নজরে 2026 ! মালদায় প্রতিটি ব্লকে তৃণমূলের নতুন কমিটি, ক্ষোভ দলের অন্দরে
ছাব্বিশের নির্বাচনে মালদা জেলায় নিজেদের জয় নিরঙ্কুশ করতে ব্লক কমিটিগুলিকে ঢেলে সাজাল তৃণমূল কংগ্রেস ৷


Published : September 10, 2025 at 5:32 PM IST
মালদা, 10 সেপ্টেম্বর: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে জেলার প্রতিটি ব্লকে নতুন কমিটি ঘোষণা করল শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ৷ তবে নয়া এই কমিটি নিয়ে বিভিন্ন ব্লকে দলের অন্দরের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে ৷
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে মালদা জেলার 12টি বিধানসভা কেন্দ্রের আটটিতেই জিতেছিল রাজ্যের শাসকদল ৷ কিন্তু সেই তৃণমূলই মুখ থুবড়ে পড়েছিল চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে ৷ যে আটটি কেন্দ্রে বিধানসভা নির্বাচনে তারা জয় পেয়েছিল, তার প্রতিটিতেই পদ্মের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল ঘাসফুল ৷ এগিয়ে আসছে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন ৷ এখন থেকেই প্রচারের ময়দানে নেমে পড়েছে ঘাসফুল শিবির ৷ পিছিয়ে নেই পদ্মরাও ৷
তুলনায় একটু পিছিয়ে কংগ্রেস ৷ রাজ্যে কোনও বিধায়ক না-থাকলেও মালদার মতো জেলায় হাত কিন্তু যে কোনও নির্বাচনে একটা বড় ফ্যাক্টর ৷ এখনও পর্যন্ত রাজ্য রাজনীতির যা চালচিত্র, তাতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে হাতের সঙ্গে কাস্তে-হাতুড়ির আঁতাত যে হবেই, তা জোর গলায় বলা যায় না ৷ ইতিমধ্যে মালদার তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রকে নিশানা করে গৌড়ভূমিতে নেমে পড়েছেন বাম শিবিরের বড় শরিক, সিপিআইএমের নতুন ক্যাপ্টেন মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ৷ জেলায় এসে তিনি ওই তিন বিধানসভা কেন্দ্রে কার্যত ওয়ার রুম খুলে দিয়ে গিয়েছেন ৷ এই আবহে ছাব্বিশের নির্বাচনে মালদা জেলায় নিজেদের জয় নিরঙ্কুশ করতে ব্লক কমিটিগুলিকে ঢেলে সাজিয়েছে তৃণমূল ৷
জেলার 15টি ব্লকের মধ্যে 14টিতেই নতুন ব্লক কমিটি গঠন করা হয়েছে ৷ শুধুমাত্র ইংরেজবাজার ব্লকের নতুন কমিটি এখনও ঘোষণা করেনি তারা ৷ জানা যাচ্ছে, এই ব্লকে কাদের জায়গা দেওয়া যেতে পারে, সেটাই এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি ঘাসফুল শিবিরের থিংক ট্যাংক ৷ এনিয়ে শাসকদলের অন্দরমহলেও প্রবল কৌতূহল ৷ কিন্তু মুখ খুলতে রাজি নন কেউ ৷ দলের জেলা সভাপতি আবদুর রহিম বকসি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "সমস্ত দিক খতিয়ে দেখেই নতুন ব্লক কমিটি গঠন করা হয়েছে ৷ দলের সিদ্ধান্ত প্রত্যেককে মেনে নিতে হবে ৷ সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে ৷ আগামী নির্বাচনে জেলার 12টি আসনেই দলের জয় সুনিশ্চিত করতে হবে ৷ সেই দায়িত্ব দলের সবার ৷"
জেলা সভাপতি তো তাঁর দলীয় চেয়ার থেকে মন্তব্য করে দিলেন, কিন্তু তাঁর সেই নির্দেশ কি আদৌ সব জায়গায় কার্যকর হচ্ছে ? মালদা জেলা তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বের কথা অজানা নয় কারও ৷ সেটা খুব ভালো করে জানেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে রাজ্য সভাপতি সুব্রক বক্সি, এমনকি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ৷ তাঁরা অনেক চেষ্টা করেও এই কোন্দলে লাগাম পরাতে পারেননি ৷ সম্প্রতি শেষ চেষ্টা করেছেন অভিষেক ৷ নিজের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে ডেকে জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন তিনি ৷ নির্বাচনে জিততে সবাইকে যে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে, মানুষের কাছে নেতানেত্রীদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রমাণ দিতে হবে, সেটাও সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি ৷
