ETV Bharat / bharat

পূর্বপুরুষের পথে ধান-বাজরার সংরক্ষণ, সম্মানীয় ডক্টরেট পেলেন 'মিলেট কুইন'

ধান ও বাজরা সংরক্ষণে সাফল্য ৷ রাষ্ট্রপতির হাত থেকে ডক্টরেট সম্মান পেলেন ওড়িশার আদিবাসী মহিলা কৃষক ৷ কেমন ছিল তাঁর এই যাত্রা ?

Millet Queen RAIMATI GHEURIA
মিলেট কুইন ডঃ রাইমতি ঝিউরিয়া (ইটিভি ভারত)
author img

By ETV Bharat Bangla Team

Published : December 5, 2024 at 9:24 PM IST

4 Min Read
Choose ETV Bharat

কোরাপুট (ভুবনেশ্বর), 5 ডিসেম্বর: সম্মানীয় ডক্টরেট পেলেন প্রত্যন্ত গ্রামের আদিবাসী মহিলা কৃষক রাইমতি ঝিউরিয়া ৷ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে তিনি এই সম্মান গ্রহণ করেন ৷ ওড়িশার কোরাপুটের প্রত্যন্ত নুয়াগুড়া গ্রামের বাসিন্দা রাইমতির জন্য হাততালিতে ফেটে পড়ল সভাঘর ৷ শুধু তাঁর জন্য় নয়, ভারতের সমৃদ্ধ এই বাজরার ঐতিহ্য সংরক্ষণে তিনি যে বীজ বপন করেছিলেন, সেই প্রত্যেকটি বীজের জন্যও ৷

কোরাপুটের দুর্গম পাহাড় থেকে ওড়িশার কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন- রাইমতির এই যাত্রা তাঁর পরিশ্রম, ঐতিহ্য এবং উদ্ভাবনের সাক্ষী । রাজ্যের বাজরা মিশনের জন্য বৃহস্পতিবার, 5 ডিসেম্বর একটা ঐতিহাসিক দিন ৷ নিজের সম্প্রদায়ের কাছে 'মিলেটের রানি' হিসেবে পরিচিত রাইমতি ৷ দেশের এই প্রাচীন শস্যের ফলনের জন্য কয়েক দশক ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন রাইমতি ৷

কোরাপুট জেলার কুন্ডুরা ব্লকের বাসিন্দা রাইমতি ৷ এই জেলাটি তার জীববৈচিত্র্য এবং আদিবাসীদের নিজস্ব চাষাবাদের জন্য বিখ্যাত । এখানকার মাটি উর্বর হলেও ফসল ফলানোর যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য ৷ এদিকে কৃষির আধুনিকতার দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের ধান ও বাজরা ৷ তাই রাইমতি তাঁদের চিরাচরিত ধান ও বাজরা চাষ করবেন বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রতিজ্ঞা করলেন ৷ তাঁর পূর্বপুরুষেরা যে পদ্ধতিতে চাষবাস করেছেন, তা-ই অনুসরণ করেন এই আদিবাসী মহিলা ৷

কোরাপুটের নিজস্ব ও ঐতিহ্যবাহী 72 রকমের ধান এবং 30 রকমের বাজরা সংরক্ষণ করেছেন তিনি ৷ এর মধ্যে রয়েছে পুরস্কার পাওয়া বাটি মান্ডিয়া এবং মামি মান্ডিয়া ৷ এই বিশাল পথ পেরিয়ে আজ রাইমতি একজন কৃষক, প্রশিক্ষক এবং নেতাও । এই শস্যগুলি শুধুমাত্র যে পুষ্টিগুণে ভরপুর, তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় এরা সমান শক্তিশালী ।

Millet Queen RAIMATI GHEURIA
রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর থেকে ডক্টরেট সম্মান নিচ্ছেন রাইমতি (ইটিভি ভারত)

মহিলা কৃষকদের জন্য রোল মডেল রাইমতি :

