বিমুখ সরকার ! 152 বছরে ট্রামযাত্রার লড়াইয়ে রসদ মানুষের 'ভালোবাসা'
কলকাতার পথেঘাটে চলতে চলতে ট্রাম 152টি বছর কাটিয়ে দিল ৷ প্রশাসন এখন এই পরিবেশবান্ধব যানের বিপক্ষে ৷ এদিকে ট্রাম বাঁচাতে লড়ছেন ট্রামপ্রেমীরা ৷

Published : February 22, 2025 at 9:10 PM IST
কলকাতা, 22 ফেব্রুয়ারি: পায়ে পায়ে 152 বছর ! কল্লোলিনী কলকাতার বুকে কাটিয়ে দিল ট্রাম নেটওয়ার্ক ৷ একটানা দেড়শোরও বেশি বছর ধরে পরিষেবা দিয়ে যাওয়ার পরে আজ এই বিশ্বস্ত গণমাধ্যমকে ঘিরে বিতর্ক অবিরাম ৷ সঙ্গে অস্তিত্ব সংকটের মুখে ট্রাম ৷
1873 সালের 24 ফেব্রুয়ারি কলকাতার বুকে প্রথম ব্রিটিশরা চালু করে ঘোড়ায় টানা ট্রাম ৷ সেদিন শিয়ালদা থেকে ট্রাম যায় আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত ৷ দেশের তো বটেই, বিশ্বের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওঠানামার সাক্ষী ট্রামকার ৷ এরপর 1902 সালের 27 মার্চ কলকাতায় ধর্মতলা-খিরিদপুর রুটে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চলেছিল ৷ তারপর কেটে গিয়েছে অনেকগুলি দশক ৷ শহরের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তন ঘটেছে ট্রামেরও ৷ ঘোড়ায় টানা কাঠের ট্রাম রূপান্তরিত হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লোহার ট্রাম ৷
শহর যতই উন্নত হয়েছে, গতিও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে ৷ তাই এই জেট স্পিডের যুগে শ্লথ গতির ট্রাম যেন বড্ড বেমানান হয়ে উঠেছে ৷ নতুন প্রজন্মের যানবাহনকে জায়গা করে দিতে তাই এবার জাদুঘরে জায়গা হোক ট্রামের, এমনটাই মনে করছেন অনেকে ৷ এদিকে রাজ্য প্রশাসনও ট্রামের বিপক্ষে যানজট সৃষ্টি হওয়া থেকে আরও একাধিক যুক্তি খাড়া করছে ৷ তাই সংকটে ট্রামের অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ ৷
প্রশাসনের কাছে ট্রাম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠলেও বর্তমান প্রজন্ম এবং শহরের ট্রামপ্রেমীরা হাল ছাড়তে নারাজ ৷ তাই আগামী 24 ফেব্রুয়ারি ট্রামের 152তম জন্মদিন পালন করা হবে বিভিন্ন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ৷ ট্রামের সার্ধশতবর্ষ অর্থাৎ 150 বছর পূর্তিতে ধর্মতলা ট্রাম ডিপোতে 'ট্রাম যাত্রা'-র আয়োজন করা হয়েছিল ৷ সেখানে উপস্থিত ছিলেন পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী ৷ এবার আগামী 24 ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে সরকারের তরফে কেউ উপস্থিত থাকবেন না বলেই জানা গিয়েছে ৷

