সংখ্য়ায় বাড়লেও দেশের নতুন কর্মী বাহিনীর জন্য বিপদও কম নয়
ভারতের মতো দেশে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মীর সংখ্য়া চিরকারলই বেশি ৷ কিন্তু নয়া অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতায় তাঁদের সমস্যা বেড়েছে অনেকটাই ৷

Published : July 27, 2025 at 1:50 PM IST
এতকাল বিষয়টি ছিল ফ্রিল্যান্স বা ওই জাতীয় কিছু ৷ এখন বলা হয় গিগ ওর্য়াক ৷ ভারতে এই গিগ ওয়ার্কারের বিপুল সম্ভাবনা আছে বলে আগেই জানিয়েছে নীতি আয়োগ ৷ যদিও ভারতে ঠিক কতজন গিগ ওর্য়াকের সঙ্গে যুক্ত তা নির্দিষ্ট করে জানা নেই ৷ নীতি আয়োগের হিসেব অনুযায়ী দেশে এই ধরনের কর্মীর সংখ্যা 6.8 মিলিয়ন ৷ সেটা অবশ্য 2019-20 সালের হিসেব ৷ 2030 সালের মধ্যে এই সংখ্যা 23.5 মিলিয়নে পৌঁছে যাবে ৷ গিগ কর্মীদের সংখ্যা বাড়ার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে ৷ প্রথমত, এই ধরনের কাজে বাড়তি রোজগারের সুযোগ থাকে ৷ তাছাড়া নির্দিষ্ট ধরন ও পদ্ধতি থাকায় অনেকেই এই ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত হতে চান ৷ গিগ কর্মী হিসেবে শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকে শুরু করে অন্য দক্ষতাও তুলনায় কম দরকার হয় ৷ এটাও কর্মী সংখ্যা বাড়ার অন্যতম বড় কারণ ৷ তবে চাকরিতে স্থায়ীত্বের অভাব, কাজের নির্দিষ্ট সময় না থাকা এবং ব্যক্তিগতভাবে আরও বেশি দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ না থাকার মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কর্মীদের ৷
গিগ কর্মীরা রিটেলের পাশাপাশি পরিবহণের মতো ক্ষেত্রের সঙ্গে অধিক সংখ্যায় জড়িত থাকেন ৷ তাঁদের সমস্যা আরও বাড়িয়েছে আবহাওয়া ৷ 2024 সালে দেওয়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের একটি রিপোর্ট বলছে, এই ধরনের কর্মীদের সপ্তাহে 50-60 ঘণ্টা কাজ করতে হয় ৷ প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি পেরিয়ে 90-120 কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলে তবে বলার মতো রোজগার করতে পারেন তাঁরা ৷ তাঁদের সারাদিন রাস্তায় ঘুরতে হয় ৷ এরইমধ্যে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, গত কয়েকবছরের মধ্যে তাপপ্রবাহের সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে ৷ সেটা গিগ কর্মীদের সমস্যা যে বাড়াচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ৷ এই তীব্র গরমের বড় প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতির উপর ৷ 2024 সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া একটি রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছিল, তীব্র গরম এবং তার থেকে তৈরি হওয়া সমস্যার জেরে ভারতের জিডিপির 4.5 শতাংশ ক্ষতি হতে পারে ৷
বিভিন্ন শহরকে কর্মস্থল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে একজন কর্মীকে কী কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা ভালোভাবে বোঝা যেতে পারে ৷ হায়দরাবাদে কাজ করে তেলেঙ্গানা গিগ অ্য়ান্ড প্ল্যাটফর্ম ওয়াকার্স ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠন ৷ তাদের 166 কর্মীকে নিয়ে একটি সমীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল ৷ তাদের সাহায্য করেছিল হেলথওয়াচ ৷ দেখা গিয়েছে এই 166 জনের মধ্য়ে 40 শতাংশ কর্মী পরিশুদ্ধ পানীয় জল পান করতে পারেন না ৷ পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের সুবিধা নেই 60 শতাংশ কর্মীর ৷ পাখার তলার বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পান মাত্র 20 শতাংশ কর্মী ৷ ভালোভাবে জীবন নির্বাহ করার সামান্য সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে কর্মীদের মধ্যে নানা ধরনের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে ৷
এই ধরনের আলোচনায় কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে গেলে এটা মাথায় রাখা দরকার-শৌচাগার আছে মানেই সেটি ব্যবহারযোগ্য এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই ৷ দেশের বেশ কয়েকটি শহরের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার পাশাপাশি নিরাপত্তা একটি বড় সমস্যা ৷ প্রজা ফাউন্ডেশনের একটি রিপোর্ট বলছে, মুম্বইয়ের 6680টি কমিউনিটি টয়েলেটের মধ্যে 80 শতাংশ টয়লেটে বিদ্যুৎ এবং জলের সংযোগ নেই ৷ বেঙ্গালুরুর অর্ধেকের বেশি পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য ৷ বেশিরভাগ শহরে থাকা পাবলিক টয়লেটে দরজা পর্যন্ত নেই ৷ তাছাড়া বড় বড় শহরে কাজের সময়ও এখন অনেকটা বেড়ে গিয়েছে ৷ এখন 10 থেকে 12 ঘণ্টা করে কাজ করতে হচ্ছে ৷ কিন্তু এই দীর্ঘ সময় কাজ করতে হলেও বিশ্রাম নেওয়ার কোনও ভালো জায়গা না থাকায় তাঁদের নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ৷
আবহাওয়ার কারণে তৈরি হওয়া সমস্যা মহিলা গিগ কর্মীদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে ৷ প্রজা ফাউন্ডেশন 2024 সালে একটি রিপোর্টে উল্লেখ করেছে মুম্বইয়ে প্রতি 1800 মহিলার জন্য পাবলিক টয়েলেটের একটি করে সিট আছে ৷ কিন্তু স্বচ্ছভারত মিশনের লক্ষ্য ছিল প্রতি 100-200 মহিলার জন্য যাতে একটি করে সিট বরাদ্দ থাকে সেই ব্যবস্থা করা ৷ একজন মহিলাকে প্রতিদিন গড়ে 8-10 ঘণ্টা কাজ করতে হয় ৷ কিন্তু সেখানে এই ধরনের সামান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব কাজের পরিবেশকে অমানবিক করে তুলেছে ৷ তাছাড়া যাতায়াতের জন্য় পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব থেকে শুরু করে ভালো রাস্তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে দিয়েছে ৷ গিগ কর্মীদের মধ্যে মহিলা ও পুরুষদের অনুপাতের ভারসাম্য নষ্ট হওযার এটাই অন্যতম প্রধান কারণ ৷

কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন সম্ভব ?
