কিশোর সন্ধ্যায় পুলিশ গায়কের গানে মাতল আসানসোল
গানের কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ নেননি প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী ৷ ছোটবেলায় মায়ের গান শুনেই তাঁর গান গাওয়ার ইচ্ছে হয় ।

Published : August 5, 2025 at 8:03 PM IST
আসানসোল, 5 অগস্ট: তাঁর পেশার দায়িত্ব কঠিন । আবার নেশায় তিনি আবেগপ্রবণ । পেশায় পুলিশ ইন্সপেক্টর হলেও কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রশিক্ষক পদে কর্মরত প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর নেশা গান । মূলত, কিশোর কুমারের গান ।
সোমবার সন্ধ্যায় আসানসোল রবীন্দ্রভবনে সেই কিশোর কুমারের গান গেয়ে গোটা আসানসোলের মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি । গোটা শহরজুড়ে, এমনকি সোশাল মিডিয়ায় এখন শুধু তাঁরই চর্চা । অনুষ্ঠানের ফাঁকে তিনি মুখোমুখি হলেন ইটিভি ভারতের ।
সোমবার ছিল কিশোর কুমারের জন্মদিন । আর কিশোর কুমারের জন্মদিন উপলক্ষে আসানসোল রবীন্দ্রভবনে আয়োজিত হয়েছিল 'কিশোর সন্ধ্যা' । পেশাদার অনেক শিল্পী এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু পেশাদার শিল্পীদের পিছনে ফেলে কার্যত এই অনুষ্ঠানের 'ম্যান অব দ্যা ম্যাচ' হয়ে যান কলকাতা পুলিশের ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী ।
শুধুমাত্র শখের গান-বাজনাতেই তাঁকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে এই সন্ধ্যায় । একের পর এক অনুরোধ ৷ আর কিশোর কুমারের আবেগঘন সব গান গেয়ে দর্শকদের মাতালেন এই 'পুলিশ গায়ক' ।

প্রসেনজিতের সংক্ষিপ্ত জীবনী
কলকাতাতেই জন্ম প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর । কলকাতাতেই বড় হয়ে ওঠা তাঁর । পড়াশুনোতে ছোট থেকেই ছিলেন তুখোড় । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ । সহজেই শিক্ষকতার পেশায় যেতে পারতেন । কিন্তু দেশসেবা করার উদ্দেশ্যে পুলিশের চাকরিতে যোগদান করেন । 1996 সালে কলকাতা পুলিশে যোগদান করেন প্রসেনজিৎ । যোগদান করেই চমক দিয়েছিলেন তিনি । পুলিশের যে বেসিক ট্রেনিং হয়, তাতে প্রথম হয়েছিলেন ।

শুরু থেকেই কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত প্রসেনজিৎ । বর্তমানে তিনি ইন্সপেক্টর পদে ট্রাফিক প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত । বেলগাছিয়ায় যে ট্রাফিক পুলিশদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, সেখানেই পোস্টিং প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর । তিনি বলেন, "আমার ট্রেনিং দিতে খুব ভালো লাগে ৷ সেই কারণেই এই কাজের দায়িত্ব পেয়ে আমি খুব খুশি ।"
থিয়েটারের অভিনেতা প্রসেনজিৎ
চিরকালই পেশার বাইরে শিল্পকে নেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী । তাই চাকরির পাশাপাশি তিনি গ্রুপ থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন । তাঁর নেশা হয়ে ওঠে মঞ্চ । প্রচুর নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি । প্রশংসাও পেয়েছেন । অভিনেতা হিসেবে সুদর্শন প্রসেনজিৎ মঞ্চে দাঁড়ালে দর্শকদের আকর্ষণ থাকত তাঁর দিকেই ।