রাইমতির অবদান তাঁর নিজের ক্ষেত্রের বাইরেও প্রসারিত । তিনি এখন কৃষক উৎপাদনকারী সংগঠন (এফপিও) বামনদাই ফার্মার্স প্রোডিউসার্স কোম্পানি লিমিটেডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৷ এই এফপিও কোম্পানিটি তাঁর নিজের গ্রাম নুয়াগুড়ায় অবস্থিত ৷

এটা প্রতিষ্ঠা করতে রাইমতি সাহায্য করেছিলেন । এই কোম্পানিতেই এখন জৈব-সার, জৈব-কীটনাশক এবং বাজরা নির্ভর মূল্য সংযোজন পণ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে । তাঁর নির্দেশনায় এই কোম্পানিটি শ'য়ে শ'য়ে কৃষক (বিশেষত নারীদের) জৈবিক উপায়ে কৃষিজ পণ্য উৎপাদন অর্থাৎ অরগ্যানিক ফার্মিং করছে ৷ সেই পণ্যগুলি কার্যকরভাবে বাজারজাত করতে সক্ষম করেছে ।

সম্ভবত, তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সফলতা গ্রামের খামার স্কুল প্রতিষ্ঠা । রাইমতির পরিবারের দান করা জমিতে 2012 সালে এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা হয় ৷ এই স্কুলে এখন স্থানীয় জেনেটিক উৎসগুলির গুরুত্ব, তার সংরক্ষণ, দীর্ঘস্থায়ী কৃষিকাজের প্রক্রিয়া বিষয়ে কৃষকদের পাঠ দেওয়া হয় ৷

স্বীকৃতি ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব:

রাইমতির কাজ বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য প্রশংসা অর্জন করেছে । 2012 সালে জিনোম সেভার কমিউনিটি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল তাঁর দল ৷ তাঁরই প্রচেষ্টা স্বামীনাথন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সমর্থন পেয়েছে । ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর প্রশান্ত পারিদার মতে, জৈব পদ্ধতিতে বা অর্গ্যানিক উপায়ে বাজরা চাষে রাইমতি যেভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, সেটাই তাঁকে বিশ্বের ঐতিহ্যপূর্ণ কৃষি পদ্ধতির জনক করে তুলেছে ৷

দিল্লিতে হওয়া জি-20 শীর্ষ সম্মেলনেও তাঁর স্বর পৌঁছেছে ৷ সেখানে তিনি কোরাপুটের ঐতিহ্যপূর্ণ বিভিন্ন প্রকারের বাজরা গুরুত্ব তুলে ধরেছেন ৷ তাঁর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা বিশ্বের বাজরা কৃষকদের আশার আলো দেখিয়েছে ৷ বিশেষ করে 2023 সালে ৷ রাষ্ট্রসংঘ এই বছরটিকে আন্তর্জাতিক বাজরা বর্ষ বলে ঘোষণা করেছিল ৷

কৃষি আধিকারিক তাপসচন্দ্র রায় বলেন,"বিশ্বে বাজরার উদযাপন চলছে ৷ এক্ষেত্রে রাইমতি একটি উজ্জ্বল উদাহরণ ৷ চিরাচরিত জ্ঞান কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী কৃষির ভবিষ্যৎ গঠন করতে পারে, তা করে দেখিয়েছেন রাইমতি ৷ কোরাপুটের বাজরা বিশ্বের মঞ্চে একটা স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে ৷

ডক্টরেট পাওয়ার মুহূর্তে রাইমতি :

রাইমতির জন্য এই সম্মানীয় ডক্টরেট প্রাপ্তি ছিল একটি গভীর আবেগময় মুহূর্ত । চোখ জলে ভরে গিয়েছিল তাঁর ৷ তিনি বলেন, "আমি কল্পনাও করিনি যে আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে কাজ করেছি তা একদিন আমাকে এমন একটি মঞ্চে নিয়ে আসবে । এই সম্মান আমার একার নয়- এটি কোরাপুটের মাটির এবং সেই প্রত্যেক কৃষকের, যাঁরা আমাদের ঐতিহ্যের শক্তিকে বিশ্বাস করেন ৷"