আমেদাবাদের শিক্ষা, বিমানযাত্রীদের বিমা করানোয় জোর বিশেষজ্ঞদের
বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, সরকারি নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে যাত্রীদের নিজে থেকেই বিমা করানো উচিত। খরচও তেমন বাড়বে না বলেই তাঁদের অভিমত ।

Published : June 15, 2025 at 9:25 AM IST
সৌরভ শুক্লার প্রতিবেদন
আমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনার পর আরও একবার আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠল । পাশাপাশি যাত্রীরা কেন বিমান যাত্রার সময় বিমা নিতে চান না সে প্রশ্নও উঠছে । বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশই মনে করছেন, সরকারি নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে যাত্রীদের নিজে থেকেই বিমা করিয়ে নেওয়া উচিত । খরচও তেমন বাড়বে না বলেই তাঁদের অভিমত ।
কেয়ার এজ গ্রুপের বিএফএসআই রিসার্চের সহ-অধিকর্তা সৌরভ ভালেরাও ইটিভি ভারতকে জানান, উড়ান সংস্থাগুলি নিজেরাই বিমা করিয়ে রাখে। প্রতিটি বিমানের জন্যও আলাদা করে বিমা করানোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু যাত্রীদের উচিত নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন হওয়া। সংস্থাগুলি বোঝা কমাতে অনেক সময় বিমার একটি অংশ অন্য কোনও সংস্থার সঙ্গে ভাগ করে নেয় । সে ক্ষেত্রে কোনও দুর্ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট যাত্রী কত টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ পাবেন সেটা নির্ভর করছে ওই সংস্থার সঙ্গে উড়ান সংস্থার সমঝোতা বা চুক্তির উপর । কিন্ত নিজের বিমা থাকলে এই সমস্যায় পড়তে হবে না ।
সময়ের প্রয়োজন
অনেক ধরনের বিমার ব্যবস্থা রয়েছে । আকাশপথে যাত্রার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা খুব বেশি । এ কথা মাথায় রেখে যাত্রীদের বিমার আওতায় যাওয়া উচিত । বিষয়টি বোঝাতে রেল সফরের উদাহরণ দেন এই বিশেষজ্ঞ । তিনি জানান, রেলে যাত্রার সময় বিমা করিয়ে রাখলে সেই বাবদ যাত্রীর প্রাপ্য তাঁর নমিনিকে দেওয়া হয় । যদি দুর্ঘটনায় তাঁরও মৃত্যু হয়ে থাকে তাহলে তাঁর আইনি উত্তরাধিকারীকে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয় ভারতীয় রেল ।
12 জুন আমেদাবাদের সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি ভেঙে পড়ে । বিমানে 242 জন ছিলেন । তাঁদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সকলেরই প্রাণ গিয়েছে । বিমানটি পড়ুয়া চিকিৎসকদের হস্টেল এবং ডাক্তারদের আবাসনের উপরে ভেঙে পড়ে । সেখানে থাকা 33 জনেরও প্রাণ গিয়েছে ।
বিমান দুর্ঘটনায় আরও 25 লক্ষ টাকা দেওয়ার ঘোষণা করেছে এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ ৷ এর আগে দুর্ঘটনার দিনই টাটা গ্রুপের তরফে আমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল ৷ শনিবার বিমান সংস্থা এই বিপর্যয়ে মৃতের পাশাপাশি বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের এই টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছে ৷
বিমান দুর্ঘটনার পরই ডিজিসিএ এয়ার ইন্ডিয়াকে যাত্রী নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও বেশি নিখুঁত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে । এরপর এয়ার ইন্ডিয়ার তরফে জানানো হয়, বিমানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে । বোয়িং 787-এর অবশিষ্ট যে কয়েকটি বিমান আছে সেগুলির পরীক্ষাও নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যাবে ।