সরকারি হাসপাতালের রোগী 'হাইজ্যাক', অ্যাম্বুল্যান্স ও নার্সিংহোমের যোগসাজশে বিপন্ন গরিব মানুষ !
জোর করে রোগীদের নার্সিংহোমে ভর্তি ! অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নেমে হাতেনাতে চক্রের পর্দা ফাঁস জেলা স্বাস্থ্য দফতরের ৷ রোগীকে উদ্ধার স্বাস্থ্য আধিকারিকের ৷

Published : March 23, 2025 at 4:58 PM IST
মালদা, 23 মার্চ: গরিব মানুষকে ভুল বুঝিয়ে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ একদল অসাধু অ্যাম্বুল্যান্স চালকের বিরুদ্ধে ৷ এই চক্রে একাধিক নার্সিংহোমের জড়িত থাকারও অভিযোগ উঠেছে ৷ বিভিন্ন গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে মালদা মেডিক্যালে রেফার করা রোগীদের 'হাইজ্যাক' করা হচ্ছে অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের মাধ্যমে ৷ এমনই অভিযোগের ভিত্তিতে নজরদারি চালিয়ে, হাতেনাতে একটি চক্রকে ধরল মালদা জেলা স্বাস্থ্য দফতর ৷
এ নিয়ে মালদার অতিরিক্ত জেলাশাসক শেখ আনসার আহমেদ জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হচ্ছে ৷ উল্লেখ্য, গত 17 মার্চ গাজোল ব্লকের আলাল গ্রাম পঞ্চায়েতের পাহাড়িভিটা গ্রামের বাসিন্দা কুমার কোরাকে (64) শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে গাজোল গ্রামীণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ৷ কুমার কোরার শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাতেই মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করে দেন সেখানকার চিকিৎসক ৷
অভিযোগ, যে অ্যাম্বুল্যান্সে করে রোগীকে মালদা মেডিক্যালে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তার চালক পরিজনদের ভুল বুঝিয়ে মালদা শহর সংলগ্ন গাবগাছি এলাকার একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যান ৷ কুমার কোরার দুই ছেলে অভিযোগ করেছেন, কার্যত জোর করে তাঁদের বাবাকে ওই নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয় ৷ এরপর বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয় তাঁকে ৷
এমনকি ভর্তির পর থেকে 42 হাজার টাকা নেওয়া হয় ৷ কিন্তু, রোগীকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইলে আরও 82 হাজার টাকার বকেয়া বিল হাতে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ৷ সেই বিল না-মেটালে রোগীকে না-ছাড়ার হুমকি দেয় নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ ৷ সেই খবর জেলা স্বাস্থ্য দফতরে পৌঁছতেই ময়দানে নামেন আধিকারিকরা ৷ নার্সিংহোম থেকে রোগীকে উদ্ধার করে মালদা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় ৷
এ নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলাশাসক শেখ আনসার আহমেদ বলেন, "স্বাস্থ্যসাথীর ডিস্ট্রিক্ট সার্ভিল্যান্স টিম দিয়ে আমরা কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন নার্সিংহোম এবং ডায়গনস্টিক সেন্টারে ভিজিট করাচ্ছি ৷ গাজোলেও এমন একটি ভিজিট হয়েছিল ৷ তখনই আমরা এই বিষয়টি জানতে পারি ৷"
