স্কুলের র্যাগিং প্রাণ কেড়েছে কিশোরের ! কেন্দ্র-রাজ্যের কাছে কোন আর্জি রূপাঞ্জনার ?
অভিযোগ স্কুলের বন্ধুদের র্যাগিং-বুলিংয়ের শিকার হয়ে অকালে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়ে বছর ষোলোর শৌর্য (রাজুল) সরকারকে।

By ETV Bharat Entertainment Team
Published : October 8, 2025 at 5:33 PM IST
কলকাতা, 8 অক্টোবর: স্কুলের বন্ধুদের র্যাগিং এবং বুলিংয়ের শিকার হয়ে চলতি বছর 7 জুলাই অকালে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়ে বছর ষোলোর শৌর্য (রাজুল) সরকারকে। সম্প্রতি তার বাবা সৌমিক সরকার সোশাল মিডিয়ায় লাইভে ছেলেকে নিয়ে স্মৃতি আওড়ান ৷ অভিযোগ করেন কীভাবে দিনের পর দিন স্কুলে বন্ধুদের কাছ থেকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে আহত হতে হয়েছে তাঁকে। বদলে বন্ধুদের কোনওদিন কোনও আঘাত করেনি দশম শ্রেণীর ছাত্র শৌর্য। অটিজম থাকার কারণে বন্ধুরা প্রতিনিয়ত তাঁকে অবজ্ঞা, অবহেলায় ভরিয়ে রাখত। এমনকী মারধোরও করত। যা বাড়িতে এসে বলায় তার বাবা মা স্কুলকে জানায়। স্কুলও এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি 7 জুলাই। 16 অগস্ট 16 বছরের জন্মদিন পালনের আগেই চলে যেতে হল শৌর্যকে। নিজেই চলে গেল সে।
শৌর্যর এভাবে চলে যাওয়ায় যারা তাঁদের আদরের রাজপুত্রটিকে বুলি করত তাদের অভিভাবকদের দিকেই আঙুল তুলছেন শৌর্যর বাবা সৌমিক সরকার। বাদ দিচ্ছেন না নিজেদেরও। কেননা সেই মনের শক্তি হয়ত তাঁরা শৌর্য ওরফে রাহুলকে দিতে পারেননি যে অবহেলিত, অত্যাচারিত হয়েও নিজের জায়গায় স্থির থাকতে হয়।... শৌর্যর বাবার লাইভের ভিত্তিতে অভিনেত্রী রূপালি ভট্টাচার্য জনৈক ব্যক্তির রাজুলকে নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, "শেম অন প্যারেন্টিং'। এই ব্যাপারে অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্র ইটিভি ভারতে বলেন, "শৌর্যর এভাবে চলে যাওয়া এই সমাজের ক্ষতি। আমি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রকে আবেদন জানাই সব স্কুলকে যেন এই দিকে তাঁরা নজর দিতে বলেন এবং যেন একটা স্ট্রিক্ট রেগুলেশন বেরোয় রাজ্য এবং কেন্দ্র থেকে যাতে এই ধরনের বুলিং-র্যাগিং বন্ধ করা হয়।"
রূপাঞ্জনা আরও বলেন, "র্যাগিং বুলিং আজ থেকে নয়, বহুযুগ থেকে চলে আসছে। মানুষকে ছোট দেখানো, র্যাগিং, বুলিং এগুলো বিশেষ করে স্কুলে চলছে অনেকদিন থেকেই। আমার কথা হল, যে সব নামী দামী স্কুলে বড় বড় করে লেখা থাকে 'নো টলারেন্স টু র্যাগিং' সেখানে টিচাররা কি দেখেন না কী চলছে আদতে? স্কুলের কোণায় কোণায় এ সব স্কুলে সিসিটিভি ক্যামেরা ছড়িয়ে থাকে, সেখানে কি টিচাররা বাচ্চাদের গতিবিধি ঠিক বুঝতে পারেন না? এখন নর্মাল লাইফে সবাইকে নিয়ে আসার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে এটুকু সহানুভূতি, সহমর্মিতা তো থাকা উচিত। প্রত্যেক বাবা-মায়েরই বাচ্চাদের শেখানো উচিত কারওকে যেন তারা ছোট করে না দেখে। ভালো মন্দ বাবা-মাকেই শেখাতে হবে। একইভাবে অনেক বাচ্চারা স্কুলের সমস্যা বাড়িতে বলতে চায় না। কিন্তু তাদের বাবা-মাদের সেটা যেচেই