শহরে ট্রামের গ্রাফটা খুব দ্রুত নিম্নগামী হয়েছে ৷ কারণ 2023 সালে ট্রামের সার্ধশতবর্ষে শহরে তিনটি রুটে ট্রাম চলত ৷ এখন মাত্র দু'টি রুটে কোনওমতে টিকে আছে পরিষেবা ৷ এদিকে ট্রামের অস্তিত্ব রক্ষা করতে একাধিক জনস্বার্থ মামলা চলছে কলকাতা হাইকোর্টে ৷ ট্রাম নিয়ে সরকারের মনোভাব মোটামুটি পরিষ্কার ৷ ট্রাম চালাতে অনিচ্ছুক প্রশাসন ৷ শুধুমাত্র ধর্মতলা-খিদিরপুর রুটে একটি ট্রাম চলবে জয় রাইড হিসেবে ৷ তাই মাঝের এই দু'বছরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে ৷
এই দড়ি টানাটানির মধ্যে আগামী 24 ফেব্রুয়ারি সোমবার সকাল 9টায় গড়িয়াহাট ট্রাম ডিপো থেকে ছাড়বে 498 নম্বর ট্রাম ৷ এই ট্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু স্মৃতি ৷ এটি কাঠের ট্রাম যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি হয়েছিল ৷ তারপর একটানা বহু বছর পরিষেবা দিয়েছে 498 নম্বর ট্রাম ৷ এই ট্রামটিকে সুসজ্জিত করে ট্রাম যাত্রা করবেন ট্রামপ্রেমীরা ৷ প্রথমে এসপ্ল্যানেড ট্রাম ডিপো পর্যন্ত যাওয়া হবে ৷ সেখান থেকে বেশ কয়েকজন খুদে এবং ট্রামপ্রেমীরা ওই ট্রামে উঠবেন ৷ এরপর শ্যামবাজার ট্রাম ডিপোতে কেক কাটা হবে ৷ ট্রামের জন্মদিনে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ৷ শ্যামবাজারে অনুষ্ঠান শেষে ফের এসপ্ল্যানেড হয়ে গড়িয়হাটে শেষ হবে ট্রামযাত্রা ৷
ট্রাম গবেষক ও ট্রাম প্রেমী ডঃ দেবাশিস ভট্টাচার্য ক্যালকাটা ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি ৷ তিনি জানিয়েছেন, দেড়শো বছরের অনুষ্ঠান যখন হয়েছিল, তখনও তিনটি রুটে ট্রাম চলত ৷ এখন মাত্র দু'টি রুটে ট্রাম চলছে ৷ টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো বন্ধ ৷ অর্থাৎ ট্রমের ভালো-মন্দ কিছুই চোখে দেখা যাচ্ছে না ৷

তিনি বলেন, "তবে যেটা চোখে দেখা যাচ্ছে না, তার আড়ালেও যে অনেক কিছু হয়ে যাচ্ছে সেটা বেশ পরিষ্কার ৷ কারণ ট্রমের অস্তিত্ব রাখার জন্য যাঁরা লড়াই করে চলেছেন, তাঁরা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন ৷ ট্রামের বিষয়টি এখন আদালতে রয়েছে ৷ যতগুলি শুনানি হয়েছে, তাতে আদালতের পর্যবেক্ষণের প্রতিটি ছত্রে ট্রামের পক্ষে বলা হয়েছে ৷"
ট্রাম গবেষক ডঃ দেবাশিস ভট্টাচার্য আরও বলেন, "আরেকটা ভালো দিক ট্রামের পক্ষে মানুষ তেমন একটা কথা বলতেন না ৷ এখন প্রায় 90 শতাংশ নাগরিকই ট্রামের হয়ে বলছেন ৷ সেদিক থেকে দেখা যাচ্ছে যে ট্রামের স্বপক্ষে জনমত অনেকটা গঠন করা গিয়েছে ৷"
প্রবীণ ট্রামপ্রেমীর আরও সংযোজন, ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশনকে যাঁরা নিয়মিত অর্থ সাহায্য করে চলেছেন, তাঁদের অনেকেই অত্যন্ত শিক্ষিত, গুণী এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ৷ তাই ট্রামের পক্ষে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা অনেক বেশি ওজনদার, যাঁরা ট্রামের বিপক্ষে রয়েছেন তাঁদের তুলনায় ৷
ট্রাম সংগঠনের আরেক সদস্য সাগ্নিক গুপ্ত বলেন, "ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন বা WBTC এবং ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে 2023 সালে ট্রামের দেড়শো বছরের অনুষ্ঠান করেছিল অনেক বড় পরিসরে ৷ উল্লেখযোগ্যভাবে সেই বছর কলকাতার বুকে প্রথমবার ট্রাম প্যারেড হয়েছিল ৷ কিন্তু খুব দুঃখের এবং হতাশার বিষয়, তার দু'বছরের মধ্যে ট্রামকে ঘিরে এত বিতর্ক ৷ এত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে ৷"
তরুণ ট্রামপ্রেমী সাগ্নিক আরও জানান, সম্প্রতি সরকার খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে তারা আর ট্রাম চালাতে ইচ্ছুক নয় ৷ কিন্তু বর্তমানে যখন সারা পৃথিবীতে দূষণমুক্ত পরিবেশবান্ধব যান ব্যবহার করার উপর অনেক বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন এহেন টেকসই পরিবেশবান্ধব যানকে তুলে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন সাগ্নিক ৷ এই বিষয়টি নিয়ে পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তীকে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলে তাঁর মতামত পাওয়া যায়নি ৷

