সিনেমায় নাটকীয়তা অপছন্দ, তবে নাটকের প্রতি আলাদা শ্রদ্ধা ছিল সত্যজিতের- গবেষক দেবাশিস
নাটক দলের লোগো, প্রচ্ছদ ও নাটকের জন্য ম্যাগাজিনে লিখেছেন তিনি। নাটকের প্রতি শ্রদ্ধা কীভাবে সত্যজিৎতের চলচ্চিত্র জীবনে জড়িয়ে ছিল, উঠে এল ইটিভি ভারতে ৷

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : May 2, 2025 at 11:57 AM IST
চন্দননগর, 2 মে: বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার পরিচালক, শিল্পী, সুরকার ও সাহিত্যিক হিসাবে জগৎ জোড়া নাম সত্যজিৎ রায়ের। তাঁর পরিচালিত প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই নানান বার্তা দিতে চেয়েছেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি নাটক ভালবাসতেন। অবশ্য সিনেমার অভিনয়ে নাটকীয়তা পছন্দ করতেন না ঠিকই। একাধিক নাট্য ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল তাঁর ।
রীতিমতো নাটক দেখতেন। সেখানে থেকেই অনেক নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রী সিনেমায় অভিনয় করেছেন। তার অন্যতম উদাহরণ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সত্যজিৎতের সিনেমার মধ্যে সরাসরি নাটক যাত্রা দেখা গিয়েছে। একটি নাটকে তিনি মঞ্চ সজ্জা করেছেন। নাটক দলের লোগো, প্রচ্ছদ ও নাটকের জন্য ম্যাগাজিনে লিখেছেন তিনি। নাটকের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে কীভাবে সত্যজিৎতের চলচ্চিত্র জীবনে জড়িয়ে ছিল তা নিয়ে ইটিভি ভারততের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় গবেষক দেবাশিস মুখোপাধ্যায় তুলে ধরলেন একাধিক অজানা তথ্য ৷
প্রশ্ন: সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র জীবনে নাটক তাঁর কাজে, তাঁর লেখা, তাঁর চলচ্চিত্রে এসেছে কীভাবে?
গবেষক দেবাশিস: প্রথম জীবনে শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন সুকুমার রায়ের দেখা যায় 'হ য ব র ল' নাটকে অভিনেতাদের সাজিয়ে দিয়েছিলেন। সত্যজিতের প্রথম জীবনে শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন রামকিঙ্কর বেইজ নাটক করাতেন ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে। সেখানে ক্লিফোর্ড ব্যাক্সের নাটক 'দ্য পোয়েটেস্টার্স অফ ইসপাহান'এর বঙ্গানুবাদ করে মঞ্চস্থ করার চিন্তাভাবনা করেন। তাতে অন্যতম চরিত্রে সত্যজিৎকে অভিনয়ের জন্য বলেছিলেন। মঞ্চ ভীতির কারণে তিনি রাজি হননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেও ছিলেন সে কথা।
সুকুমার রায় কে নিয়ে যখন তথ্যচিত্র করেছিলেন সেই তথ্যচিত্রে দুটি নাটকের অংশ আসে একটি হল 'ঝালা পালা' অপরটি 'লক্ষণের শক্তিশেল' ৷ এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রে "বাল্মিকী প্রতিভা" নৃত্যনাট্য পরিচালনা করেছিলেন সত্যজিৎ।বাক্স বদল এ একটি নাটকের অংশ দেখা গিয়েছিল। যেখানে অপর্ণা সেন অভিনয় করছেন । ছবির পরিচালক নিত্যানন্দ দত্ত হলেও এই অংশটি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয়।

| 1951 সালে বিকাশ রায় পরিচালিত রবীন্দ্রনাথের 'তপতী' বলে একটি নাটকে স্টেজ ডেকোরেশনে সত্যজিৎ কাজ করেছিলেন। উনি অনেক নাটক দেখেছিলেন । তার বন্ধু-বান্ধবের চিঠিতে বাংলা নাটকের নানান বিষয়ের ভালো-মন্দ আলোচনা করেছেন সত্যজিৎ রায়। যখন চলচ্চিত্র পরিচালনা করতেন তখন বলতেন চলচ্চিত্রে নাটকীয় অভিনয় তিনি পছন্দ না । সেটা হওয়া উচিত নয়। তার চলচ্চিত্রের মধ্যে নাটক থেকেই একাধিক অভিনেতা এসেছেন। দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছেন তাঁরা। যদি হিসেব করে দেখা যায় তার পরিচালনায় 36 টি চলচ্চিত্রের মধ্যে 28টি সিনেমায় নাটকের অভিনেতারা অভিনয় করেছেন। |
সত্যজিৎ রায়ের ছবিতেও কখনও সরাসরি, বিক্ষিপ্ত বা পরোক্ষ ভাবে নাটক দেখা গেছে । উদাহরণ হিসাবে দেখা যায় 'পথের পাঁচালীতে' যাত্রা দেখা, অপুর সংসারে 'সধবার একাদশী' নাটক দেখে ফিরে দুই বন্ধুর মধ্যে যে সংলাপ দেখানো হয়েছিল ।এছাড়াও 'দেবী' সিনেমায় সরাসরি নাটক দেখানো হয়েছে। 'মণিহারা' সিনেমাতে তিনি যাত্রার সংলাপকে আলাদা মাত্রা দিয়েছেন । 'এনিমি অফ দ্য পিপল' নাটক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে 'গণশত্রু' করেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের গল্প ও চিত্রনাট্য থেকে অসংখ্য নাটক হয়েছে । যেমন (ফেলুদার গল্প থেকে নাটক হয়েছে কিছুদিন আগেও)। সত্যজিৎ রায়ের গল্প ও উপন্যাস থেকে নাটক হয়েছে এরকম উদাহরণ হিসেবে বলা যায় 'প্রফেসর শঙ্কু ও রোবু' , 'গুপী গাইন বাঘা বাইন', 'অপ্সরা থিয়েটারের মামলা' , 'ব্রজখুড়োর সবুজ বাক্স' ও 'গোঁসাইপুর সরগরম'-সহ প্রায় 16টির উপর নাটক হয়েছে।

