ETV Bharat / politics

ছাব্বিশে বাজিমাতে বিজেপির পাখির চোখ পঁচিশের দুর্গোৎসব

2026 এর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এবারের দুর্গাপুজোয় জনসংযোগে নামার পরিকল্পনা করছে বিজেপি৷

BJP PARTICIPATION IN DURGA PUJA
ছাব্বিশে বাজিমাতে বিজেপির পাখির চোখ পঁচিশের দুর্গোৎসব (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : September 15, 2025 at 6:11 PM IST

7 Min Read
Choose ETV Bharat

দুর্গাপুর, 15 সেপ্টেম্বর: ভগবান শ্রীরামের নামে ধ্বনি দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে জাঁকিয়ে বসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি৷ আর সেই রামচন্দ্রের অকাল-বোধনই প্রতি বছর বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে যুগ-যুগ ধরে৷ তার পরও রাজনীতির ময়দানে বাঙালির মন এখনও পুরোপুরি জয় করতে পারেনি ‘রাম-ভক্ত’দের দল৷

আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেই লক্ষ্যে পুরোপুরি সফল হওয়ার জন্য শারদোৎসবের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চাইছে গেরুয়া শিবির৷ সেই কারণেই শারদোৎসবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় জনসংযোগের পরিকল্পনা করেছে বিজেপি৷ 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাজিমাত করতে তাই পঁচিশের দুর্গোৎসবকেই পাখির চোখ করেছে বিজেপি৷

Durga Puja
দুর্গাপুজোয় সিঁদুরখেলা (ফাইল ছবি)

রাজ্যের দুর্গোৎসবে বিজেপির কনভেনার তথা দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোড়ুই বলেন, ‘‘বিজেপি কার্যকর্তাদের এলাকায় এলাকায় যে পুজোগুলি হয়, সেই পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকতে হবে। পুজো কমিটিতে থাকা, পুজোর আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, সাধ্যমতো চাঁদা দেওয়া, সাধারণ মানুষদের সঙ্গে গল্পগুজব আড্ডায় মেতে থাকতে হবে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘নিজের এলাকার দুর্গোৎসবকে সুশৃংখলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিজেপি কার্যকর্তাদের কমিটির সামনের সারিতে থাকার জন্য পার্টির পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহিলারাও দুর্গাপুজোর যে সমস্ত প্রাচীন রীতি রেওয়াজ রয়েছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকবেন।’’

Durga Puja
দুর্গাপুজোয় সিঁদুরখেলা (ফাইল ছবি)

তবে এই জনসংযোগ করতে করতেই মানুষের মগজে বিজেপির বক্তব্যগুলো যে গেঁথে দেওয়ার প্রচেষ্টাও চলবে, সেকথা অকপটেই জানিয়েছেন গেরুয়া শিবিরের এই বিধায়ক৷ তিনি বলেন, ‘‘দুর্গোৎসবের সময় বাঙালি আড্ডায় মেতে ওঠেন। অনেকে যাঁরা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে থাকেন বা বিদেশেও থাকেন, তাঁরাও এসে উপস্থিত হন উৎসবের এই সময়কালে। আর বাঙালির আড্ডায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ক উঠে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। ভারতীয় জনতা পার্টির যেটা লক্ষ্য, সেটাই মানুষের সামনে তুলে ধরা।’’

BJP
বিজেপি (ফাইল ছবি)

উল্লেখ্য, সিপিএম-সহ বামপন্থী দলগুলি সারাবছর ধর্মের ছোঁয়াছ এড়িয়ে রাজনীতি করলেও দুর্গাপুজোর সময় মণ্ডপের আশপাশেই থাকে৷ অধিকাংশ মণ্ডপের বাইরে সিপিএম-সহ বামপন্থী দলগুলির বুকস্টল দেখা যায়৷ সেখান থেকে নিজেদের মতাদর্শ সংক্রান্ত, বামপন্থী নেতাদের লেখা বই বিক্রি করা হয়৷ এই রাজ্যের রাজনীতির ময়দানে তৃণমূল কংগ্রেস শক্তিশালী হওয়ার পর থেকে তাদের স্টলও দেখা যায় দুর্গাপুজোর মণ্ডপে৷ পাশাপাশি সরকারি তরফে অনুদান থেকে নেতাদের যোগদানের মাধ্যমে শাসক দল বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের সঙ্গে একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে৷

Durga Puja
দুর্গা প্রতিমা (ফাইল ছবি)

