ETV Bharat / state

বাংলায় SIR তোড়জোড়ের মাঝেই রাজ্যজুড়ে বিপুল জন্ম শংসাপত্রে অনুমোদন পঞ্চায়েতের, কেন ?

রাজ্যে এসআইআর কার্যকর হওয়া নিয়ে তোড়জোড়ের মাঝেই বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের অনুমোদন করা জন্মের শংসাপত্রের সংখ্যা এক লাফে অনেকটা বেড়ে গিয়েছে ৷

ETV BHARAT
রাজ্যে বিপুল জন্ম শংসাপত্রে অনুমোদন পঞ্চায়েতের ! (নিজস্ব চিত্র)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : August 12, 2025 at 6:54 PM IST

8 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 12 অগস্ট: এসআইআর নিয়ে উত্তপ্ত বিহার ৷ আন্দোলন শুরু হয়েছে অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ৷ বারবার উত্তাল হয়েছে সংসদ ৷ বিহারের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও এসআইআর শুরু হতে চলেছে ৷ চলতি মাসেই বাংলায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন চালু হওয়ার কথা ৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার নাগরিকদের আশ্বস্ত করছেন, এই রাজ্যের কোনও বাসিন্দা যদি অভারতীয় হিসাবে চিহ্নিত হন, তবে তাঁদের সর্বাত্মক আন্দোলনের সাক্ষী থাকবে দেশ ৷ কিন্তু সেই মমতার বাংলাতেই সরকারি আমলাদের ভ্রু কুঁচকে উঠছে স্বাস্থ্য দফতরের একটি তথ্যে ৷

অদ্ভুতভাবে বেড়ে গিয়েছে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের অনুমোদন করা জন্মের শংসাপত্রের সংখ্যা ৷ বিশেষত বাংলাদেশ লাগোয়া জেলাগুলিতে এই ঘটনা বেশি ঘটেছে ৷ এক্ষেত্রে মালদা জেলা সবার উপরে রয়েছে ৷ তারপরেই রয়েছে মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলা ৷ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই ঘটনার সঙ্গে কি কোনওভাবে এসআইআর যোগ রয়েছে ? কারণ, এসআইআর-এর ক্ষেত্রে যেসব নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার উপরের দিকেই রয়েছেন জন্মের শংসাপত্র ৷ বিষয়টি নজরে আসতেই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মালদার জেলাশাসক ৷

ETV BHARAT
বিহারের পর SIR বাংলায় (নিজস্ব চিত্র)

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরই প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল ৷ তার সুফলও মিলেছে ৷ সরকারি তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে গোটা রাজ্যে বাড়িতে প্রসবের সংখ্যা হাতে গোনা ৷ এতে কমেছে প্রসূতি এবং সদ্যোজাত মৃত্যুর হার ৷ কিন্তু অদ্ভুতভাবে বেড়ে গিয়েছে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের অনুমোদন করা জন্মের শংসাপত্রের সংখ্যা ৷ বিশেষত বাংলাদেশ লাগোয়া জেলাগুলিতে এই ঘটনা বেশি ঘটেছে ৷ এক্ষেত্রে মালদা জেলা সবার উপরে রয়েছে ৷ তারপরেই রয়েছে মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলা ৷

বঙ্গ বিজেপির নেতারা বারবার অভিযোগ করে এসেছেন, এই রাজ্যের সরকার অনুপ্রবেশকে মদত দিচ্ছে ৷ এই অনুপ্রবেশকারীরাই তৃণমূলের ভোট ব্যাংক ৷ দিল্লি থেকে বাংলায় এসে একই অভিযোগ করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ৷ যদিও বারবার সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা ৷ তৃণমূল নেতৃত্বও এই ইস্যুতে চোখ রাঙিয়েছে কেন্দ্রকে ৷ এরই মধ্যে সামনে এসেছে বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েতের অনুমোদন করা জন্মের শংসাপত্রের সংখ্যা ৷

জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য বলছে,

2023 সালে জেলা পঞ্চায়েত দফতর থেকে মোট 44,229টি জন্মের শংসাপত্র অনুমোদন ৷

2024 সালে সেই সংখ্যা এক ধাক্কায় বেড়ে হয় 55,921টি ৷

2025 সালের 15 জুলাই পর্যন্ত সংখ্যাটা 23,026টি ৷

2023 সাল থেকে 2024 সালে পঞ্চায়েতের অনুমোদিত জন্মের শংসাপত্র বেড়েছে 11,692টি ৷

প্রশাসনিক কর্তাদের নজরে সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতের পরিসংখ্যান ৷ এর মধ্যে রয়েছে ইংরেজবাজারের যদুপুর 1 নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত ৷ মালদা শহর সংলগ্ন এই পঞ্চায়েতে 2022 সালে মোট শংসাপত্র অনুমোদিত হয়েছিল 25 হাজার 602টি ৷ 2024 সাল পর্যন্ত এখানে প্রতি মাসে গড়ে 711টি জন্মের শংসাপত্র অনুমোদিত হয়েছে ৷ কিন্তু 2025 সালের মার্চ মাসেই এই পঞ্চায়েতে অনুমোদিত হয়েছে 803টি শংসাপত্র ৷ বৃদ্ধির হার 13 শতাংশ ৷