এই অভিযান নিয়ে অতিরিক্ত জেলাশাসক বলেন, "আমাদের টিম ওই নার্সিংহোমে ভিজিট করে ৷ দেখা যায়, ওই রোগীর জন্য প্রায় এক লাখ টাকার বিল তৈরি করা হয়েছে ৷ অথচ রোগীর যথাযথ চিকিৎসা করা হয়নি ৷ জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা জানতে পারি, ওই রোগীকে সেখানে অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে ৷ বিল না-মেটালে তাঁকে ছাড়া হবে না ৷ সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের সার্ভিল্যান্স টিম তাঁকে উদ্ধার করে মালদা মেডিক্যালে ভর্তি করে ৷ এখন তিনি খানিকটা ভালো আছেন ৷ ওই নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে আমরা কড়া পদক্ষেপ করছি ৷ আগামী সপ্তাহে তার শুনানি হবে ৷"
আর অভিযুক্ত অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের নিয়ে তাঁর বক্তব্য, "আর অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের আমরা নানা সময় সতর্ক করেছি ৷ কিন্তু, তারপরেও কিছু চালক টাকার লোভে অসাধু উপায় অবলম্বন করছেন ৷ এই চালকদের বিরুদ্ধেও আমরা কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছি ৷"
কুমার কোরার ছেলে অমল কোরা অভিযোগ করেছেন, "বাবাকে আমরা গাজোল হাসপাতালে নিয়ে যাই ৷ কিছুক্ষণ পর ডাক্তারবাবুরা জানান, সেখানে সমস্ত মেশিনপত্র নেই ৷ আমরা যেন বাবাকে মালদা মেডিক্যালে নিয়ে যাই ৷ একটি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করি ৷ কিন্তু ভাড়া নিয়েও অ্যাম্বুল্যান্স চালক আমাদের সঙ্গে চক্রান্ত করে ৷ প্রথমে দু’হাজার টাকা ভাড়া ঠিক হলেও, মালদা এসে সে আরও 500 টাকা বেশি দাবি করে ৷ শুধু তাই নয়, বাবাকে মেডিক্যালে না-এনে, একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যায় ৷ ওখানে আমরা 42 হাজার টাকা দিয়ে দিলেও, বাবার কোনও চিকিৎসা হয়নি ৷ ওরা আরও 82 হাজার টাকা দাবি করে ৷ যদি এই খবর পেয়ে জেলাশাসক নার্সিংহোমে না-যেতেন, তবে আমরা হয়তো মরে যেতাম ৷ ওখানে বাবার তেমন কোনও চিকিৎসাও হয়নি ৷ ওখানে যার কাছে যা পাচ্ছে, টাকা আদায় করে ছাড়ছে ৷"
তবে, অভিযুক্ত নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের সঙ্গে চক্রান্তের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ৷ আর বিলের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি হাসপাতালের ম্যানেজারের উপর দায় ঠেলেছেন পরিচালন কমিটির সদস্য নাজমুল আলম ৷
এমনকি অতিরিক্ত জেলাশাসকের তোলা অভিযোগ খারিজ করে তিনি দাবি করেন, "ওই রোগীর সবরকম চিকিৎসা হয়েছে ৷ রোগী সুস্থও ছিল ৷ রোগীর পরিবারের লোকজন বিলের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে ম্যানেজার তাঁদের একটি খসড়া বিল ধরান ৷ ওই রোগীর পরিবার স্বাস্থ্য দফতরে যোগাযোগ করে ৷ গতকাল আমরা স্বাস্থ্য দফতরে গিয়ে কথাও বলেছি ৷ এই ভুলের জন্য আমরা ম্যানেজারকে শো-কজ করেছি ৷ তাঁকে সাসপেন্ডও করা হয়েছে ৷ এমন ভুল ভবিষ্যতে আর হবে না ৷ আমরা তার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ৷ ম্যানেজার আমাদের কিছু না-জানিয়েই এই কাজ করেছিলেন ৷ এই ঘটনায় আমরা নিজেদের ভুল স্বীকার করছি ৷ তবে, অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন ৷"
উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে কুমার কোরার শারীরিক অবস্থা ভালো নেই বলে জানিয়েছেন মালদা মেডিক্যালের সহকারী অধ্যক্ষ তথা হাসপাতাল সুপার প্রসেনজিৎ বল ৷ তিনি বলেন, "গতকাল ওই রোগীকে মেডিক্যালে ভর্তি করানো হয়েছে ৷ এখনও তাঁর অবস্থা খুব ভালো নয় ৷ তাঁর চিকিৎসা চলছে ৷ চিকিৎসকরা 24 ঘণ্টা তাঁর উপর নজরদারি চালাচ্ছেন ৷ প্রয়োজনে তাঁকে ভেন্টিলেশনে দেওয়া হতে পারে ৷"

