ETV Bharat / politics

তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে অগ্নিগর্ভ মালদা! নেতাদের বাড়িতে হামলা, প্রতিবাদে পথ অবরোধ

অভিযোগ, এক গোষ্ঠীর নেতাদের বাড়িতে হামলা অন্য গোষ্ঠীর৷ কাঠগড়ায় মন্ত্রীর ভাই৷ জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ আক্রান্তদের৷

TMC Factional Conflict
তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে অগ্নিগর্ভ মালদা (নিজস্ব ছবি)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : September 10, 2025 at 8:07 PM IST

5 Min Read
Choose ETV Bharat

মালদা, 10 সেপ্টেম্বর: তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে উত্তপ্ত মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর৷ অভিযোগ, মঙ্গলবার রাতে সেখানে জেলা পরিষদ সদস্য বুলবুল খান ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা হয়েছে৷ গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে৷ এমনকী, দেওয়া হয়েছে খুনের হুমকিও৷ মন্ত্রী তজমুল হোসেনের অনুগামীরাই এই কাজ করেছে৷

এই ঘটনায় হরিশ্চন্দ্রপুর থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের হয়েছে৷ হামলাকারীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে বুধবার পথ অবরোধ করে প্রবল বিক্ষোভ দেখান বুলবুল খান ঘনিষ্ঠ তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা৷ তাঁদের অভিযোগ, মন্ত্রীর ভাইয়ের অঙ্গুলিহেলনেই এই ঘটনা ঘটেছে৷ এই ঘটনায় শোরগোল পড়েছে হরিশ্চন্দ্রপুর জুড়ে৷ গোটা ঘটনায় অস্বস্তি বাড়ছে শাসক শিবিরে৷ কলকাতা থেকে মন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি খোঁজখবর নিয়ে পদক্ষেপ করছেন৷

তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে অগ্নিগর্ভ মালদা! নেতাদের বাড়িতে হামলা, প্রতিবাদে পথ অবরোধ (ইটিভি ভারত)

তবে জেলার রাজনৈতিক মহল বলছে, পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের নতুন ব্লক কমিটি৷ এই কমিটি তৈরি হওয়ার পরই শাসক দলের অন্দলে কোন্দল শুরু হয়েছে৷ তার জেরেই মঙ্গলবার রাতে হরিশ্চন্দ্রপুর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে৷

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বারবার প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী তজমুল হোসেন ও মালদা জেলা পরিষদের সদস্য তথা এলাকার দাপুটে নেতা বুলবুল খান৷ দু’দিন আগেই শাসক দলের থিংক ট্যাংক হরিশ্চন্দ্রপুর 1(এ) সাংগঠনিক ব্লক কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি ঘোষণা করেছে৷ সেই কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন বুলবুল ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতা তথা আগের ব্লক সভাপতি জিয়াউর রহমান৷ তজমুল ঘনিষ্ঠ মোশারফ হোসেনকে সেই পদে আনা হয়েছে৷ বুলবুলের অনুগামী পূজন দাসও নতুন কমিটিতে জায়গা পাননি৷ মন্ত্রী ঘনিষ্ঠ বিজয় দাসকে ব্লক যুব তৃণমূলের সভাপতি করা হয়েছে৷ বুলবুল অনুগামীরা অভিযোগ করেছিলেন, মন্ত্রীর অঙ্গুলিহেলনেই নতুন এই কমিটিতে তাঁদের কারও জায়গা হয়নি৷

মঙ্গলবার রাতে হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য, বুলবুল ঘনিষ্ঠ মন্দিরা দাসের বাড়িতে হামলা চালায় দুষ্কৃতীরা৷ মন্দিরার স্বামী পূজন দাস৷ তাঁদের বাড়ি ভাঙচুর করা হয়৷ বাড়ির বাইরে রাখা গাড়িতেও ভাঙচুর চালায় দুষ্কৃতীরা৷ এরপরেই বুলবুল ঘনিষ্ঠ আরেক নেতা, আইএনটিটিইউসি-র ব্লক সভাপতি সাহেব দাসের রেস্তরাঁতে ভাঙচুর চালানো হয়৷ অভিযোগ, হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন অঞ্চল তৃণমূল সভাপতি সঞ্জীব গুপ্তা, নয়া তৃণমূল ব্লক যুব সভাপতি বিজয় দাস, তাঁর ভাই দুর্জয় দাস, তৃণমূল কর্মী জাবির হোসেনরা৷ এঁরা সবাই মন্ত্রী তজমুল ঘনিষ্ঠ৷ হামলাকারীরা পূজন ও মন্দিরাকে খুনেরও হুমকি দেয় বলে অভিযোগ৷ বুলবুল ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তজমুলের ভাই জম্মু রহমানের নির্দেশেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে৷

TMC Factional Conflict
নেতাদের বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে পথ অবরোধ (নিজস্ব ছবি)

গতকাল রাতের ঘটনার প্রতিবাদে এদিন আক্রান্তদের তরফে হরিশ্চন্দ্রপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়৷ এরপরেই 81 নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা৷ সেখানে আক্রান্তরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন হরিশ্চন্দ্রপুর 1 নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা স্বপন আলি৷

