'প্রথম' এআই নির্ভর ছবি 'টাইম ট্রাভেলার দ্য জেম' ! বাঙালি পরিচালকের কীর্তি দেখবেন কোথায় ?
মুভি গেম থেকে এআই নির্ভর ছবি- দর্শকের আগ্রহ কেমন খোলসা করলেন পরিচালক অরিজিৎ ভট্টাচার্য্য। শুনলেন ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি নবনীতা দত্তগুপ্ত ৷

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : April 3, 2025 at 5:35 PM IST
কলকাতা, 3 এপ্রিল: আসছে ভারতের 'প্রথম' এআই নির্ভর ছবি 'টাইম ট্রাভেলার দ্য জেম'। বানিয়েছেন একাধিক মুভি গেমের স্রষ্টা অরিজিৎ ভট্টাচার্য্য। 4 এপ্রিল দর্শকের দরবারে আসতে চলেছে 'টাইম ট্রাভেলার দ্য জেম'। ইউটিউব চ্যানেল ভার্চুয়াল ইনফোকম গেমস-এ আসছে এই ছবি ৷
'টাইম ট্রাভেলার দ্য জেম' নিয়ে অরিজিৎ বলেন, "এই ছবিটার জন্য কোনও অভিনেতা, পরিচালক, মেক আপ আর্টিস্ট, স্টুডিও কিছুই ছিল না। শুধু ছিল একটা কম্পিউটার, টেকনোলজি আর ক্রিয়েটিভিটি। পৌরাণিক কাহিনি থেকে সম্বল করে এই ছবিটি তৈরি করেছি। যেখানে অশ্বত্থামার মণি এক বড় ভূমিকা পালন করেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে অশ্বত্থামার মণিটা ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নিয়ে নেন। তাঁকে অভিশাপ দেন যতদিন না তিনি আবার কল্কি রূপে ফিরছেন ততদিন অশ্বত্থামা বেঁচে থাকবেন। এরপর ওই মণিটা ফিরে যায় চন্দ্রদেবের কাছে। চন্দ্রদেব পরবর্তীকালে সেটা তাঁর কন্যা চন্দ্রিমাকে দিয়ে দেন। চন্দ্রিমা সেটা ভাগ করে দেন বিভিন্ন সৈন্যদের কাছে যারা তাঁর মতো দেখতে। এরপর মণিটা কীভাবে নানা জায়গায় বিচরণ করে তা নিয়েই এই ছবি।"
অরিজিৎ আরও বলেন, "এর মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন সময়সীমা, সংস্কৃতিকেও তুলে ধরা হয়েছে। ইতিহাস, ভাষা সব নিয়েই অনেক পড়াশুনা করতে হয়েছে। এখানে গাড়ির চেজ, হেলিকপ্টারের চেজ, অ্যাকশন প্যাক সবই রয়েছে। একজন ডিটেকটিভ মহিলাকে কেন্দ্রে রেখে এই ছবি।" উল্লেখ্য, অরিজিতের আসন্ন এআই ছবিতে রয়েছে একটা পূর্ণাঙ্গ গল্প। রয়েছে একাধিক চরিত্র, অ্যাকশন, আসল সিনেমার মতো ক্যামেরা মুভমেন্ট। গ্রাফিক্স, ভিএফএক্স, ডায়লগ, এক্সপ্রেশন সবই আছে। প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর নানান কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে এই ছবিতে।
অরিজিতের কথায়, "একেবারে সিনেমার মতো করে বানানো হয়েছে। 'অশ্বত্থামা দ্য ইমমর্টাল' গেমটা 2007 সালে নিয়ে আসার অনেক পরেই এই ছবিটার গল্প আমি লিখলাম। গেমটা আসার পরেই ভাবি কেন এটা নিয়ে একটা এআই নির্ভর ছবি হবে না? ভারতের প্রথম আরপিজি ( RPG) বা রোল প্লে গেম হল 'অশ্বত্থামা দ্য ইমমর্টাল'। বিভিন্ন ভয়েস, এক্সপ্রেশন এবং বিভিন্ন টোনে কথা বলেছে এখানকার চরিত্রগুলো। বিভিন্ন ধরনের সাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছে। আর তা সবই জেন এআই-তে তৈরি। ছবিটা একটা ইউনিক স্টোরি লাইন ধরে এগিয়েছে। রুপোলি পর্দার ছবিতে যেমন কাট শট থাকে। এই ছবিতেও কাট শট আছে। গল্পের শুরু দ্বাপর যুগ থেকে।"
তিনি আরও বলেন, "মুভমেন্ট, গ্রাফিক্স, ভিএফএক্স ব্যবহার করেছি সব ধরনের এআই টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে। এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিভিন্ন প্রম্পট ব্যবহার করা হয়েছি।"
কেন ভারতের প্রথম এআই নির্ভর ছবি বলছেন?
