দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে আজও অমলিন মাকড়দহের পঞ্চম দোল
স্থানীয়দের থেকে জানা গিয়েছে, বহু বছর আগে এক ধনী বণিক পরিবার মাকড়দহ গ্রামে মা মাকড়চণ্ডীর আরাধনায় ব্রতী হন। দেবীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মাকড়দহের সমাজজীবন।

Published : March 19, 2025 at 8:37 PM IST
|Updated : March 19, 2025 at 8:51 PM IST
হাওড়া, 19 মার্চ: দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে আজও মাকড়দহ গ্রামে ‘পঞ্চম দোল’ পালন হয়ে আসছে ৷ দেবী মাকড়চন্ডীকে সোনার অলংকার পরিয়ে বুধবার আবির খেলল গোটা গ্রাম।
দোল পূর্ণিমা শেষ হয়েছে কয়েক দিন আগে। দেশের অন্যত্র রং খেলা থেমে গেলেও, হাওড়ার ডোমজুর ব্লকের মাকড়দহ গ্রামে তখনও চলেছে প্রস্তুতি। কারণ, এখানে সকলের কাছে দোল উৎসব মানেই ‘পঞ্চম দোল’। সেই প্রায় 200 বছরের পুরনো ঐতিহ্যকে পাথেয় করে এদিন মাকড়দহ মাকড়চন্ডী মন্দিরে পালিত হল এই বিশেষ উৎসব।
স্থানীয়দের থেকে জানা গিয়েছে, বহু বছর আগে এক ধনী বণিক পরিবার মাকড়দহ গ্রামে মা মাকড়চণ্ডীর আরাধনায় ব্রতী হয়। দেবীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মাকড়দহের সমাজজীবন। তখন থেকেই দোল পূর্ণিমার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ পঞ্চমী তিথিতে দেবীকে সোনার অলঙ্কারে সাজিয়ে, বিশেষ পুজো ও আবির নিবেদনের মাধ্যমে উৎসব শুরু হয়। স্থানীয়দের দাবি, চণ্ডীর শক্তিরূপে আবির নিবেদন অশুভ শক্তিকে দূর করে গ্রামে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে ৷ এই বিশ্বাস থেকেই ‘পঞ্চম দোল’-এর প্রথা আজও অটুট।
সকালের প্রথম প্রহর থেকেই মাকড়চন্ডী মন্দির চত্বর ছিল জমজমাট। ভোরে কাঁসর, ঘণ্টা, ঢাকের বোলের সঙ্গে শুরু হয় দেবীর স্নান ও পুজো। স্নানশেষে মাকড়চন্ডীকে সোনার কণ্ঠহার, চূড়া, কড়ি-মালা, কোমরবন্ধ, নূপুর-সহ নানা অলঙ্কার পরানো হয়। দেবীর রথটিকেও সাজানো হয় ফুল, পেতলের প্রদীপ আর রঙিন পতাকায়। পুজো শেষে দেবীর চরণে প্রথম আবির নিবেদন করেন প্রধান পুরোহিত। এরপর সেই আবির ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের হাতে হাতে। মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় আবিরের খেলা। শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সকলে একে অপরকে আবির মাখিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে থাকেন।
এদিন শুধু মাকড়দহ নয়, আশেপাশের গ্রাম যেমন সাঁকরাইল, উলুবেড়িয়া, আমতা, ঘুসুড়ি থেকেও প্রচুর ভক্ত আসেন। এমনকী কলকাতা ও হুগলির বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও বহু মানুষ পঞ্চম দোল দেখতে আসেন মন্দিরে। গ্রামের বাসিন্দা হরিপদ মুখোপাধ্য়ায় বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষেরা বলতেন, মা মাকড়চন্ডী গ্রামকে অপদৃষ্টি থেকে রক্ষা করেন। তাই পূর্ণিমার হুল্লোড়ের পর মায়ের পুজো করা হয়। মা-কে সোনার গয়নায় সাজিয়ে আমরা যেন মায়ের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।” যদিও আধুনিক সময়ে বহু কিছুর পরিবর্তন ঘটেছে ৷ শহুরে জীবনের ছোঁয়া এসেছে গ্রামেও ৷ তবু মাকড়দহের পঞ্চম দোল এখনও ঠিক আগের মতই থেকে গিয়েছে।
মাকড়দহ গ্রামের এই মাকরচন্ডী মন্দির নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক লোককথা প্রচলিত আছে। কথিত আছে, প্রায় দু'শতাব্দী আগে স্থানীয় এক জমিদার পরিবার ( বিষ্ণুপ্রিয় চৌধুরী বংশ) তাদের পারিবারিক দেবী হিসেবে মা মাকড়চন্ডীর প্রতিষ্ঠা করে। জমিদার বাড়ির এক সদস্য গভীর ধ্যানে মাতৃদর্শন লাভ করেন ৷ তাঁরই স্বপ্নাদেশে এই মন্দির নির্মিত হয়। পরবর্তীকালে তাঁদের দানেই দেবীর জন্য সোনার অলঙ্কার, রত্নখচিত সিংহাসন ও বিশেষ পুজোর আয়োজন শুরু হয়। জমিদার পরিবার বিলুপ্ত হলেও গ্রামবাসীরা আজও সেই রীতি বহন করে চলেছেন।
মাকড় চন্ডী মন্দিরের স্থাপত্যেও প্রাচীন বাংলার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। একতলা মন্দির হলেও দালানটি সম্পূর্ণ ইটের, খিলানযুক্ত দরজা-জানালা, ছাদের উপর একটি আটচালা শিখর। মন্দিরের দেওয়ালে টেরাকোটার কাজের ছাপ এখনও কিছুটা দেখা যায়, যদিও অনেকটাই সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা ও পঞ্চমী উপলক্ষে মন্দিরে বিশেষ মন্ডপ নির্মাণ হয় ৷ আলোকসজ্জায় সাজানো হয় গোটা মন্দির প্রাঙ্গণ। মন্দির পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে জানা গিয়েছে, বর্তমানে মাকড়চন্ডী মন্দিরের সংরক্ষণের জন্য একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্দিরের পুরনো গঠন ঠিক রেখে সংস্কারের কাজ চলছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্য এবং দেবী মাহাত্ম্যের স্বাদ পেতে পারে।