সেখানে বিজেপির উপস্থিতি একেবারে নেই বললেই চলে৷ সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মণ্ডপের বাইরে বিজেপির বুকস্টল দেখতে পাওয়া যায়৷ মাঝে 2019 সালে সল্টলেকে বিজেপির তরফে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছিল৷ প্রথম বছর উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ৷ বছর তিনেক চলার পর সেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়৷ মহিলা পুরোহিত দিয়ে পুজো করিয়ে সেই সময় শোরগোল ফেলে দিয়েছিল গেরুয়া শিবির৷

এছাড়া কয়েকজন নেতা নিজস্ব উদ্যোগে পুজো করেন৷ সেই তালিকায় লক্ষ্মণ ঘোড়ুই-সহ জেলার বেশ কয়েকজন নেতা রয়েছেন৷ কলকাতার অন্যতম বড় পুজো সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের পুজোর সঙ্গেও বিজেপির যোগাযোগ বেড়েছে৷ কারণ, এই পুজোর প্রধান কর্তা সজল ঘোষ এখন কলকাতা পুরনিগমে বিজেপির কাউন্সিলর৷

Durga Puja
দুর্গাপুজোয় নবপত্রিকা স্নানের শোভাযাত্রা (ফাইল ছবি)

এই বৃত্তের বাইরে গিয়ে দুর্গাপুজোর সময় সাধারণের সঙ্গে মিশে যেতে চাইলেও বিজেপি কি তা পারবে? শাসক দলের নেতারা যেমন প্রায় প্রতিটি পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছেন, তাঁদের সঙ্গে কি বিজেপির নেতারা টক্কর দিতে পারবেন? রাজ্য বিজেপির দুর্গোৎসবের কনভেনার লক্ষ্মণ ঘোড়ুই অবশ্য সরাসরি উত্তর দেননি৷ বরং তিনি টেনেছেন রাজ্য সরকারের অনুদান নিয়ে তাঁদের আপত্তির সঙ্গে৷

বিজেপির এই বিধায়ক বলেছেন, ‘‘আমরা দুর্গোৎসবে এই অনুদান দেওয়ার বিরোধিতা করছি। অনেক পুজো কমিটি এর আগে অনুদান ফেরত দিয়েছে। বাংলায় দুর্গোৎসব অনুদান দেওয়ার পর আয়োজিত হচ্ছে এমনটা নয়। আগে গ্রামীণ এলাকার মানুষেরা নিজেরা চাঁদা দিয়ে দুর্গাপুজো করতেন। তাতে পুজোর সঙ্গে মানুষের নিবিড় সংযোগ ছিল। আমরা মানুষের সেই সংযোগ চাইছি দুর্গাপুজোর সঙ্গে। আর্থিক অনুদান দেওয়ার বিরোধিতা আগেও করেছি, এখনও করছি।’’

Durga Puja
দুর্গাপুজোয় নবপত্রিকা স্নানের শোভাযাত্রা (ফাইল ছবি)

ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে বিজেপি চাইলেও দুর্গাপুজোয় কতটা জনসংযোগ করতে পারবে! তবে কয়েকজন নেতা অবশ্য কিছু পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন৷ বিজেপির বর্ধমান-দুর্গাপুর সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এবছর অপারেশন সিঁদুর হয়েছে। তাই আমরা ঠিক করেছি দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মহিলাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন শাড়ি, শাঁখা, সিঁদুর, আলতা পৌঁছে দেব। সারা বছরই আমরা বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকি। তবে দুর্গাপুজোর সঙ্গে যেহেতু বাঙালিদের আবেগ জড়িয়ে আছে৷ তাই সেই সময় আমরা সবাই সবার সঙ্গে মিলেমিশে এই পুজোয় নিবিড় জনসংযোগ করব।’’

একই কথা শোনা গেল বিজেপির মহিলা মোর্চার পশ্চিম বর্ধমান জেলার সভানেত্রী মনীষা শিকদারের গলায়৷ তিনি বলেন, ‘‘বিজেপির মহিলা মোর্চার সদস্যরা শুধুমাত্র বারোয়ারি পুজোগুলোর সঙ্গেই নয়, নিজেদের এলাকার পারিবারিক পুজোগুলোর সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকবেন। পুজোর সময় মহিলাদের একটা বড় ভূমিকা থাকে পুজোর কাজকর্মে। সেই সমস্ত কাজেই আমাদের মহিলারা নিজের নিজের এলাকায় জড়িয়ে থাকবেন।’’