এর আগেও বেশ কিছু এআই সিনেমার ক্লিপিংস ধরা দিয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "অনেকের 3/4 মিনিট এমনকী 7/8 মিনিটেরও ভিডিয়ো ক্লিপিংস আমি দেখেছি। কিন্তু সেখানে কোনও স্টোরি লাইন দেখতে পাইনি। পৌরাণিক কোনও কাহিনির চরিত্র যেমন কর্ণ, অর্জুন, বৃহন্নলা, কৃষ্ণের জীবনের কোনও ঘটনা সেখানে দেখা যায়নি। কিছু ভিডিয়ো ক্লিপিংস পরপর সাজিয়ে এইআই ফরম্যাটে বানানো হয়েছে । তাদের জীবনের কোনও ঘটনা আমি দেখতে পাইনি।"
তিনি আরও বলেন, "আমি আমার ছবিটিকে ভারতের প্রথম এআই বেসড মুভি বলছি কারণ- এই স্টোরিটা সম্পূর্ণভাবে ইউনিক। পৌরাণিক কাহিনির উপর বির্ভর করে সম্পূর্ণটা আমার লেখা। এখানে রিয়েল ক্যামেরা মুভমেন্ট, এক্সপ্রেশন, গাড়ি চালানো, হেলিকপ্টার চালানো সবই দেখানো হয়েছে। সাতটা বিভিন্ন গল্পকে এক জায়গায় করে এই ছবিটা বানানো। 84 মিনিটের এই ছবি। আমি আজ অবধি এই সময়সীমার কোনও পূর্ণ গল্পনির্ভর ছবি ভারতের কোনও ইউটিউব চ্যানেলে দেখিনি। তাই এই ছবিটা ভারতের প্রথম এআই নির্ভর ছবি। আমার পাইপলাইনে আছে সায়েন্স ফিকশন স্টোরি 'ধর্মযুদ্ধ'। আমরা সেটার ট্রেলার অনেকদিন আগে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখনও রিলিজ হয়নি। তাই সেটাকে প্রথম ভারতীয় এআই নির্ভর ছবি আমরা বলতে পারব না। ওটা আমাদের পাইপলাইনে আছে। যেটা শুক্রবার আসতে চলেছে তাই সেটাকে আমরা ভারতের প্রথম এআই বেসড মুভি বলছি। পাশাপাশি অবশ্যই এটা বাংলারও প্রথম এআই বেসড মুভি।"
অরিজিতের কথায়, "এআই মাধ্যমে কিছু ক্লিপস সাজিয়ে প্রকাশ করলেই প্রথম ছবি দাবি করা যায় না। 'মহাভারত' বলে যে ক্লিপিংসটা সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে তার নির্মাতা হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘন করেছেন। সরাসরি নাম ব্যবহার করা যায় না হাইকোর্টের অনুমতি ছাড়া। কোনও মহাকাব্যের নাম ব্যবহার করা যায় না আদালতের নির্দেশ ছাড়া। শর্ট ক্লিপ কোনওদিন মুভি হতে পারে না।"
অরিজিতের পড়াশোনা
একটু গোড়ার দিকে গেলে দেখা যায়, অরিজিৎ ভট্টাচার্য্য ক্লাস টুয়েলভ অবধি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন ৷ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেয়েও কিছুদিন ক্লাস করার পর ছেড়ে দেন। পড়াশুনা শুরু করেন ইকনমিক্স, স্ট্যাটিস্টিক্স এবং অঙ্ক নিয়ে। কেননা নিজের উদ্যোগে ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। পরে এম.