ETV Bharat / state

'হেরিটেজ' বিশ্বভারতীতে 900-র বেশি আসন ফাঁকা, নেপথ্যের কারণ কী

2024 সালে দেশের 100টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জায়গা পায়নি বিশ্বভারতী । চলতি বছরে এনআইআরএফ র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশের 200টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও নেই বিশ্বভারতী ।

Visva Bharati
বিশ্বভারতীর বিভিন্ন বিভাগে ভর্তির আসন ফাঁকা (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : October 10, 2025 at 5:55 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

বোলপুর, 10 অক্টোবর: 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' বিশ্বভারতী, অথচ ভর্তি হতে চাইছেন না পড়ুয়ারা । বিভিন্ন ভবন ও বিভাগে 900-র বেশি আসন ফাঁকা ৷ কমেছে বিদেশি পড়ুয়াদের সংখ্যাও ৷ পড়ুয়াদের ভর্তি করতে নতুন করে বিভিন্ন বিভাগ ও ভবনের অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধানদের উদ্যোগ নিতে বলেছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । এই ভর্তি না হওয়ার পিছনে কী কারণ?

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

একদা, বিশ্বভারতীতে ভর্তি হতে পারাটাই যেন সৌভাগ্যের ছিল পড়ুয়াদের কাছে । অন্য এক গরিমা অনুভব করতেন পড়ুয়ারা ৷ যদিও বিশ্বভারতীর ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ বলেন, "অনেক গুলি কারণে আসন শূন্য রয়েছে । তবে সেক্ষেত্রে নতুন করে অতিরিক্তভাবে পড়ুয়াদের ভর্তি নেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে ৷ ইতিমধ্যে অধ্যক্ষ, বিভাগীয় প্রধানদের বলা হয়েছে । তারা কাজ করছেন ৷ মূল স্রোতে পড়াশোনা থেকে অনেকেই এখন বিকল্প পড়াশোনার পথ বেছে নিচ্ছেন, এটাও একটা কারণ । এটা শুধু বিশ্বভারতীর ক্ষেত্রে তাও নয়, সামগ্রিক ভাবেই এই বদল ।"

Visva Bharati
পড়ুয়ারা বিশ্বভারতীতে ভর্তির আগ্রহ হারাচ্ছেন (নিজস্ব ছবি)

ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতী

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী । 1921 সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পথ চলা শুরু ৷ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় ৷ প্রতি বছর ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়ুয়ারা আসেন । এমনকি, বিদেশি পড়ুয়ারাও প্রচুর সংখ্যায় আসেন বিশ্বভারতী পড়াশোনা করতে ৷ যা ইদানীং বহু গুণে কমেই গিয়েছে । যদিও, এই তথ্য দিতে চায় না বিশ্বভারতীর ফরেন সেল ৷

Visva Bharati
কোন বিভাগে কত আসন ফাঁকা তার তালিকা (নিজস্ব ছবি)

একটা সময় ছিল বিশ্বভারতীতে ভর্তি হওয়া দুষ্কর ছিল । মেধাতালিকা নাম উঠেছে কি না দেখতে হাজার হাজার পড়ুয়া হোটেল, লজ, ঘর ভাড়া নিয়ে বোলপুর-শান্তিনিকেতনে দিনের পর দিন থেকে যেতেন ৷ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও বিভাগে পড়ুয়াদের আসন ফাঁকা পরে আছে ৷ যা অভাবনীয় ।

Visva Bharati
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (নিজস্ব ছবি)

বিশ্বভারতীতে কোন বিভাগ ও ভবনে কত আসন ফাঁকা?

এই মুহূর্তে বিশ্বভারতীর স্নাতকস্তরে হিন্দি ভবনে 20টি, সংস্কৃত বিভাগে 28টি, ওড়িয়া বিভাগে 15টি, তুলনামূলক ধর্ম বিভাগে 45টি, স্নাতকোত্তর 48টি, অর্থনীতি বিভাগে 15টি, দর্শন বিভাগে 31টি আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে । এছাড়া, স্নাতকোত্তর স্তরে 5 বছরের সমম্বিত বিজ্ঞান বিভাগে 12টি, যোগ বিভাগে 25টি ও এমএড -এ 27টি আসন শূন্য ৷

Visva Bharati
'হেরিটেজ' বিশ্বভারতীতে আসন ফাঁকা (ইটিভি ভারত)