ওই বৈঠকে তিনি নাম না-করে জেলা পরিষদের সভাধিপতি লিপিকা বর্মন ঘোষের স্বামী প্রসেনজিৎ ঘোষকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি ৷ ইংরেজবাজার ব্লকের নেতা প্রসেনজিতের বিপুল সম্পত্তি নিয়ে ওই বৈঠকে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি ৷ শোনা যাচ্ছে, সেই প্রসেনজিতকেই ইংরেজবাজার ব্লকে দলের সভাপতি পদে ভাবছে তৃণমূলের থিংক ট্যাংক ৷ কারণ, প্রসেনজিৎ ছাড়া যাঁর নাম এই পদে ভাবা হচ্ছিল, সেই শুভদীপ সান্যালর নাম কিছুদিন আগেই দলের ইংরেজবাজার শহর সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে ৷ কিন্তু অভিষেক যাঁর নামে কটাক্ষ করেছিলেন, তিনিই হবেন দলের ব্লক সভাপতি ? তাহলে কি টাকা থাকলেই দলের বড় পদ কেনা যায় ? প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন নিচুতলার কর্মীদের একাংশ ৷
শুধু ইংরেজবাজার নয়, তৃণমূলের নয়া ব্লক কমিটি ঘোষণার পর জেলার প্রায় প্রতিটি ব্লকেই বিদ্রোহের আগুন লক্ষ্য করা যাচ্ছে ৷ বেশিরভাগ ব্লকে সেই আগুন তুষের নীচে চাপা থাকলেও হরিশ্চন্দ্রপুরে তা প্রকাশ্যে এসেছে ৷ গোষ্ঠীকোন্দলে রাশ টানতে আগেই হরিশ্চন্দ্রপুর 1 নম্বর ব্লককে দুটি সাংগঠনিক ব্লকে ভেঙেছিল তৃণমূল ৷ তাতেও যে কোনও কাজ হয়নি তার প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে ৷ এবার হরিশ্চন্দ্রপুর 1(বি) ব্লকের পুরনো কমিটি ভাঙা হয়নি ৷ আমূল পালটে ফেলা হয়েছে হরিশ্চন্দ্রপুর 1(এ) ব্লক কমিটি ৷ এই সাংগঠনিক ব্লকের সভাপতির পদ থেকে সরানো হয়েছে এলাকার প্রভাবশালী নেতা বুলবুল খান ঘনিষ্ঠ জিয়াউর রহমানকে ৷ সেই পদে নিয়ে আসা হয়েছে এলাকার বিধায়ক তজমুল হোসেন ঘনিষ্ঠ মোশারফ হোসেনকে ৷ বুলবুল ঘনিষ্ঠ পূজন দাসকে ব্লক যুব সভাপতির পদ থেকেও সরানো হয়েছে ৷ সেই পদে আনা হয়েছে তজমুল ঘনিষ্ঠ বিজয় দাসকে ৷
কর্মীদের বেশিরভাগই বলছেন, এই বিজয়ের হাতে কোনওদিন তৃণমূলের ঝান্ডাও দেখা যায়নি ৷ তাহলে কি মন্ত্রী তজমুল হোসেন আর জেলা পরিষদ সদস্য বুলবুল খানের ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্যই এই বদল ? কারণ, নতুন কমিটিতে বুলবুল ঘনিষ্ঠ একজনের নামও নেই ৷ এনিয়ে দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন ৷ তাঁদের বক্তব্য, এর ফল বিধানসভা নির্বাচনে দলকে পেতেই হবে ৷ কেউ সেটা আটকাতে পারবে না ৷ তজমুল সাহেব তো দূরের কথা, খোদ নেত্রীর কথাতেও কাজ হবে না ৷
শুধুই কি হরিশ্চন্দ্রপুর 1(এ) ব্লক ? শোনা যাচ্ছে, আরও অনেক ব্লকেই নতুন কমিটি নিয়ে বিরক্ত বেশিরভাগ তৃণমূল নেতা-কর্মী ৷ এর মধ্যে রয়েছে চাঁচল 1, মোথাবাড়ি, মানিকচকের মতো হেভিওয়েট ব্লকও ৷ তবে নেতৃত্বের রোষে পড়ার ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না ৷ নেতৃত্ব এই ক্ষোভ দ্রুত সামাল দিতে পারলে ভালো, তা না হলে কী হবে জানেন না জেলা তৃণমূলের এক বর্ষীয়ান নেতাও ৷ নাম প্রকাশ না-করার শর্তে তিনি জানান, "এই জেলার প্রতিটি ব্লকে দলের অন্দরে দ্বন্দ্ব রয়েছে ৷ নেতৃত্ব শুধু এক পক্ষের কথায় পরিচালিত হচ্ছে ৷ সেটা ঠিক নয় ৷ সব পক্ষের কথাকে গুরুত্ব না-দিলে আখেরে দলেরই ক্ষতি হবে ৷"