সত্যজিৎ রায় নিজে অভিনয় করবেন বা নাটক মঞ্চস্থ করাবেন সে ব্যাপারে কোন আগ্রহ ছিল না তাঁর। সত্যজিৎ গবেষক দেবাশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, "ওঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আপনার নাটক করার ইচ্ছা নেই ? তার উত্তরে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, আমি উৎপল দত্তের 'টিনের তরোয়াল' দেখেছি । 'টিনের তরোয়াল' বাংলা নাটকের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছেছিল। তিনি বলেছিলেন, আমি ওই জায়গায় পৌঁছতে পারব না । নাটক পরিচালনা করা আমার জায়গা নয়।"
প্রশ্ন: নাট্যকারদের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্ক কেমন ছিল তার?
গবেষক দেবাশিস: নাট্যকারদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল সত্যজিতের। নান্দিকারের অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। নান্দিকারের লোগো সত্যজিৎ রায়ের বানানো । নান্দিকারের 50 বছরের যে সুভেনিওর বেরিয়েছিল তাতে সত্যজিতের লেখা ছিল। বিভাস চক্রবর্তীর সঙ্গেও খুব ভালো সম্পর্ক ছিল তার ।সত্যজিৎ রায় নাটক দেখতেও যেতেন। 'ঘরে বাইরে' অনেক বছর ধরে ছবি করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তা হচ্ছিল না। তিনি বিমলা চরিত্রের কাউকে পাছিলেন না । শম্ভু মিত্র যে 'গ্যালিলিও' নাটকে অভিনয় করেছিলেন সেই নাটকে স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের অভিনয় দেখেই 'ঘরে বাইরে' বিমলাকে নির্বাচন করেছিলেন সত্যজিৎ।

সন্তোষ দত্ত ও কানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্বাচন করেছিলেন তাদের নাটক দেখে। নাটক দেখে অভিনেতাদের কাস্টিং করার কথা মনে রাখতেন। তিনি এমনকি তার সিনেমার একাধিক প্রধান চরিত্রে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় । তিনি তো নাটক থেকেই এসছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শিশির ভাদুড়ীর ভালো সম্পর্ক ছিল। তাদের কথাবার্তায় শিশির ভাদুড়ীর সম্পর্কে জানার আগ্রহী ছিলেন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের ফিল্মের চিত্রনাট্য নিয়ে অনেক নাটকও হয়েছে 'পথের পাঁচালী' থেকে 'আগন্তুক' পর্যন্ত অনেক দল বাংলা নাটক করেছে। এমনকি বাংলাদেশও হয়েছে।
প্রশ্ন: এত বছর পরেও সত্যজিৎ এখনও কেন প্রাসঙ্গিক?
গবেষক দেবাশিস: যতদিন মানুষের মধ্যে বিবেক জাগ্রত থাকবে ততদিন সত্যজিৎ প্রাসঙ্গিক থাকবেন। এখনও কেন্দ্রীয় সরকার বলুন রাজ্য সরকার বলুন তাদের যে সমালোচনা করা হয়। তারা যে যোগ্য সেটা তো আমরা 'হীরক রাজার দেশে' ছবিতেও দেখেছি । একাধিক সংবাদপত্রে সপ্তাহের চার-পাঁচ দিন বিভিন্ন খবরে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা সংলাপ ব্যবহার করা হয়। সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে । সত্যজিৎ অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। এখনও আমরা কোন সমালোচনা করতে গেলে 'গণশত্রু'র সংলাপ ব্যবহার করি। এটা আমাদের স্মৃতিতে আমাদের মননে হৃদয়ে এমনভাবে সত্যজিৎ জড়িয়ে আছে ।
সেই কারণেই বর্তমান ঘটনার সঙ্গে আমরা সত্যজিৎ রায়ের কাজকে মেলাতে পারি । এ থেকে বোঝা যায় উনি সময়ের চাইতে কতটা এগিয়ে ছিলেন । সেই কারণেই সত্যজিৎ রায়ের ছবি যখন নতুন করে রিলিজ করে । 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' বা 'নায়ক' এর মত ছবির প্রিন্ট রিস্টোর করা হয় এখনও তার ছবি মানুষ আগ্রহ ভরে দেখছেন । যত সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখানো হবে তখনই বোঝা যাবে আমাদের চলচ্চিত্র এগিয়েছে না পিছিয়েছে।