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিশ্বভারতীর অন্যতম সঙ্গীতভবন । এক ছাদের তলায় নৃত্য, সঙ্গীত, নাট্যচর্চার প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানের নাম দেশান্তরেও সমাদৃত । সেই সঙ্গীতভবনের স্নাতকোত্তর স্তরে রবীন্দ্রসঙ্গীতে 18টি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে 8টি, রবীন্দ্রনৃত্যে 15টি, মণিপুরী নৃত্যে 30টি, কথাকলি নৃত্যে 20টি, নাটক বিভাগে 30টি, বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সেতারে 14টি, তবলায় 16টি, এস্রাজে 14টি, পোখরাজে 16টি আসন শূন্য ৷ অর্থাৎ, একটি ভবনেই 181টি আসন এই মুহূর্তে ফাঁকা পড়ে রয়েছে ।

Visva Bharati
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (নিজস্ব ছবি)

আরও আছে, ভাষা ভবনগুলির মধ্যে স্নাতকোত্তর স্তরে চিনা ভাষায় 54টি, হিন্দি ভাষায় 22টি, জাপানি ভাষায় 27টি, ইন্দো-তিব্বতী ভাষায় 17টি, পার্সিয়ান ভাষায় 16টি, সাঁওতালি ভাষায় 15টি, তামিল ভাষায় 20টি, জার্মান ভাষায় 17টি, রাশিয়ান ভাষায় 17টি, ফ্রেঞ্চ ভাষায় 13টি, ইতালিয়ান ভাষায় 15টি আসন এখনও শূন্য ৷ আরও বেশ কিছু ভবন ও বিভাগে কমবেশি এভাবেই আসন শূন্য ৷ সব মিলিয়ে 935টি আসন শূন্য বিশ্বভারতীতে ৷

Visva Bharati
'হেরিটেজ' বিশ্বভারতীতে আসন ফাঁকা (ইটিভি ভারত)

অথচ, এই বিশ্বভারতীকে 2023 সালের 17 সেপ্টেম্বর 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' তকমা দিয়েছে ইউনেসকো । বিশ্বের একমাত্র চলমান বিশ্ববিদ্যালয় যে এই তকমার অধিকারী । তা সত্ত্বেও পড়ুয়ারা আগ্রহ হারাচ্ছেন বিশ্বভারতীতে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে ৷ এ রাজ্যের একমাত্র এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শক হলেন স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতি ও আচার্য হলেন খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী ।

Visva Bharati
কোন বিভাগে কত আসন ফাঁকা তার তালিকা (নিজস্ব ছবি)

বিশ্বভারতীর প্রাক্তনীরা

এই বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী, অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, শিল্পী, উপাচার্য প্রত্যেকেই নিজ-ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য৷ তাঁরা হলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্কার জয়ী সত্যজিৎ রায়, লেখিকা মহেশ্বেতা দেবী, কবি নবনীতা দেবসেন, পরিচালক তপন সিনহা, সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি, শিল্পী নন্দলাল বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, যোগেন চৌধুরী, সঙ্গীত শিল্পী শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, প্রশান্তচন্দ্র মহালনবিশ প্রমুখ ৷

Visva Bharati
'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' বিশ্বভারতী (নিজস্ব ছবি)

কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে অনীহা?

এই রকম গৌরবময় বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ পড়ুয়াদের আসন ফাঁকা পড়ে থাকার নেপথ্যে কি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র‍্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক (এনআইআরএফ) -এ বিশ্বভারতীর শিক্ষার মানের অবনমন একটা বড় কারণ । বিশেষ করে ভর্তি হওয়ার আগে ভিন রাজ্যের পড়ুয়ারা-সহ বিদেশি পড়ুয়ারা গুগলে যখনই সার্চ করছেন, তাতে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও র‍্যাঙ্ক তাঁরা পাচ্ছেন না ৷ শিক্ষার গুণগত মান না দেখে ভর্তি হতে চাইছেন না অনেকেই । এছাড়া, সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক-সহ ভাষা শেখার ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ হারাচ্ছেন পড়ুয়ারা ৷ কারণ, পরবর্তীতে সেভাবে কর্মসংস্থান নেই ।

Visva Bharati
সুভাষচন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ফাইল চিত্র)