তিনি বলেন, “গতকাল রাতে এলাকার গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য ও প্রাক্তন ব্লক যুব তৃণমূলের সভাপতির বাড়িতে দুষ্কৃতীরা তাণ্ডব চালিয়েছে৷ তাঁর বাড়ি, গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে৷ হরিশ্চন্দ্রপুর স্ট্যান্ডে সাহেবের দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে৷ হামলাকারীরা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ পুলিশ নিরুপায় হয়ে দেখছে৷ এই আক্রমণ আমরা মেনে নেব না৷ আক্রমণকারীরা গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পথ অবরোধ চলবে৷’’

তাঁর অভিযোগ, ‘‘গতকাল রাতে পুলিশের সামনেই আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে৷ পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে৷ কারা এই কাজ করেছে সেটা সবাই জানে৷ এটা সন্ত্রাস৷ তারা আমাদের দলের হতে পারে৷ কিন্তু যারা সন্ত্রাস করবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে৷ আমরা গোষ্ঠীকোন্দল চাই না৷ আমাদের নেতৃত্বের উপর যারা হামলা চালিয়েছে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে৷”

আক্রান্ত পঞ্চায়েত সদস্যা মন্দিরা দাস বলছেন, “গতকাল রাতে ওরা আমার স্বামীকে খুন করতে এসেছিল৷ তাকে না পেয়ে ওরা গাড়ি ভাঙচুর করে গিয়েছে৷ দুর্জয়, বিজয়, সাইরাজ, জাবির, সঞ্জীবরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে৷ জম্মু রহমান প্ল্যান করে ওদের পাঠিয়েছিল৷ রাজনীতিতে পেরে না উঠে ওরা আমার স্বামীকে খুন করার পরিকল্পনা করেছে৷ আমাদের মারতে এসেছিল ওরা৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘ওরা যে এখানে সিন্ডিকেট চালাচ্ছে, সেটা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে৷ এর মূল মাস্টারমাইন্ড জম্মু, তজমুল আর সঞ্জীব গুপ্তা৷ মানুষ যাতে ভয় পায়, তার জন্যই ওরা এসব করছে৷ ওরা আবার আমাদের আক্রমণ করতে পারে৷ আমরা পুলিশকে সব জানিয়েছি৷ এর আগেও ওরা আমাদের উপর হামলা করেছিল৷ তখনও দলে অভিযোগ জানিয়েছিলাম৷ সেই রাগ থেকেই ওরা এসব করছে৷”

TMC Factional Conflict
নেতাদের বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে পথ অবরোধ (নিজস্ব ছবি)

মন্দিরার স্বামী পূজন দাস বলেন, “হরিশ্চন্দ্রপুর সদর খুব শান্তিপ্রিয় এলাকা৷ গতকাল পুলিশের উপস্থিতিতে ওরা তাণ্ডব চালিয়েছে৷ একটি ঘর ভাঙা হয়েছে৷ রাত দুটোর সময় আমার বাড়িতে ইট-পাথর ছুড়েছে৷ প্রকাশ্যে বলেছে, পূজনকে ওরা মার্ডার করবে৷ আমি ঘর থেকে না বেরোনোয় ওরা আমার গাড়ি ভাঙচুর করে যায়৷ ওরা আমার গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য চুন্নু নামে একজনের কাছ থেকে জোর করে স্পিরিটও নিয়ে যায়৷ এদের মদত দিচ্ছে মন্ত্রীর ভাই জম্মু রহমান৷ এরা সিন্ডিকেট চালাচ্ছে, ত্রাস করছে৷ সামনে নির্বাচন৷ ওরা এভাবে মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে৷’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার স্ত্রী ওদের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেছিল৷ তাই ওরা আমাকে খুন করতে চাইছে৷ গতকাল আমার স্ত্রীর মোবাইলে একটা ফোন এসেছে৷ ওই কলে স্ত্রীকে বলেছে, পূজনকে মার্ডার করা হবে৷ সে যেন আমার সঙ্গে না থাকে৷ গতকাল রাতে ওরা 10-15টি বাইক নিয়ে এসে এই তাণ্ডব চালায়৷ গতকাল রাতের ঘটনা হরিশ্চন্দ্রপুর সদরের সবাই দেখেছে৷ অভিযোগকারীদের গ্রেফতার না করা হলে আমাদের এই ধরনা চলবে৷”

জাতীয় সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন হরিশ্চন্দ্রপুর থানার আইসি মনোজিত সরকার৷ তিনি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়৷ যান চলাচল স্বাভাবিক হয় জাতীয় সড়কে৷ চাঁচল মহকুমা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে গোটা ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে৷ হরিশ্চন্দ্রপুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে৷ এদিকে কলকাতা থেকে মন্ত্রী তজমুল হোসেন জানান, “আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি৷ খোঁজখবর নিয়েই যা বলার বলব৷”

আরও পড়ুন -

  1. স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ, তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা দলীয় সদস্যদের
  2. নরমে-গরমে মালদা তৃণমূল নেতৃত্বকে নিয়ে বৈঠক অভিষেকের, হুঁশিয়ারি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে
  3. নির্বাচনের মুখে শাখা সংগঠনের নেতৃত্বে রদবদল, ব্যুমেরাং হবে না-তো ? প্রশ্ন তৃণমূলেই