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই ধরনের কয়েকটি পরীক্ষা থেকে হয়ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য় উঠে আসবে । দূরপাল্লার যাত্রার ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণে কেন দেরি হল - এবার সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে । নিরাপত্তার কারণে যাত্রীদের বাড়তি সময় অপেক্ষা করতে হলেও তা নিয়ে তেমন ভাবিত নয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ । যাত্রীদের সফর শুরুর আগে হাতে সময় নিয়ে বিমানবন্দরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে । উড়ান সংস্থার কারণে কোনও যাত্রীর দেরি হলে তাঁকে অন্য বিমানে আসন দেওয়ার মতো কাজ করে থাকা সংস্থা । পাশাপাশি যাত্রীরা নিজেদের সুবিধামতো যাত্রার দিনও পরিবর্তন করতে পারেন । তাঁর জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেয় না উড়ান সংস্থা ।
ইনসিওরেন্স ব্রোকারদের সংগঠনের সভাপতি নরেন্দ্রকুমার বারিন্দওয়াল জানিয়েছেন, উড়ানের বিমার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা খুবই ইতিবাচক । বিমান সংস্থার পাশাপাশি এয়ারপোর্ট এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের কথা মাথায় রেখেই এই বিমা সংক্রান্ত নীতি তৈরি হয়েছে । এই ধরনের নীতি আন্তর্জাতিক মানকে মাথায় রেখেই তৈরি । তবে ভারতের আইন এবং প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে খানিকটা বদল করা হয়েছে ।
তিনি আরও জানান, বিমান পরিবহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিমার ব্যবস্থা আছে । কোথায় কতটা ঝুঁকি থাকতে পারে সে কথা মাথায় রেখেই এই বিমার বিষয়টি তৈরি করা হয়ে থাকে ।
বিমানের কোনও অংশের ক্ষতি হলে বিমার মাধ্যমে সেই ক্ষতিপূরণ করা হয় । এই ক্ষতির বিষয়টি যে শুধু বিমান ওড়ার সময়ই হবে এমনটা নয় । বিমানবন্দরে বিমান রাখা থাকাকালীনও দুর্ঘটনা হলে এর মাধ্যমে ক্লেইম পাওয়া যায় । তবে কত টাকা মিলবে তা আবারও নির্ভর করবে বিমানের মালিক এবং বিমা-সংস্থার মধ্যে থাকা চুক্তির উপর ।
এয়ারক্রাফ্ট লাইবিলিটি ইনসিওরেন্স
কোনও যাত্রী বিমানে থাকাকালীন বা বিমানবন্দরের কোথাও অপেক্ষা করার সময় আহত হলে এই ধরনের বিমার মাধ্যমে টাকা পাওয়া যায় । তাছাড়া যাত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যাগ বা অন্য সামগ্রী হারিয়ে গেলেও এই বিমাকেই কাজে লাগাতে হয় । ডিজিসিএ বিষয়টি সরাসরি দেখে । বিদেশে বিভিন্ন সময় হওয়া এই সংক্রান্ত নানা চুক্তিতে বিষয়টি বলা আছে । ওয়ারশ এবং মন্ট্ররিয়াল চুক্তিও এ কথাই বলে ।
আইনি দিক থেকে যাত্রীরা কী ধরনের কভার পাবেন তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে । বিমানে যাত্রার সময় কোনও যাত্রীর মৃত্যু হলে তার নমিনি অর্থ সাহায্য পাবেন । তিনিও প্রয়াত হলে তাঁর নিকটজন ক্ষতিপূরণ পাবেন । ক্যারেজ বাই এয়ার আইনে এই বিষয়টির উল্লেখ আছে । থার্ড পার্টি কভারেজের মাধ্যমে উপকৃত হন বিমানের বাইরে থাকা লোকজন । মানে আমেদাবাদে যেমন হস্টেল এবং চিকিৎসকদের আবাসনে বিমান ভেঙে পড়েছিল তেমন হলে ঘটনায় বিমার কভার দিয়ে থাকে থার্ডপার্টি । এর বাইরে যুদ্ধ বা সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ক্ষেত্রেও আলাদা করে বিমা-সুরক্ষা পাওয়া যায় । তবে সেটা সাধারণ নীতির অংশ নয় । একটি আলাদা ক্লজের সাহায্যে এই ধরনের ক্ষেত্রে বিমার কভার দেওয়ার ব্যবস্থা হয়ে থাকে ।
পাইলট বা বিমানকর্মীদের বিভিন্ন শারীরিক কারণে অনেক সময় ফ্লাইং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায় । সেক্ষেত্রে তাঁদের জন্যও এক বিশেষ বিমা-সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয় । বিমানবন্দরের বিভিন্ন কাজ যাঁরা করে থাকেন তাঁদেরও ঝুঁকি কম নয় । বিশেষ করে বিমানে জ্বালানি ভরার মতো কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা যে কোনওদিন ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে পারেন । বিমার ব্যবস্থা আছে তাঁদের জন্যও ।