ETV BHARAT
এসআইআর নিয়ে উত্তপ্ত দেশ (নিজস্ব চিত্র)

আরও বড় ছবি মানিকচকের উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে ৷ এখানে 2022 সালে 536টি ও 2023 সালে অনুমোদন করা হয়েছিল 538টি শংসাপত্র ৷ অথচ 2024 সালে এখানে অনুমোদিত হয়েছে 4547টি ৷ চলতি বছরের 15 জুলাই পর্যন্ত অনুমোদিত হয়েছে 3240টি শংসাপত্র ৷ এই পঞ্চায়েতে গত তিন বছরে শংসাপত্র প্রদানের গড় মাসে 185টি ৷ চলতি বছরের মার্চ মাসে 727টি শংসাপত্র অনুমোদিত হয়েছে ৷ অর্থাৎ এই পঞ্চায়েতে জন্মের শংসাপত্র বৃদ্ধির হার 273 শতাংশ ৷

এভাবেই মিলকি পঞ্চায়েতে শংসাপত্র বৃদ্ধির হার 61 শতাংশ, কালিয়াচক 1 নম্বরে 91 শতাংশ, গাজোল 1 নম্বর পঞ্চায়েতে 104 শতাংশ, মশালদহ গ্রাম পঞ্চায়েতে 105 শতাংশ, রতুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে 117 শতাংশ, রশিদাবাদে 168 শতাংশ ৷ শতাংশের হারে সবচেয়ে বেশি শংসাপত্র অনুমোদিত হয়েছে কালিয়াচক 3 নম্বর ব্লকের বাখরাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতে ৷ এখানে বৃদ্ধির হার 383 শতাংশ ৷

শুধুই কি মালদা ? একইভাবে পঞ্চায়েতের অনুমোদিত জন্মের শংসাপত্র হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, উত্তর দিনাজপুর-সহ একাধিক জেলায় ৷ দক্ষিণ 24 পরগনার মগরাহাট পূর্ব গ্রাম পঞ্চায়েতে 2022 সালের তুলনায় 2025 সালের মার্চ মাসে জন্মের শংসাপত্র বৃদ্ধির হার 207 শতাংশ ৷ ঝাড়গ্রামের খাড়িকামাথানি পঞ্চায়েতে বৃদ্ধির হার 324 শতাংশ ৷ আর হাওড়ার বাণীবন পঞ্চায়েতে এই বৃদ্ধির হার তো মাথা খারাপ করার মতো, 407 শতাংশ ৷ এসব নজরে আসার পর পঞ্চায়েতের অনুমোদন করা জন্মের শংসাপত্রের উপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন ৷ নবান্নের তরফে প্রতিটি জেলার জেলাশাসকদের বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে বলা হয়েছে বলেও জানাচ্ছে জেলা প্রশাসনিক মহলের একাংশ ৷

ETV BHARAT
সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টহলদারি (নিজস্ব চিত্র)

জেলা স্বাস্থ্য দফতরের দাবি, এসআইআর নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করছে ৷ মানুষ ডিজিটাইজেশনের দিকে দৌড়োচ্ছে ৷ পুরনো শংসাপত্রের জায়গায় নতুন ডিজিটাল শংসাপত্র অনুমোদন করা হচ্ছে ৷ শংসাপত্রের রেজিস্ট্রেশন নম্বর একই থাকছে ৷ কিন্তু সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতে শংসাপত্রের রেজিস্ট্রেশন সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে ৷ এর জন্যও পরিসংখ্যানে এই অসঙ্গতি থাকতে পারে ৷ আরও একটি বিষয় এক্ষেত্রে কাজ করতে পারে ৷ গ্রামীণ কোনও নার্সিংহোমে সদ্যোজাতের জন্ম হলে তার শংসাপত্র সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত থেকেই দেওয়া হয় ৷ সম্প্রতি গ্রামীণ এলাকায় নার্সিংহোমের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে ৷ এসবেরও প্রভাব পরিসংখ্যানে পড়তে পারে ৷ যদিও প্রশাসনিক তদন্তে স্বাস্থ্য দফতরের এসব দাবি কতটা ধোপে টিকবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন প্রশাসনের অনেকেই ৷