বিশ্বভারতীর র‍্যাঙ্কিং

2016 সালে এনআইআরএফ র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বভারতীর মান ছিল 11তম, যা সর্বোচ্চ । এরপর থেকেই শুরু হয় শিক্ষার মানের অবনমন । 2018 সালে বিশ্বভারতীতে উপাচার্য হিসাবে যোগ দেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী । তাঁর সময় বিশ্বভারতী নানাভাবে বিতর্কের শীর্ষে পৌঁছে যায় ৷ 2018 সালে এনআইআরএফ র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বভারতীর মান হয় 31তম, 2019 সালে 37তম, 2020 সালে 50তম, 2021 সালে 64তম, 2022 সালে তা দাঁড়ায় 98তম স্থানে ৷ 2023 সালে আবার এক ধাপ উঠে আসে । মান ছিল 97তম । 2024 সালে দেশের 100টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঠাঁই হয়নি বিশ্বভারতী । এবছর তো এনআইআরএফ র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশের 200টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেই বিশ্বভারতী ।

Visva Bharati
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (নিজস্ব ছবি)

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তথ্য জানার অধিকার আইন (আরটিআই) সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, 2014 সাল থেকে 2025 সাল পর্যন্ত সংস্কৃত ভাষার প্রচার ও প্রসারের জন্য কেন্দ্র সরকার 2 হাজার 500 কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে ৷ আর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতীর সংস্কৃত বিভাগে পড়ুয়াদের আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে । কয়েক বছর ধরে যোগ নিয়ে প্রচার ও প্রসারে উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্র সরকার । খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যোগ শিক্ষার বিজ্ঞাপন দেন ৷ অথচ, তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ নিয়ে পড়াশোনা করার আগ্রহ হারাচ্ছেন পড়ুয়ারা ৷ প্রায় 100টির কাছাকাছি আসন শূন্য যোগ বিভাগে ৷

ঠাকুর পরিবারের বক্তব্য

এই নিয়ে অবশ্য নিন্দার ঝড় উঠেছে । কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরব আশ্রমিক, প্রাক্তনীরা ৷ ঠাকুর পরিবারের সদস্য তথা প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, "প্রাচীর দেওয়া, পথ আটকে দেওয়া, এসবে জোর না দিয়ে শিক্ষায় জোর দিন ৷ শিক্ষার মান উন্নয়নে জোর দিলে এই দিন দেখতে হতো না ৷ ধীরে ধীরে সব শেষ করে দেবে ৷ আমার বলার আর কিছু নেই ৷ আর ভালো লাগে না ।"

Visva Bharati
'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' বিশ্বভারতী (নিজস্ব ছবি)

প্রাক্তনীদের বক্তব্য

প্রাক্তনীদের মধ্যে নূরুল হক বলেন, "না শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে পারছে, না হেরিটেজ এলাকা রক্ষা করতে পারছে ৷ প্রাচীর দিতে গিয়ে, রাস্তা আটকাতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে লড়াই করাই বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে । কবিগুরুর এই বিশ্ববিদ্যালয়, নাম শুনলেন দেশবিদেশের মানুষ সম্মান করেন । সেই বিশ্ববিদ্যালয় কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । এখনও সময় আছে, গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের মন দিক কর্তৃপক্ষ ।"

Visva Bharati
'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' বিশ্বভারতী (নিজস্ব ছবি)

শিক্ষাবিদ কী বলছেন ?

শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার বলেন, "পশ্চিমবাংলায় পড়াশোনায় করলে ভবিষ্যৎ নেই, এটা অনেকেই মনে করেন । বিদুৎ চক্রবর্তীর সময় থেকেই বিশ্বভারতীর দুর্নাম শুরু হয়েছে কিছু বছর ধরে । সেখানে অনেকে ভয়ই পায় । তার সঙ্গে র‍্যাঙ্কিংয়ের দিকেও বিশ্বভারতী অনেকটা পিছিয়ে । যেগুলোর প্রভাব পড়েছে বলে আমার মনে হয় । তার সঙ্গে এবছর ফলাফল প্রকাশ করতে অনেকটাই দেরি করেছে সরকার । তাই শুধুমাত্র বিশ্বভারতী বলে নয়, সমগ্র পশ্চিমবাংলার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আসন ভর্তি হয়নি । যেটা ভয়ের ।"