আবহাওয়ার পরিবর্তনকে একটি গুরুতর সমস্যা বলে ধরে নিয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন করা প্রয়োজন ৷ প্রত্যেকটি শহরের স্থানীয় সরকার (পুরসভা বা পুরনিগম) যাতে গিগ কর্মীদের ভালো থাকার জন্য যা যা দরকার তা দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা উচিত ৷ যে কোনও নীতি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে গিগ কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করাও আবশ্যক ৷ বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা থেকে শুরু করে পরিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্বচ্ছ শৌচাগারের মতো ব্যবস্থার সুবিধা যাতে এই কর্মীরা পান তা নিশ্চিত করা দরকার ৷ মহিলা গিগ কর্মীদের সমস্যা আলাদা করে অনুধাবন করা দরকার ৷ আমেদাবাদের মতো শহরে গরমকে মোকাবিলা করার জন্য আলাদা করে নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে ৷ তাতে গিগ কর্মীদের সুরক্ষা এবং সুস্বাস্থ্য়ের প্রসঙ্গটিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৷ তবে এ ব্যাপারে বিদেশের কয়েকটি শহর অনেকটা এগিয়ে ৷ আমেরিকার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শহরে গিগ কর্মীদের নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ৷ তাঁদের জন্য বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা তৈরি হয়েছে ৷ কাজের ফাঁকেই যাতে খানিকটা সময় তাঁরা বিশ্রাম নিতে পারেন সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছে ৷ সিঙ্গাপুরে আবার গরম কতটা বাড়ছে তা বুঝতে তাপমাত্রার উপর প্রতিনিয়ত নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে ৷ আর তার উপর নির্ভর করেই প্রশাসনিক নীতি নির্ধারিত হয় ৷ ভারতীয়দের জীবনে চোখে পড়ার মতো বদল আনতেও এই ধরনের পথে হাঁটতে হবে ৷
এনডিএমএ-র পরামর্শ (জুন 2025)
বিভিন্ন শহরে কাজ করা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের জন্য বেষ কয়েকটি পরামর্শ জারি করেছে এনডিএমএ ৷ সেখানে গিগ কর্মীদের গরম থেকে রক্ষা করার জন্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে ৷ তাঁদের জন্য কাজের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কথা বলেছে এনডিএমএ ৷ কর্মীদের জন্য আশ্রয়স্থল তৈরি করার কথা বলা হয়েছে ৷ তীব্র গরমে ঘুরতে হলেও তাঁদের যাতে কোনও শারীরিক সমস্যা না নয় সেটা সুনিশ্চিত করা এই নীতির অংশ ৷ নীতির অন্য একটি অংশে গিগ কর্মীদের সামগ্রিক উন্নতির জন্য পরিবেশগত পরিবর্তনের সুপারিশও করা হয়েছে ৷ তাঁদের উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে ৷
অপর্যাপ্ত তথ্য
গিগ কর্মীদের উন্নয়নে বা তাঁদের জন্য নীতি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে দরকার সংখ্যা-সংক্রান্ত বিষয়টি ৷ দেশে গিগ কর্মীদের সংখ্যা কতটা সেটা আগে জানা দরকার ৷ কিন্তু এখন সেটা জানার সুযোগ কম ৷ 2020 সালের শ্রমকোডে গিগ কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ৷ এর বছরখানেক বাদে ই-শ্রম পোর্টাল তৈরি করা হয়েছে ৷ গিগ কর্মীদের জাতীয় পর্যায়ের একটি ডেটাবেস তৈরি করতেই এমন উদ্যোগ ৷ তবে সেখানেও প্রবল সমস্যা আছে ৷ কয়েকটি রাজ্য এখনও এই বিষয়ে পারদর্শী হতে পারেনি ৷ উদাহরণ হিসেবে রাজস্থান সরকারের পোর্টালের কথা বলা যেতে পারে ৷ সেই পোর্টাল থেকে সাধারণ মানুষের তথ্য সংগ্রহের কোনও উপায় নেই ৷ এখান থেকেই স্পষ্ট, তথ্যের সংগ্রহ থেকে বিস্তারের কাজে দেশকে আরও বেশি পারদর্শী হতে হবে ৷