শোনা উচিত। আমার ছেলের সঙ্গেও এসব ঘটেছে অনেকসময়। আমরা নানা সময়ে স্কুলের সঙ্গে সেটা শেয়ার করেছি। একটা ক্লাসরুমে ত্রিশের উপর বা তার কম স্টুডেন্ট থাকতে পারে। আমার মনে হয় অনেক টিচারের মধ্যে বাচ্চা কন্ট্রোলের ক্ষমতা থাকে না। তারা হয়ত চেঁচিয়ে ফেলেন। আমি সবার কথা নয়, কিছু কিছু টিচারের কথা বলছি। তাঁদের ধৈর্য ধরতে হবে। ক্লাসে এরকম কিছু ঘটলে যে বুলিং করছে আর যাকে করছে তাদের উগয়ের বাব-মাকে ডাকা উচিত এবং বলা উচিত।"
রূপাঞ্জনার কথায়, " আজকাল ভয় লাগে যে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো মানে নতুন আবার কী শিখে আসবে। ছোটরা ভালো মন্দ বুঝতে পারে না ৷ আমাদের শেখাতে হবে। আমরা ওদের মানবিকতার দিকটা যদি কেড়ে নিই তাহলে তো ভালো হবে না। যারা বুলি করছে যারা উসকে দিচ্ছে দুজনেই দোষী। বেশিরভাগ স্কুলে বড় বড় অক্ষরে 'নো টলারেন্স টু বুলিং' লেখা থাকলেও তা মনিটর করা হয় না। সিসিটিভিতে সাউন্ডও থাকা উচিত। কোন বাচ্চা কোন বাচ্চাকে কী খারাপ কথা বলছে সেটাও শোনা দরকার স্কুলের। না হলে শৌর্যর মতো এহেন ঘটনা আরও ঘটবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শৌর্যর বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনও ভাষা আমার কাছে নেই। তাঁরা লড়াই চালিয়ে যান।"
প্রসঙ্গত, রাজুল বা শৌর্যর বাবার লাইভ শেয়ার করে জনৈক মধুমিতা চক্রবর্তী সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, "একটি অসাধারণ প্রতিভাবান ছেলে ষোল বছরে চলে গেল স্কুলে র্যাগিং বা বুলিং-এর শিকার হয়ে। যামিনীরত্ন সম্মান, চারুরত্ন সম্মান, বঙ্গগৌরব সম্মানের অধিকারী শৌর্যর আঁকা ছবি আর স্থাপত্যশিল্পের প্রদর্শনী অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, বিড়লা আর্ট গ্যালারিতে অনেকেই দেখে থাকবে দিনের পর দিন, এমন বাদ্যযন্ত্র নেই যা সে নিপুণভাবে বাজাতে পারত না, আর কিওকুশিন ক্যারাটেতে বরাবরের চ্যাম্পিয়ন, শুধু তার দুর্ভাগ্য এই যে সে এক বিশেষ শিশু। অন্যদের মত স্বাভাবিক বা সাধারণ নয়। শৌর্য ছিল অটিস্টিক।
সামাজিক মেলামেশায় আর অন্যান্য অতি ছোটখাটো ব্যাপারে হয়তো কিছু অসুবিধা ছিল তার। এই কারণে স্কুলের 'বন্ধু'রা তাকে নানাভাবে উত্যক্ত করত, 'তুই মাথামোটা', 'তুই ক্যাবলা', 'তুই যে কেন বেঁচে আছিস', আর সেইসবে থেকে তাকে 'পজিটিভ' রাখার লড়াইতে মরিয়া ছিলেন বাবা আর মা। হার হয় তাঁদের। 'বুলি'রা, সে তারা শিশু হলেও এতটাই শক্তিধর। হাল ছেড়ে দিয়ে চলে গেল রাজুল। একথা লিখতেও রাগে আমার হাত কাঁপছে, এমন শিশু কারা তৈরি করে, যে শিশুরা সম্মিলিতভাবে আরেকটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়! ষোলো বছর বয়সেও যাদের বিবেকগঠন হল না! খালি মার্কসের পেছনে দৌড়োনো আর মানবিকতার শিক্ষাকে অবহেলা করা এক ছোঁয়াচে অসুখের মত ঘৃণ্য তাদের অভিভাবকের দল, যারা ভবিষ্যতের ক্রিমিনাল ব্রিগেড তৈরি করছে। আর স্কুলগুলোর দায় নেই কোনো? 'বুলি'রা এতটা বাড়তে সাহস পায় কেমন করে !"
রাজুলের বাবা-মা এখন নেমেছেন আইনি লড়াইতে। সারাটা জীবন দিয়ে এই লড়াইয়ের শেষ দেখেই ছাড়বেন শৌযের বাবা-মা!