কিন্তু কোভিডের সময়কাল থেকেই থিয়েটার বন্ধ হয়ে যায় । পরবর্তীকালে চাকরির ঝক্কি সামলে থিয়েটারে সময় বের করা কিংবা মঞ্চে ফেরা আর সেই ভাবে হয়ে ওঠেনি । কিন্তু মঞ্চ তাঁকে টানতো । আর তাই গানের প্রতি সুপ্ত ভালবাসা থেকেই পুনরায় মঞ্চে ফেরা কিশোর কুমারের গান নিয়ে ।
মায়ের থেকে গান শুনে শেখা
ছোটবেলায় মায়ের গুনগুন করে গাওয়া গান শুনতেন । মা খুব সুন্দর গান গাইতেন । আর সেই গান শুনেই তাঁর গান গাওয়ার ইচ্ছে হয় । গানের কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ নেই আজও । কোনোদিন সারেগামা শেখেননি । কিন্তু মায়ের কাছে শুনে শুনেই গানের সুরের প্রতি এক অদ্ভুত দখল চলে আসে প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর । পরবর্তীকালে তিনি কিশোর কুমারের গান গাইতে শুরু করেন । প্রথম প্রথম তা বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে থাকলেও পরবর্তীকালে ছোট ছোট মঞ্চে গান গাইতে থাকেন ।
পেশাদার শিল্পীদের টেক্কা প্রসেনজিতের
তবে সারা বাংলার একটি গানের প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় । তারপর থেকেই বড় শো'তে অংশ নিতে শুরু করেন তিনি । বেশিরভাগ জায়গাতেই পেশাদার শিল্পীদের পিছিয়ে ফেলে প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর জয়জয়কার হয় । যেমনটি হল সোমবার ।

আসানসোল রবীন্দ্রভবনে কলকাতার প্রচুর পেশাদার শিল্পী এদিন উপস্থিত ছিলেন কিশোর কুমারের জন্মদিন উপলক্ষে সঙ্গীতানুষ্ঠানে । কিন্তু প্রসেনজিতের গান সাধারণ মানুষকে টেনে নেয় । তাঁর দরাজ এবং খোলা গলা কিশোর কুমারের গানকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় । বারবার তাঁর গানের শেষে হাততালিতে মুখর হয় গোটা রবীন্দ্রভবন ।

আয়োজক সংস্থার পক্ষ থেকে আসানসোল আর্টিস্ট ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সম্পাদক সন্দীপকুমার ঘোষ বলেন, "সব শিল্পীরাই এদিন অসাধারণ গেয়েছেন । কিন্তু এদিনের 'ম্যান অব দ্যা ম্যাচ' প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী । তাঁর গান শুনে আসানসোলের মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়ে গিয়েছে ।"

অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, "প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার বেশ কিছুদিনের আলাপ । আমি একটি টিভি শোয়ের ব্যবস্থাপনায় ছিলাম । সেখানেও তাঁকে গাইয়েছি । এছাড়াও আমার অনেক অনুষ্ঠানে প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী এসেছেন । ওঁর গায়ক'ই তো বটেই । ওঁর মতো ভালো মানুষ খুব কম পাওয়া যায় আজকালকার সময়ে ।"
পুলিশের দায়িত্ব সামলে করেন গান
একদিকে পুলিশের দায়িত্ব, অন্য দিকে গান ৷ কি করে সামলান? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী বলেন, "কথাতে আছে যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে । আপনি যদি আপনার ভালো লাগা ও ভালোবাসাতে স্থির থাকতে পারেন, তাহলে সব কাজ দায়িত্ব সামলে ঠিক সময় বের করে নেওয়া যায় । আর মানুষজনের ভালোবাসা আমাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে । আমাকে আরও গাইতে উৎসাহিত করছে । তাই চাকরির দায়িত্ব সামলে গানই আমার একমাত্র ভালোবাসা ।"

তিনি আরও বলেন, "বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাগতা লক্ষ্মী দাশগুপ্ত আমাকে প্রচণ্ড উৎসাহ দেন । তিনি আমার সঙ্গে অনুষ্ঠানও করেছেন । আগামিদিনে এই ভাবেই আমি এগিয়ে চলতে চাইব ৷ দায়িত্বে অবিচল থেকেও আমি আমার গানকে ছড়িয়ে দিতে চাই আরও বহু মানুষের মাঝে ।"