সি.এ করেন। স্কুল জীবন থেকেই কমিক্স আঁকতেন এবং লিখতেন৷ নিজেই তৈরি করেন সুপারহিরো ক্যারেক্টার। ক্লাস টুয়েলভে পড়াকালীনই বানান গেম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি 'ভার্চুয়াল ইনফোকম'। যেখানে নিয়ে আসেন অগণিত মুভি গেম। জিৎ-শুভশ্রীর 'বস-2', প্রিয়াঙ্কার 'নীলাঞ্জনা'-সহ একাধিক মুভি গেম।
অরিজিতের কাজ
মুকেশ খান্নার সঙ্গে 'শক্তিমান' সহ আরও বেশ কয়েকটি গেমের স্রষ্টা অরিজিৎ ভট্টাচার্য্য। জিৎ এবং শুভশ্রীর ' বস 2', প্রিয়াঙ্কা সরকারের 'নীলাঞ্জনা' ছাড়াও কিংবদন্তিদের 'ফাইট', 'অশ্বত্থামা' ইন্ডিয়ার প্রথম আরপিজি, 'এআই ফাইট অফ দ্য লেজেন্ডস', বাংলাদেশের প্রথম মুভিনির্ভর গেম 'বিজলি', ভুটানস ফার্স্ট রেসিং গেম রয়েছে তালিকায়। এছাড়াও স্মার্ট সিটি সলিউশন তৈরি করা থেকে এআই, ডিপটেক এন অ্যাপ্লিকেশন, একাধিক জেনারেল এআই অ্যাপ্লিকেশন এবং মিউজিক ভিডিয়ো স্রষ্টার সঙ্গে শর্ট ভিডিয়োতে সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট পার্টনার হিসাবে ইন্টেলের সঙ্গে কাজ করেন তিনি। শুক্রবার 'টাইম ট্রাভেলার ফর জেম' মুক্তি পাওয়ার পর আসবে তাঁরই তৈরি 'ব্রোকেন'।
উল্লেখ্য, যুগ যখন জেন এআই-এর প্রায় দখলে তা হলে কি দিন ফুরোতে চলেছে অভিনেতা, সঙ্গীত শিল্পীদের? উত্তরে অরিজিৎ বলেন, "কথাটা ফেলে দেয়া যায় না। আজকাল এআই-এর প্রতি ঝোঁক বাড়ছে সব বয়সের মানুষদের।" তবে, ব্যতিক্রমী কথাও বলেন তিনি।
শিশুদের অতিমাত্রায় ফোন, গেমের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এক ঘণ্টার বেশি ওদের দেখা উচিত না। এর বেশি সময় ধরে দেখলে ওদের নিউরনের ক্ষতি হয়। সেই জায়গায় বড় কোনও ডিভাইসে দেখুক। তাতে অতটা ক্ষতি হবে না। আর বাবা-মাকে দেখতে হবে সে কী দেখছে। একইসঙ্গে দেখার সময়ে তার যে লেখাপড়াটাও আছে সেটা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। তবে, ক্রিয়েটিভিটি থাকলে সেটাকে অবজ্ঞা করা চলবে না। যেমন ধরুন কারওর গেম বানানোর ইচ্ছা থাকতে পারে, কারওর আঁকা, কারওর বা অন্যকিছুতে ঝোঁক থাকতে পারে। তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিলে চলবে না।"
পাশাপাশি জেন এআই-কে পেশা বানাতে গেলে কোন বিষয়ে পড়াশুনা করতে হবে সেই বিষয়েও বিশদে জানান তিনি ৷ জানান জেন এআই প্রযুক্তি কীভাবে মানুষকে রোজগারের পথ দেখাবে।