তৃণমূল পরিচালিত ইংরেজবাজার ব্লকের যদুপুর 1 নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান নমিতা চৌধুরীর বক্তব্য, “আসলে এসআইআর নিয়ে মানুষের মনে একটা ভয় কাজ করছে ৷ তাই আগে যাঁরা জন্মের শংসাপত্র রেজিস্ট্রেশন করাননি, এখন পঞ্চায়েত দফতরে তাঁদের ভিড় বাড়ছে ৷ এই কারণেই শংসাপত্র রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা এভাবে বেড়ে গিয়েছে ৷ এর পিছনে অন্য কোনও কারণ নেই ৷”

যদিও নমিতা চৌধুরীর বক্তব্যে কতটা ভরসা করা যায়, তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ৷ তাঁরা বলছেন, এই জেলায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা যে নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছেন তার প্রমাণ রয়েছে ৷ কিছুদিন আগে তৃণমূল পরিচালিত হরিশ্চন্দ্রপুরের রশিদাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান লাভলি খাতুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, বাংলাদেশ থেকে তিনি ভারতে অনুপ্রবেশ করেছেন ৷ এনিয়ে মামলাও হয় ৷ শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক তদন্তে প্রমাণিত হয়ে যায়, লাভলি খাতুন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ৷ আদালতের নির্দেশে তাঁর প্রধান পদ বাতিল হয়েছে ৷ কিন্তু তিনি এখনও রশিদাবাদ গ্রামে রয়েছেন ৷ এসআইআর লাগু হলে তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ রয়েছে ৷

বিতর্কিত এই বিষয়ে সেভাবে মুখ খোলেননি জেলাশাসক নিতীন সিংহানিয়া ৷ শুধু জানিয়েছেন, “বিষয়টি নজরে আসার পরেই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ বিডিওরা সেই তদন্ত করছেন ৷ তার রিপোর্ট এখনও জমা পড়েনি ৷ তবে এই তদন্তে কারও বিরুদ্ধে কোথাও কোনও গাফিলতি পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে ৷”

বিষয়টি নিয়ে ময়দানে নামতে দেরি করতে রাজি নয় গেরুয়া শিবির ৷ বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, “আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি, পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্য ৷ তার প্রমাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে ৷ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যেসব এলাকায় একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের আধিপত্য বেশি, সেখানেই এমন ঘটনা বেশি ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে ৷ অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকে মুর্শিদাবাদ, মালদা, নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনা, বীরভূম ও উত্তর দিনাজপুর জেলাতেই মূলত বসবাস শুরু করে ৷ অনেকে অন্য জেলাতেও ছড়িয়ে যায় ৷ রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের লোকজন এদের বিশেষ আপ্যায়ন করে চলে ৷ কারণ, এরাই তাদের মূল ভোট ব্যাংক ৷ তাই এসআইআর-এর নাম উঠতেই রাজ্যের মন্ত্রী থেকে শুরু করে তৃণমূলের কর্মী, সবাই বিরোধিতায় গলা ফোলাচ্ছে৷ তবে বাংলায় এসআইআর লাগু হবেই ৷ এতে কোনও ভুল নেই ৷”

রাজ্যে কংগ্রেসের একমাত্র সাংসদ ইশা খান চৌধুরী জানাচ্ছেন, “এসআইআর-এর নামে সাধারণ মানুষকে যেভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে তা কাম্য নয় ৷ সমস্ত নথিপত্র থাকা ভারতীয়দের গায়েও এখন অনুপ্রবেশকারীর তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ৷ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক ৷ কিন্তু একজন ভারতীয়র সঙ্গেও যেন অত্যাচার না করা হয় ৷ অসম, বিহারে আমরা সেই অত্যাচারের নমুনা দেখেছি ৷ আর কোথাও তা দেখতে রাজি নই ৷ আর গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিতে কীভাবে হঠাৎ করে জন্মের শংসাপত্র রেজিস্ট্রেশনের হার বেড়ে গেল, প্রশাসনকেই তদন্ত করে তার জবাব দিতে হবে ৷”

তৃণমূলের জেলা সভাপতি আবদুর রহিম বকসির দাবি, “বিষয়টি আমার জানা নেই ৷ আমার কাছে এর কোনও তথ্যও নেই ৷ তবে আমি মনে করি, বাংলা তথা মালদার প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে স্বচ্ছতার সঙ্গে জন্মের শংসাপত্র দেওয়া হয় ৷ এই ঘটনার সঙ্গে অনুপ্রবেশের কোনও যোগ নেই বলেই আমার অনুমান ৷ বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে বলে জানলাম ৷ আশা করছি, ওই তদন্তের রিপোর্ট দ্রুত সামনে আসবে ৷”