খই-আতপেই সন্তুষ্ট, পুজোর 5 দিন রূপ বদলান কর্মকার পরিবারের দেবী দুর্গা
ঘট পুজোর মাধ্যমে দেবীর আরাধনা শুরু হয়েছিল কর্মকার পরিবারে ৷ পুজোর সূচনার পিছনের কাহিনী সম্পর্কে খোঁজ নিলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি তারক চট্টোপাধ্যায় ৷

Published : September 14, 2025 at 4:15 PM IST
আসানসোল, 14 সেপ্টেম্বর: 1757 খ্রিস্টাব্দে জুন মাসে পলাশীর যুদ্ধ হয় । আর সে বছরই শরতে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল আসানসোলের হীরাপুরের কর্মকার পরিবারে । এবার এই পুজোর 268 বছর । কর্মকার পরিবারের পুজো আজ আর শুধু সেই পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, গোটা হীরাপুর গ্রামের মানুষ এই পুজোয় মেতে ওঠেন ।
হীরাপুর গ্রামের আদিপুজো
হীরাপুর অঞ্চলের যে কয়েকটি পারিবারিক পুজো হয় তার মধ্যে কর্মকার পরিবারের পুজোটি আদি পুজো বলেই পরিচিত । জানা গিয়েছে, এই পুজো পরিবারের পূর্বপুরুষ নন্দলাল কর্মকার শুরু করেছিলেন ।
কথিত আছে, নদীতে স্নান করতে গিয়ে নন্দলাল একটি পিতলের ঘট পেয়েছিলেন । তিনি ঘটটি বাড়িতে এনে রাখেন । এরপর হীরাপুর গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা তথা পন্ডিত মানিকচাঁদ ঠাকুর নন্দলালকে পরামর্শ দেন ঘট প্রতিষ্ঠা করে দুর্গাপুজো করার জন্য । কিন্তু সেই সময় কর্মকার পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিল না বলে পরিবারের লোকেরা জানিয়েছেন । দুর্গাপুজোয় প্রচুর খরচ হয় । তাই কীভাবে দুর্গাপুজো করবেন সেই ভেবেই দুশ্চিন্তার মেঘ মাথার উপর ভর করে নন্দলাল কর্মকারের ।

জনশ্রুতি আছে, এই সময়ই দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন নন্দলাল কর্মকারকে । দেবী বলেছিলেন যে খই, আতপ চাল দিয়ে পুজো করলেই তিনি তা গ্রহণ করবেন । সেই তখন থেকে খই, আতপ চাল ও বাংলার আরশা পিঠে মূল ভোগ হিসেবে কর্মকার পরিবারের পুজোয় দেবী দুর্গাকে অর্পণ করা হয় । আর এভাবেই দুর্গাপুজো চলে আসছে হীরাপুরের কর্মকার পরিবারে ।
হীরাপুরেই বিরাট দুর্গা দালানে পুজো
বর্তমানে কর্মকার পরিবারের দুর্গা দালানের বিরাট আকার । প্রথম প্রথম ঘটে পুজো হলেও 80-90 বছর ধরে কর্মকার পরিবারের পুজোয় দেবীর প্রতিমা তৈরি করা হয় । হীরাপুরের কর্মকার পরিবারের ঠাকুর দালানে গিয়ে দেখা গেল প্রতিমা তৈরি হচ্ছে । রথের দিন থেকে এই প্রতিমার কাঠামোয় মাটি দেওয়া হয় বলে পরিবারের লোকেরা জানিয়েছেন । তবে এই ঠাকুর দালানে দুর্গার নিত্য পুজো হয় । রয়েছে একটি ছোট্ট প্রতিমা । সেই প্রতিমাতে রোজ পুজো করা হয় । এছাড়াও মন্দির গাত্রে রয়েছে দশমহাবিদ্যা প্রতিমার রূপ । পরিবারের লোকেরা জানালেন, প্রতি বছরই মন্দিরে নতুন রং করা হয় । দশমহাবিদ্যার যে দেবীগুলি খোদিত আছে মন্দির গাত্রে সেগুলিকেও নতুন করে রং করা হয় ।

বাহ্মণ নয়, কর্মকারেরাই পুরোহিত
হীরাপুরের কর্মকার পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, যখন প্রথম পুজো শুরু হয়, তখন পূর্বপুরুষ নন্দলাল কর্মকার এবং তাঁর ছেলে চণ্ডী কর্মকার দু'জনেই পুজো করতেন দেবী দুর্গার । সেই সময় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের চল ছিল না কর্মকার পরিবারে । জাতিতে কর্মকার হয়েও তারা দুর্গাপুজোয় বসতেন বলেই জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা । কিন্তু চণ্ডী কর্মকারের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মণদের হাতে এই পুজোর ভার তুলে দেওয়া হয় । তখন থেকে ব্রাহ্মণরাই এই পুজোর পুরোহিতের দায়িত্বে থাকেন । কিন্তু পুজোর শুরুর সময়কালে কর্মকারদের হাতে দেবী দুর্গার পুজো একটি ব্যতিক্রমী বিষয় বলেই স্থানীয়দের দাবি ।