Durga Puja
দুর্গা প্রতিমা (ফাইল ছবি)

তাছাড়া এই বছর সল্টলেকে আবার বিজেপির উদ্যোগে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হচ্ছে৷ যদিও বিষয়টি নিয়ে রাজ্যস্তরে এখনও সেভাবে আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে৷ সূত্রের খবর, সম্প্রতি বিজেপির একটি শীর্ষ-বৈঠকে এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷ তবে বিজেপির অন্যতম নেতা জিতেন্দ্র তিওয়ারি বলেন, ‘‘দুর্গাপুজোর সময় আমরা সবাই যে যার এলাকাতেই থাকি। পার্টির থেকে কী গাইডলাইন, তা পার্টির নেতারাই বলবেন। সেই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’’

BJP
বিজেপি (ফাইল ছবি)

যদিও মানুষ বিজেপির এই উদ্যোগকে ভালোভাবে নেবে না বলেই মনে করে সিপিএম ও তৃণমূল কংগ্রেস৷ সিপিএমের পশ্চিম বর্ধমান জেলা কমিটির সদস্য সিদ্ধার্থ বসু বলেন, ‘‘খুব একটা বেশি কিছু লাভ হবে না। ওরা তো ধর্মের রাজনীতিই করে। মন্দির-মসজিদের রাজনীতি এ রাজ্যে ছিল না। বিজেপির মস্তিষ্কপ্রসূত এই রাজনীতি তৃণমূলের হাত ধরে এই রাজ্যে প্রবেশ করেছে। দু’টো রাজনৈতিক দল তো একই পথে চলে। সুতরাং এতে বিজেপির খুব বেশি লাভ হবে বলে আমার মনে হয় না।’’

Durga Puja
দুর্গা প্রতিমা (ফাইল ছবি)

অন্যদিকে পশ্চিম বর্ধমান জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি উত্তম মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এরা দেশকে বিক্রি করেছে, এবার বাংলার দিকে নজর পড়েছে। কিন্তু এদের কার্যসিদ্ধি হবে না। মানুষ বুঝে গিয়েছে মোদিবাবুর চালাকি। একটা মিথ্যার দিল্লির সরকার চলছে। মানুষ এর জবাব দেবে। আর দুর্গা পুজোয় আমরা রাজনীতি করি না। মানুষের পুজো, মানুষের উৎসব৷ সুতরাং মানুষ ঠিক করবে কীভাবে, তারা পরিবার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে উৎসব পালন করবে। বিজেপির মূল লক্ষ্য বাংলা দখল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাদের সেই আশায় আজীবন জল ঢেলে যাবে।’’

Durga Puja
দুর্গাপুজোয় দর্শনার্থী ভিড় (ফাইল ছবি)

প্রসঙ্গত, 2021 সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপিকে বহিরাগত তকমা দিয়ে প্রচার চালিয়েছিল তৃণমূল৷ তার কিছুটা প্রভাব ভোটে পড়েছিল বলেই মত রাজনৈতিক মহলের৷ এবার ইতিমধ্যে বিজেপিকে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী বলে উল্লেখ করে ময়দানে নেমে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল৷ ফলে বিজেপিকেও কৌশল বদল করতে দেখা গিয়েছে৷ যে দলের সবস্তরের নেতারাই জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে কথা শুরু এবং শেষ করতেন৷ তাঁদের মুখে এখন ‘জয় মা দুর্গাা’, ‘জয় মা কালী’ শোনা যাচ্ছে৷ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুর্গাপুরে একটি জনসভায় মা দুর্গা ও মা কালীর নাম নিয়ে ভাষণ শুরু করেছিলেন৷

Durga Puja
দুর্গা প্রতিমা (ফাইল ছবি)

ফলে দুর্গাপুজোয় তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণের নেপথ্যে একই কৌশল থাকতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা৷ এখন দেখার এই কৌশল কতটা কার্যকরী হয় বিজেপির জন্য? তৃণমূলের তৈরি করা বাংলা ও বাঙালি বিরোধী প্রচারের পালটা জবাব কতটা দিতে পারে গেরুয়া শিবির?

আরও পড়ুন -

  1. তিন বছরেই হাল ছাড়ল পদ্মশিবির, উমার আরাধনায় আর নেই বিজেপি
  2. পৌরহিত্য করছেন 'অব্রাহ্মণ মহিলা', বিজেপি'র দুর্গাপুজোয় আধুনিকতার ছোঁয়া