মহাজন-বিরোধী আন্দোলনের তিরন্দাজ নেতা থেকে দিশম গুরু ! স্মরণে শিবু সোরেন
বহু সংগ্রামের শুরুর অধ্যায়ের নাম শিবু সোরেন । রাজনীতির মারপ্যাঁচ ও সামাজিক বিন্যাসের ঊর্ধ্বে ওঠা এমন এক জীবন, যেখানে জীবন-সংগ্রাম লিখেছে অনুপ্রেরণার ইতিহাস।

Published : August 4, 2025 at 6:23 PM IST
আইডেন্টিটি পলিটিক্স বা পরিচিতির রাজনীতি এখন আর নতুন কোনও শব্দ নয় ৷ জাতি বা ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সমীকরণকে আধুনিক ভাষা তাত্ত্বিকরা এই নামেই অভিহিত করেন ৷ প্রতিটি সম্প্রদায় তার নিজস্ব নেতার সন্ধান করে, নিজের কাউকে নেতা হিসেবে চায় ৷ সেই বিচারে দেশের আদিবাসী রাজনীতির অন্যতম সেরা বিজ্ঞাপন ছিলেন শিবু সোরেন ৷
সাঁওতাল পরগনার হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ভারতীয় রাজনীতির অবিসংবাদিত 'গুরুজি' কেন্দ্রীয় সরকারে একাধিক দফতরের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিহার ভেঙে তৈরি হওয়া ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছিলেন ৷ সমাজের একেবারে প্রান্তে থাকা মানুষের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার শীর্ষে যাওয়ার এর চেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ খুঁজতে অণুবীক্ষণের সাহায্য নেওয়া যেতেই পারে ৷ মানুষের সঙ্গে থেকে আর তাঁদের দাবিতে সোচ্চার হয়ে, টানটান ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল আর দাড়ির ফাঁকে শিবু সোরেন অচিরেই হয়ে উঠেছিলেন 'দিশম গুরু', আদিবাসীদের নিজেদের সম্মানের প্রতীক।

81টি বসন্ত পেরিয়ে থামা জীবনের শুরু থেকে হাত ধরাধরি করে চলেছে সংগ্রাম-প্রাপ্তি আর বিতর্ক । ঘটনাবহুল এই জীবনের সর্বত্র ছিল রঙের ছটা । কখনও তাতে ভরা বসন্তের ছোঁয়া, কখনও বর্ষার কালো মেঘ, কখনও আবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহ । তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী শিবু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি আটবার লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন । দু'বার রাজ্যসভাতেও নির্বাচিত হন । মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন সংসদের উচ্চকক্ষের সদস্য ৷ কিন্তু, বিতর্ক কখনও তাঁকে পিছু ছাড়েনি । কখনও গণহত্যার ঘটনায় নাম জড়িয়েছে, কখনও আবার খোদ আপ্তসহায়ককে খুনের মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে জেলে গিয়েছেন । ফিরে এসে আবার মন্ত্রীও হয়েছেন । আদিবাসী রাজনীতিতে এমন বর্ণের ছটা সত্যিই বিরল।
রাজনীতিতে পাকাপাকি মিত্র বা চিরকালীন শত্রু বলে কিছু হয় না । কিন্তু, কিছু রাজনৈতিক চরিত্র এমনও থাকেন যাঁরা তথাকথিত দলীয় রাজনীতির উপরে উঠে বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে মেলে ধরেন। শিবু ছিলেন তেমনই একজন । জীবনের শুরু থেকেই বেঁচে থাকার লড়াই কাকে বলে, তা দেখেছেন খুব কাছ থেকে । অবিভক্ত বিহারের রামগড় জেলার নেমড়া গ্রামে 1944 সালের 11 জানুয়ারিতে জন্মানো শিবু স্কুলে থাকতেই বাবাকে হারান । হারান বললে হয়তো পুরোটা বলা হল না । মহাজনদের ভাড়াটে গুন্ডার হাতে খুন হন শিবুর বাবা ৷ আর এই ঘটনাই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল সাঁওতাল যুবকটির জন্যে।