দেবীর ভোগ রান্নায় বিশেষ নিয়ম
দেবী দুর্গা স্বপ্নাদেশ দিয়ে জানিয়েছিলেন, তাঁর ভোগে খই ও আতপ চাল হলেই হবে । সেই সঙ্গে পরবর্তীকালে জুড়েছে বাংলার আরশা পিঠে । কর্মকার পরিবারের পুজোই এটাই মূল ভোগ এবং এই ভোগ রান্না করা হয় নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি ও নিষ্ঠা মেনে মন্দির চত্বরেই ।
পরিবারের মহিলারা উপবাস থেকে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে দেবীর এই ভোগ মন্দিরেই তৈরি করেন । যতক্ষণ পর্যন্ত ভোগ রান্না না হচ্ছে ততক্ষণ মহিলারা কেউ খাদ্য ও জল গ্রহণ করেন না । নিয়মমাফিক দেবীকে আতপ চাল, খই এবং বাংলার আরশা পিঠে অর্পণ করা হয় । তার সঙ্গে দেওয়া হয় বর্তমানে গুড়ের ও চিনির নাড়ু ।
দেবীর রূপ পরিবর্তন
কর্মকার পরিবারের বর্তমান সদস্য সঞ্জয় কর্মকার বলেন, "আমাদের দেবীর রূপ প্রতিদিন পরিবর্তিত হয় । সপ্তমীতে দেবীর উৎফুল্ল, আনন্দের রূপ দেখা যায় । অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে সেই রূপ রাগী । নবমীতে অন্য রূপ । আবার দশমীর দিন দেবী যেন মনে হয় একেবারে কাঁদছেন । চোখ ছল ছল করছে । যারাই আমাদের মন্দিরে আসেন তারাই দেবীর এই অপরূপ রূপ পরিবর্তন দেখতে পান ।"

এছাড়াও আরও অনেক অনেক অলৌকিক গল্প রয়েছে এই কর্মকার পরিবারের পুজোয় । পরিবারের প্রবীণ সদস্য নিমাই কর্মকার বলেন, "আমাদের দেবীর রূপ পরিবর্তন হয়, সেটা মানুষ নিজে অনুভব করলেই বুঝতে পারবেন । শুধু তাই নয়, আমাদের দেবীর কাছে মানত করে গেলে সব মানত দেবী রাখেন এবং সেই মতো ভক্তরাই দেবীকে গয়না দিয়ে সাজিয়েছেন । দেবীর গায়ে প্রচুর সোনা এবং রুপোর অলংকার দেখতে পাওয়া যায় । সবটাই কিন্তু ভক্তদের দেওয়া ।" এছাড়াও দেবীর বলিদানের খড়গ ধোয়া জল খেলে বন্ধ্যাত্ব ঘুচে যায় বলেও কর্মকার পরিবারের লোকেরা দাবি করেছেন ।
কর্মকার পরিবারে বলিপ্রথা
আগে ছাগ বলি হত । বর্তমানে বলিদান প্রথা থাকলেও আর পশু বলি দেওয়া হয় না হীরাপুরের কর্মকার পরিবারের পুজোয় । অষ্টমীর দিন চাল কুমড়ো এবং নবমীর দিন আঁখ বলি দেওয়া হয় ৷ কর্মকার পরিবারের সদস্য সঞ্জয় কর্মকার বলেন, "পশু বলির প্রথা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বহু বছর হল । কিন্তু নিয়মমাফিক অষ্টমী এবং নবমীর বলিদান প্রথা চালু আছে । সেই কারণেই চাল কুমড়ো ও আঁখ বলি দেওয়া হয় দেবীকে সমর্পণ করার জন্য ।"
পুজোয় মেতে ওঠে পুরো গ্রাম
বর্তমানে কর্মকার পরিবার বিস্তৃত হয়ে প্রায় 20 থেকে 25টি পরিবারে ছড়িয়ে গিয়েছে ৷ কিছুজন গ্রামে থাকেন ৷ আবার অনেকের গ্রামের বাইরেও বসবাস । দুর্গাপুজো একদা কর্মকার পরিবারের একার হলেও এবং পুজোর আয়োজনে এখনও এই পরিবার থাকলেও, বর্তমানে পুরো গ্রামের কাছেই উৎসবের চেহারা নেয় এই দুর্গাপুজো । গোটা গ্রামের মানুষ এসে অংশ নেন তাতে ।

অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি দিতে প্রচুর ভিড় হয় কর্মকার বাড়িতে । শুধু তাই নয়, নবমীর দিন পাত পেড়ে ভোগ-খান প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ । পরিবারের প্রবীণ সদস্য নিমাই কর্মকার বলেন, "এখন এই পুজো আর পারিবারিকতায় সীমাবদ্ধ নেই ৷ এই পুজো এখন সবার পুজো হয়ে গিয়েছে । পরিবারের লোকেরাও যারা বাইরে থাকেন তারা যেমন এইসময় বাড়িতে ফিরে আসেন । তেমনই গোটা গ্রামের মানুষ এই পুজোয় আনন্দে মেতে ওঠে ৷"

