷ আলাদা রাজ্য গঠনের দাবিকে ছাপিয়ে তখন পাহাড়কে 'হাসানোর' কথা শোনা যেত ৷ একাধিক প্রশাসনিক এবং সরকারি অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলতেন, 'পাহাড় হাসছে' ৷ সেই স্বস্তি অবশ্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ৷ 2017 সাল নাগাদ আরও একবার রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার খেলা শুরু হয় পাহাড়ে ৷ একদা বিমলের সঙ্গে থাকা অনীত থাপা থেকে শুরু করে আরও অনেকে মোর্চার সঙ্গ ছাড়তে থাকেন ৷ অনিতের সঙ্গে তৃণমূলের সখ্য বাড়তে থাকে ৷ সেই সূত্র ধরে এখন তিনিই জিটিএ-র প্রধান ৷
তৃণমূল-বিজেপির চাওয়া-পাওয়া
অনিতকে সামনে রেখে পাহাড়ের রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চাইছে তৃণমূল ৷ এমনিতে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে হারানো জমির বেশ খানিকটা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে মমতা-ব্রিগেড ৷ 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে সামান্য প্রভাবটুকুও ফেলতে পারেনি তৃণমূল ৷ কিন্তু 2021 সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে পায়ের তলায় জমি ফিরে পেতে শুরু করে বাংলার শাসক শিবির ৷ সেই সূত্র ধরে কয়েক মাস আগে হওয়া বিধানসভার উপনির্বাচনে ভালো ফলও করে ৷
তৃণমূলের এই ফলাফল বিজেপিকে অবশ্যই চাপে রাখবে ৷ সেদিক থেকে বিমল-শুভেন্দুর বৈঠকের তাৎপর্য খুবই গভীর ৷ রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে অতীতে একাধিক ভোটে বিমলদের সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হতে পেরেছে বিজেপি ৷ সেই সূত্র ধরে এবারও শুভেন্দুরা আশা করছেন, বিমলদের সঙ্গে নিয়েই সাফল্যের সরণিতে পৌঁছে যাওয়া যাবে ৷ অন্যদিকে, পাহাড়ের রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এমন অনেকে এটাও মনে করছেন, অতীতে বিমল গুরুংয়ের যে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ছিল এখন আর তা নেই ৷ বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে আবার হৃত গৌরব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন একদা পাহাড়-রাজনীতির মুকুটহীন সম্রাট ৷