তৎকালীন বিহারে কৃষকদের উপর মহাজনদের একাংশের লাগামছাড়া অত্যাচার ধীরে ধীরে রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করে শিবুকে এবং মাত্র 18 বছর বয়সে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সাঁওতাল নবযুবক সংঘ । কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে শিবুর দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের সূত্রপাত সেই তখন থেকে । এরপর মার্কসবাদী শ্রমিক নেতা একে রায়, কুড়মি-মাহাতো নেতা বিনোদ বিহারী মাহাতো এবং শিবু সোরেনের হাতে 1972 সালে সাঁওতাল কিংবদন্তি বিরসা মুন্ডার জন্মতিথিতে আত্মপ্রকাশ করে 'ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা'। সঙ্গে ছিলেন নির্মল মাহাতো এবং টেকলাল মাহাতোর মত আদিবাসী নেতারা । নবযুবক সংঘের জনপ্রিয়তা এবং প্রান্তিক আদিবাসীদের জমির অধিকার এবং সেই জমিতে চাষের দাবি নিয়ে শিবুর আপোষহীন লড়াই যে তাঁকে নিজের রাজনৈতিক দল তৈরির অনুপ্রেরণা দেয়, তা তিনি বারবার বলতেন।
ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর প্রথমে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং তারপর সভাপতি, যে পদে ছিলেন চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত । 1977-এর নির্বাচনে হেরে গেলেও, শিবু 1980-তে দুমকা কেন্দ্র থেকে জিতে প্রথমবার সংসদে পা রাখেন । এরপর আরও সাতবার লোকসভার সদস্য় হয়েছিলেন ।
জেএমএম প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিহার ভেঙে ঝাড়খণ্ড গড়ার দাবি তুলতে থাকেন শিবুরা । সঙ্গে ছিল দক্ষিণ বিহারের একটি বড় অংশের সমর্থন । দীর্ঘ লড়াইয়ের পর নতুন রাজ্য ঝাড়খন্ড তৈরি হয় 2000 সালের 15 নভেম্বর । তবে রাজ্যের সূচনালগ্নে ক্ষমতায় আসেনি জেএমএম, তার জন্যে অপেক্ষা করতে হয় আরও 5 বছর । মোট তিনবার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন । 2005 সালের মার্চ মাসে 10 দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন । এরপর 2008 সালের 27 অগস্ট থেকে 2009 সালের 12 জানুয়ারি পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী এবং 2009 সালের 30 ডিসেম্বর থেকে 2010 সালের 31 মে পর্যন্ত আবারও ঝাড়খণ্ডের মসনদে শিবু এবং তাঁর জেএমএম । ইউপিএ-র প্রথম সরকারের আমলে তিনবার কয়লা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি ।

তবে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি শিবু সোরেনের। 1975 সালের চিরুডিহ গণহত্যার ঘটনায় মোট 11 জনের প্রাণ গিযেছিল । 2004 সালের জুলাই মাসে এই ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে যান শিবু । কয়েকমাস বাদে ফিরে আবারও মন্ত্রী হন । 1994 সালে তাঁর আপ্তসহায়ক শশীনাথ ঝা খুন হন । 2006 সালে এই ঘটনায় তাঁর নাম জড়ায় । সিবিআই দাবি করে, 1993 সালের আস্থা ভোটে নরসিমা রাওয়ের সরকারের পক্ষে ভোট দিতে কংগ্রেসের সঙ্গে গোপনে লেনদেন করেছিলেন শিবু । সে কথা জেনে যাওয়ায় শশীকে খুন করা হয় এবং তাতে ভূমিকা ছিল শিবুর।
শুধু খুনের মামলায় জেল খাটা নয়, তাঁকে খুনের ছকও কষা হয়েছিল । 2007 সালে দুমকা জেলে নিয়ে যাওয়ার পথে কনভয়ের খুব কাছে বোমা বিস্ফোরণ হয় । পরে তদন্তকারীরা জানান, শিবুকে প্রাণে মেরে ফেলতেই এই হামলা ।
ভারতীয় রাজনীতি, বিশেষ করে হিন্দি বলয়ের রাজনীতির সমীকরণ, দেশের অন্য অংশের থেকে আলাদা । জাত্যাভিমান কে পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে তৈরি হওয়া সমীকরণ এই অঞ্চলে অনেক সময়ে বড় ভূমিকা নিয়ে নেয় । রাজনৈতিক লড়াইয়ের সূত্র ধরে এক-একজন নেতা একেকটি বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায়ের মুখ হয়ে ওঠেন । বহুলাংশে মানুষের চাওয়া-পাওয়া সেই মানুষটিকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে । আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র শিবু সোরেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন দেশ পেয়েছে আদিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা এক মহিলাকে । এমন বহু সংগ্রামের শুরুর অধ্যায়ের নাম শিবু সোরেন । রাজনীতির মারপ্যাঁচ, সামাজিক বিন্যাসের ঊর্ধ্বে ওঠা এমন এক জীবন যেখানে জীবন-সংগ্রাম লিখেছে অনুপ্রেরণার ইতিহাস।

