পদ্মায় বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় লালগোলার তারানগর, আতঙ্কিত গ্রামবাসী
এর আগে স্থানীয় কালীনগর গ্রাম তলিয়ে গিয়েছিল পদ্মায়৷ এবার আশঙ্কা তারানগরকে নিয়ে৷ আশ্রয় শিবিরে 62টি পরিবার৷

Published : September 6, 2025 at 7:00 PM IST
লালগোলা (মুর্শিদাবাদ), 6 সেপ্টেম্বর: পদ্মার ঢেউ এবার ঘুম ছুটিয়েছে মুর্শিদাবাদের লালগোলা ব্লকের তারানগরের বাসিন্দাদের। বুধবার রাত থেকে চওড়া হচ্ছে পদ্মার ভাঙন। নদী ছুটে আসছে গ্রাম গ্রাস করতে। বছর কয়েক আগে আস্ত একটি গ্রাম গ্রাস করেছে পদ্মা। এবার কি পালা তারানগরের?
আতঙ্কের প্রহর গুনছে মানুষ। বুধবার গভীর রাতেই তলিয়ে যায় দু’টি বাড়ি। ঘুমের ঘোরে আতঙ্কে তাড়াহুড়োয় বেশ কয়েকজন জখম হয়েছেন। শুক্রবার সকালে 58টি পরিবারকে একটি স্কুলে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বিকেলে আরও চারটি পরিবারকে সরিয়ে আনা হয়েছে৷
লালগোলা ব্লকের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম তারানগর। এই তারানগরের মাটিতে জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ দফতরের প্রাক্তন মন্ত্রী সামায়ুন বিশ্বাস। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম এই তারানগরের ভূমিপুত্র। বর্তমানে প্রায় 400 পরিবারের বাস এই গ্রামে। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, এক দশক আগেও তারানগর থেকে দুই কিলোমিটার দূর দিয়ে পদ্মা প্রবাহিত হতো। তখন পদ্মা থেকে কিছুটা দূরে ছিল কালীনগর গ্রাম। কালীনগর গ্রাম এখন পদ্মা গর্ভে। এবার তারানগরকে গিলতে ক্রমশ এগিয়ে আসছে পদ্মা।
বুধবার গভীর রাতে তারানগরে হঠাৎ পদ্মার ভাঙনে কয়েকটি বাড়ি তলিয়ে যায়। আরও কয়েকটি বাড়ি নদী গর্ভে যাওয়ার জন্য প্রহর গুনছে। বর্ষা বিদায় নেওয়ার পরে নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় আতঙ্ক গ্রাস করেছে তারানগরকে। বৃহস্পতিবার বেশ কিছু পরিবার ঘরের আসবাবপত্র থেকে সমস্ত জিনিসপত্র নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ওই পরিবারগুলি নিজেরাই ঘর ভেঙে ইট, দরজা, জানালা সরিয়ে নিয়ে যান। অস্থায়ী শিবিরে দুর্গত পরিবারবর্গকে তিনবেলা খাবার দেওয়া হচ্ছে। তবে খাবারের মান নিয়ে দুর্গত পরিবারগুলি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করার দাবি তাঁদের।
অসহায় পরিবারগুলির মধ্যে একটি মুসলিম শেখের পরিবার৷ স্ত্রী ও অবিবাহিত মেয়েকে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণ শিবিরে৷ তিনি বলেন, ‘‘বাপ-ঠাকুরদার ভিটে। আগে টিনের ছাউনি ছিল। বছর চারেক আগে ছাদ দিয়েছিলাম। যেভাবে পদ্মা ভাঙছে, তাতে যেকোনও মুহূর্তে বাড়িটা নদী গর্ভে চলে যাবে।’’
এখন সত্তরের বেশি বয়স মুসলিম শেখের৷ একসময় পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতেন৷ এখন আর রোজ কাজে যেতে পারেন না। স্ত্রী আর এক অবিবাহিত মেয়েকে নিয়ে তিনজনের সংসার। মাসিক রেশন এবং মাঝে মধ্যে দিনমজুরি করে যেটা জোটে, তা দিয়ে কোনোরকমে চলে যায়।

সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে বছর চারেক আগে মাথার উপর কংক্রিটের ছাদ দিয়েছিলেন। সাধের সেই বাড়িটি গিলতে পদ্মা একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে মুসলিম শেখের বাড়ির থেকে পদ্মা কয়েক ফুট দূরে। গ্রামবাসীদের সাহায্যে বৃহস্পতিবার ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র ও পরিবারকে নিয়ে তারানগর প্রাইমারি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে মাঝে মধ্যে এসে বাড়ি দেখে যাচ্ছেন বৃদ্ধ। বাড়ির দিকে তাকিয়ে কান্নায় বুক ফাটছে মুসলিম শেখের।
পাশেই বাড়ি বিশেষভাবে সক্ষম পিন্টু শেখের। বাড়ির একপাশে ছোট একটি মুদিখানা দোকান খুলেছিলেন। ওই দোকানের রোজগার থেকেই সংসার চলত। পিন্টু শেখও সমস্ত জিনিসপত্র পাশের গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তারানগর স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।
বিলবোরাকোপরা পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সদস্য মহম্মদ জাকারিয়ার বাড়ি পদ্মা থেকে 10 ফুট দূরে। জাকারিয়া সাহেব বলেন, ‘‘গত বছর থেকে পদ্মার ভাঙন শুরু হতেই ঘরের বেশিরভাগ জিনিসপত্র শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। বাকি যেটুকু পড়ে ছিল, এদিন সকাল থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছি।’’
গ্রামবাসী শ্যামল ঘোষ বলেন, ‘‘বাড়ি থেকে পদ্মা 50 ফুট দূরে রয়েছে। কিন্তু পদ্মার গতিপ্রকৃতিকে বিশ্বাস নেই। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে বাড়ির দোড়গোড়ায় এসে পৌঁছে যেতে পারে। আতঙ্কে তিনদিন ধরে রাতে ঘুমোতে পারছি না। দল বেঁধে নদীর উপর নজর রাখছি। বিপদ বুঝলেই সকলকে সজাগ করতে হবে।’’
বুধবার রাত থেকে এভাবেই চরম বিপর্যয়ের প্রহর গুনছেন পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা। বর্ষার ভরা নদীর উথাল ঢেউ পাড়ে আছায় খেয়ে পড়তেই খসে খসে নদীতে পড়ছে মাটির চাঙর। এগিয়ে আসছে নদী। গ্রামবাসীদের চোখে ঘুম নেই। অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) দীপনারায়ণ ঘোষ বলেন, ‘‘ভাঙন প্রতিরোধে সেচ দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’

